রাজধানীর উপকণ্ঠের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলমান তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উপজেলার ছোট-বড় প্রায় ২ হাজার কলকারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতায় কলকারখানার চাকা থমকে যাওয়ার পাশাপাশি চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়েছে চরম ভোগান্তিতে।
Advertisement
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এলাকাভেদে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। বিদ্যুতের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় এবং দফায় দফায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না আসায় ভ্যাপসা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লোডশেডিং চলায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বড় বিঘ্ন ঘটছে, যা আসন্ন বোর্ড পরীক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তারা জানান, সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয় রাতে। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে গভীর রাতেও হয় কয়েক দফায় লোডশেডিং। যে কারণে অনেক সময় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে খোলা আকাশের নিচে বা বারান্দায় রাতযাপনে বাধ্য হতে হয়। এই অনিয়মিত বিদ্যুতের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবাগুলোতেও বিঘ্ন ঘটছে। মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া থেকে শুরু করে ইন্টারনেট ব্যবহার সবকিছুতেই বাড়ছে ভোগান্তি।
আরও পড়ুন‘আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা থাকে না’পরীক্ষার আগে বিদ্যুৎ সংকটে দিশাহারা এসএসসি পরীক্ষার্থীরালোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ বরিশালের দুই হাসপাতালের রোগী ও স্বজনরা
Advertisement
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বায়ুর আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে মানুষ। সেই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং।
শিল্প ও কারখানার বড় ক্ষতির শঙ্কাএদিকে হঠাৎ করে ঘনঘন লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিল্প-কারখানার মালিক, বিভিন্ন মার্কেটের দোকান ব্যবসায়ী, আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা।
শিল্প-কারখানার মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, ঘন ঘন লোডশেডিং শিল্প-কারখানার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানা সচল রাখতেও জ্বালানি স্বল্পতা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, এভাবে লোডশেডিং চলতে থাকলে শিল্প-কারখানাগুলো সচল রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে।
উপজেলার ভায়েলা এলাকার জিতু টেক্সটাইল কারখানার মালিক জিতু কবির বলেন, আমার কারখানায় মূলত গ্রে কাপড় তৈরি করা হয়। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে।
Advertisement
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন প্রতিদিনই ক্রমে কমে যাচ্ছে, আর লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ অবস্থায় কারখানা বেশি দিন সচল রাখা সম্ভব হবে না।
একই অবস্থার কথা বলছেন বিসমিল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের স্বত্বাধিকারী আল-আমিন। তিনি বলেন, লোডশেডিংয়ে কখনো দুই থেকে তিন ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। সময়মতো গ্রাহকদের মাল ডেলিভারি দিতে পারছি না। শ্রমিকদেরও বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে কতদিন চলতে পারবো বুঝতে পারছি না।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ব্যবসায়ীদের মাথায় হাতএদিকে দোকান ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনার কারণে ব্যবসা আগের তুলনায় অনেক সীমিত হয়ে গেছে। তার ওপর দিনভর বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন যেমন বিপর্যস্ত, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। অনেক দোকান নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।
ভুলতা গাউছিয়া মার্কেটের ব্যবসায়ী আবু রায়হান বলেন, ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। সন্ধ্যা ৭টায় দোকানপাট বন্ধ করতে হবে। দেখা গেছে ৫টার দিকে বিদ্যুৎ চলে গেলে আসছে আবার ৭টায়। কোনো সময় এর চেয়ে বেশি সময় গেলেও বিদ্যুৎ আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে আগেই দোকান বন্ধ করে দিতে হয়।
লোকনাথ কসমেটিকসের স্বত্বাধিকারী রাজন বিশ্বাস বলেন, এই কাঠফাটা গরমে বিদ্যুৎ ছাড়া দোকানদারি করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা আর খবর থাকে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তিআবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন এখন আক্ষরিক অর্থেই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তীব্র দাবদাহের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে; বিশেষ করে বহুতল ভবনগুলোতে পানি ও লিফট সংকটে জনভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। লোডশেডিংয়ের এই ভয়াবহতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বইছে সমালোচনার ঝড়, যেখানে নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন—বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই অনিয়ম কেবল আরাম-আয়েশ নয়, বরং মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রাকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
মাঝিনা এলাকার বাসিন্দা শাহিন মিয়া জানান, দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎহীন কাটানোর পর রাতের দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে শিশু ও বৃদ্ধরা গরমে হাঁসফাঁস করছেন। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে ফ্রিজে রাখা পচনশীল খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হচ্ছে এবং ডিজিটাল সেবাসমূহ ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ মানুষের যোগাযোগের মাধ্যমগুলোও অচল হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুনবিদ্যুৎ উৎপাদনের তেলেও টান, লোডশেডিংয়ে নাজেহালগ্যাস নেই, তেলের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বাড়ছে লোডশেডিং
আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা জানান, প্রচন্ড গরম ও লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। তীব্র গরমে অতিষ্ঠ মানুষ। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ লোকজনের কষ্টের সীমা নেই।
এসএসসি পরীক্ষার্থী শিফাতুল মারুফ বলেন, একবার বিদ্যুৎ গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যায়। একদিকে গরম অন্যদিকে আলোর সমস্যা। যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে পরীক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষার রেজাল্টে বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তারাব জোনাল অফিসের ডেপুটি ম্যানেজার আশরাফুল আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের প্রতিদিনের চাহিদা ১৫০ মেগাওয়াট আমরা পাচ্ছি ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট। ৫০ থেকে ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে আমাদের লোডশেডিং করতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে আমাদের প্রচেষ্টার কোন ঘাটতি নেই।
জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন না বাড়লে এ পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (কারিগরি) প্রকৌশলী আলাউদ্দিন জাগো নিউজ কে বলেন, বৈষয়িক জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। আমাদের প্রতিদিনের চাহিদা রয়েছে ২৬০ মেগাওয়াট। কিন্তু আমাদের সরবরাহ করা হচ্ছে ২০০ মেগাওয়াট। গড়ে ২০ শতাংশেরও বেশি ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং হচ্ছে। তবে এটা দিনে রাতে মিলে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা। জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন না বাড়লে এ পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
নাজমুল হুদা/কেএইচকে/জেআইএম