বিশ্বজুড়ে খবই পরিচিত দুটি শব্দ হলো ‘আমেরিকান ড্রিম’ বা ‘আমেরিকান স্বপ্ন’। এই স্বপ্নের টানেই লাখো ভারতীয় পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু নতুন এক জরিপে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
Advertisement
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ১০ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকের মধ্যে ৪ জন এখন যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। প্রশ্ন উঠছে- তাদের সেই স্বপ্ন কি ভেঙে গেছে? আর যদি তারা চলে যান, তবে কোথায় যাবেন?
একসময় যারা ডলারে আয় করা ও সিলিকন ভ্যালিতে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখতেন, এখন তাদের মধ্যে প্রতি চারজনের একজন দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০২৬ সালের এই প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কারণ, যে দেশকে সুপারপাওয়ার হিসেবে দেখা হয়, সেখানে এমন কী ঘটেছে যে ৪০ শতাংশ ভারতীয় এখন দেশ ছাড়তে চান?
২০২৬ সালের জরিপে চমক
Advertisement
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে বর্তমানে এক ধরনের অস্থিরতা বা অস্থিতিশীলতার সময় চলছে। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবছেন।
এই সংখ্যা মোটেও ছোট নয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.৫ শতাংশ হলেও ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা দেশটির মোট কর রাজস্বে প্রায় ৬ শতাংশ অবদান রাখেন। অথচ এই ‘সবচেয়ে সফল সংখ্যালঘু গোষ্ঠী’ আজ নিজেদের প্রতারিত মনে করছে।
অভিবাসন জটিলতা ও গ্রিন কার্ডের দীর্ঘ অপেক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয়দের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো অভিবাসন প্রক্রিয়ার জটিলতা। একজন ভারতীয় সফটওয়্যার প্রকৌশলীর জন্য গ্রিন কার্ড পাওয়া এখন যেন ‘আজীবন কারাদণ্ডের মতো অপেক্ষা’ করার মতো।
Advertisement
কিছু প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়দের গ্রিন কার্ড পেতে ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষা, এইচ-১বি ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও প্রতিটি ধাপে অভিবাসন সংক্রান্ত কাগজপত্রের চাপ পরিবারগুলোকে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দিচ্ছে না।
ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেঙে পড়া অভিবাসন ব্যবস্থাই’ দক্ষ ভারতীয়দের কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে চলে যাওয়ার প্রধান কারণ হয়ে উঠছে।
২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর মে মাসের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করে, যা হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে। উচ্চশিক্ষিত দক্ষ কর্মীদের জন্য নির্ধারিত ইবি-২ ক্যাটাগরিতে কাট-অফ তারিখ ২০১৪ সালের ১৫ জুলাইতেই আটকে রয়েছে। অন্যদিকে ইবি-৩ ক্যাটাগরিতে ‘অন্যান্য দক্ষ কর্মীদের’ জন্য কাট-অফ তারিখ ২০১৩ সালের ১৫ নভেম্বর।
এর অর্থ হলো, যারা ২০১৩-১৪ সালে আবেদন করেছিলেন, তারাও এখনো অপেক্ষায় আছেন। একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে এই অপেক্ষা ৭০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।
কার্নেগির জরিপেও এই বাস্তবতা উঠে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে গ্রিন কার্ড পেতে ৩০-৪০ বছর সময় লাগছে। ফলে আবেদনকারীদের সন্তানরা বড় হয়ে যাচ্ছে, এমনকি অনেক আবেদনকারী অবসরে চলে যাচ্ছেন।
২০২৬ সালের এপ্রিলের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদের অভিবাসন আইনজীবীরা কর্মসংস্থানভিত্তিক আবেদন প্রক্রিয়াকে ‘স্থবির’ বলে বর্ণনা করেছেন।
রাজনৈতিক হতাশা ও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ
যারা দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন, তাদের মধ্যে ৫৮ শতাংশই রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে।
পুরো ৭১ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিক ট্রাম্পের কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি এবং সমাজে নিজের জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তা ভারতীয়দের মধ্যে গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নীতিমালা এমন বার্তা দিয়েছে যে ‘যুক্তরাষ্ট্র শুধু যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের জন্যই’, যা ভারতীয়দের মধ্যে নিজেদের পরিচয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ডেমোক্র্যাট, রিপ্লাবলিক- উভয় পক্ষের প্রতিই আস্থা কমছে ভারতীয়দের
একসময় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দৃঢ় সমর্থক ছিলেন ভারতীয়রা। কিন্তু এখন সেই সমর্থন কমে গেছে। ২০২০ সালে যেখানে ৫২ শতাংশ ভারতীয় নিজেদের ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দিতেন, এখন তা কমে ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান পার্টিও তাদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। তাদের সমর্থন ১৯ শতাংশেই স্থির রয়েছে। ফলে প্রায় ৩০ শতাংশ ভারতীয় এখন ‘স্বতন্ত্র’ বা দলনিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে ঝুঁকছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতীয়রা এখন দল নয়, বরং নিজেদের জীবিকা, পারিবারিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সূত্র: ইন্ডিয়া ডট কম
এসএএইচ