কৃষি ও প্রকৃতি

কৃষকের হাতে সম্ভাবনার নতুন চাবিকাঠি

নুসরাত জাহান বৈশাখী

Advertisement

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এ দেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে কৃষি ও কৃষকের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কৃষিকে বাদ দিয়ে দেশের অর্থনীতি কল্পনা করা যায় না। আদিকাল থেকেই কৃষির সাথে এ দেশের মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং কৃষির ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকে।

পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের কৃষক সমাজ দীর্ঘদিন নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। যেমন- অর্থের অভাব, সঠিক বাজার ব্যবস্থার সংকট, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, আধুনিক প্রযুক্তির অপ্রতুলতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি। এ প্রেক্ষাপটে ‘কৃষক কার্ড’ একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যা বদলে দিতে পারে কৃষকের ভবিষ্যৎ। পহেলা বৈশাখ কৃষকের কল্যাণে উদ্বোধন হলো কৃষক কার্ড, যা কৃষকের জন্য নতুন সম্ভাবনার চাবিকাঠি।

কৃষক কার্ড মূলত একটি পরিচয় ও সুবিধাভিত্তিক সেবা কার্ড; যা কৃষকদের বিভিন্ন সরকারি সহায়তা, ভর্তুকি, ঋণ এবং প্রযুক্তি সেবার সাথে সরাসরি যুক্ত। আগে কৃষকের এসব সুবিধা পেতে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হতো। দালালদের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিংবা অনেক সময় তথ্যের অভাবে সুযোগ হারাতে হতো। কৃষক কার্ড চালুর ফলে এসব জটিলতা অনেকটাই কমে এসেছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা সহজেই ভর্তুকি ও সহায়তা পেতে পারেন। সার, বীজ, কীটনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণে সরকার যে ভর্তুকি দেয়, তা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে এবং কৃষক তাদের ন্যায্য মূল্য পায়।

Advertisement

এটি কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা করে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন বাড়ায় এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি কৃষক কার্ড কৃষকের জন্য সহজ ঋণ প্রাপ্তির পথ খুলে দেয়। অনেক কৃষক ব্যাংকে ঋণ নিতে গিয়ে অনেক জটিলতার মুখোমুখি হন। কৃষক কার্ড সাথে থাকলে কৃষকের পরিচয় ও কার্যক্রমের একটি স্বচ্ছ রেকর্ড তৈরি হয়, যা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়। ফলে তারা সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারেন। নিজেদের কৃষিকাজ সম্প্রসারণ করতে পারেন। পাশাপাশি এ কার্ড আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কৃষকদের সংযোগ স্থাপন করে।

আরও পড়ুনকৃষক কার্ড কৃষির নতুন দিগন্ত 

ডিজিটাল এ যুগে তথ্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা আবহাওয়া, ফসলের রোগবালাই, বাজারদর ইত্যাদি সম্পর্কে সহজেই তথ্য পেতে পারেন। ফলে তারা সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এ ছাড়া এ কার্ড কৃষকদের একটি ডাটাবেজ তৈরি করতে সাহায্য করে। যার ফলে সরকার সহজেই বুঝতে পারবে কোন অঞ্চলে কী ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়, কোথায় কী সমস্যা রয়েছে এবং কোথায় কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। এ তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা কৃষিখাতকে আরও কার্যকর ও টেকসই করে তুলতে পারে। তবে এ কার্ডের সফলতা নির্ভর করে এর সঠিক বাস্তবায়নের ওপর।

অনেক সময় দেখা যায়, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে কৃষকেরা এ সুবিধা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেন না। তাই প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা, সঠিক কার্যক্রম এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। পাশাপাশি দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে প্রকৃত কৃষকেরাই এর সুফল ভোগ করতে পারেন। এ ছাড়া কৃষক কার্ড ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হলে এটিকে মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করা জরুরি। এতে কৃষকেরা সরাসরি তাদের আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করতে পারবেন এবং স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বীমা সুবিধা চালু করা গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা কিছুটা হলেও নিরাপত্তা পাবেন।

তবে কৃষক কার্ড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। যেমন- সঠিকভাবে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা একটি বড় কাজ। এরপর প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে গ্রামীণ কৃষকেরা সহজেই এ সেবা গ্রহণ করতে পারেন। দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে কঠোর নজরদারি করতে হবে। তাহলেই সঠিকভাবে কৃষক কার্ড বাস্তবায়ন সম্ভব। আগে কৃষকদের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করলে এর কোনোটি ফলপ্রসূ হয়নি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

Advertisement

অনেক ক্ষেত্রে উপকারভোগীরা বঞ্চিত হয়েছে আবার ক্ষমতাবান গোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে। তাই অতীতে কেন এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়নি, তাও বিবেচনায় নিতে হবে। এ কার্ড সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে এটি কৃষকদের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এটি কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করবে। তাদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াবে এবং কৃষিকে আরও আধুনিক ও টেকসই করে তুলবে।

আরও পড়ুনখাদ্য নিরাপত্তায় প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির ভূমিকা 

কৃষকদের উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন। সেই উন্নয়নের পথে কৃষক কার্ড হতে পারে শক্তিশালী হাতিয়ার। বাংলাদেশে কৃষি শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি জীবনধারা। এ খাতকে শক্তিশালী করতে হলে কৃষকদের ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি। কৃষক কার্ড সেই ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। এটি শুধু একটি কার্ড নয় বরং একটি সেতুবন্ধন; যা কৃষক ও সরকারের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে।

মনে রাখতে হবে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষকেরা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ফসল উৎপাদন করেন। যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই কৃষকদের কল্যাণে কাজ করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। কৃষক কার্ড উদ্যোগটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

এসইউ