মতামত

শিশুদের চিকিৎসায় মমতার হাত প্রসারিত করি

বিভিন্ন গণমাধ্যমে হামে নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যুর সংবাদ প্রতিনিয়ত প্রকাশ হচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সারা দেশে সর্বশেষ (২১ এপ্রিল) ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৫৯টি শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯১৩টি শিশু এবং তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৪৫টি শিশুই ঢাকা বিভাগের।

Advertisement

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেট এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।

সম্প্রতি এক যুবকের কোলে ৩ বছর বয়সী হামে মৃত্যুবরণকারী এক শিশুর মরদেহের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে তীব্র অভিযোগ তোলেন শিশুর মা। এমন অভিযোগ যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করেছেন।

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, এমন অভিযোগের সুযোগ আমরা কেনো দিবো। যারা চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত আছেন তারা কি পারেন না ভালোবাসা আর মমতার মাধ্যমে রুগী ও স্বজনদের মন জয় করতে? নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে আর স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারি হচ্ছে আকাশ বাতাস।

Advertisement

এসব মৃত্যুর দায় কে নিবে? একটি শিশুর মৃত্যুর পরেই তো আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার কথা অথচ বিভিন্ন স্থানে শিশুদের চিকিৎসার প্রতি অবহেলার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। আমরা এমন অভিযোগ আর শুনতে চাই না। একটি শিশুর সুস্থতা মানেই একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তাই শিশুদের সুচিকিৎসার প্রতি আরো গভীরভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। এছাড়া দ্রুত সকল শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। একটি শিশুও যেনো এই কর্মসূচি থেকে বাদ না না যায়, এ বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবি (সা.) একবার হাসানকে (তার দৌহিত্র শিশু) চুমু খেলেন। তখন নবি করিম (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন হজরত আকরা ইবনে হাবিস (রা.)। তিনি বিরক্ত সুরে বললেন, আমার ১০টি সন্তান রয়েছে। আমি কাউকে কোনো দিন চুমু খাইনি। এ কথা শুনে মহানবি (সা.) তার দিকে তাকিয়ে করুণার সুরে বললেন, যে দয়া করে না সে দয়া পায় না। (বুখারি) অপর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনসারদের দেখতে গিয়ে তাদের শিশুদের সালাম দিতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। তাদের জন্য সর্বদা কল্যাণ ও মঙ্গলের দোয়া করতেন। (নাসাঈ)

একটি বিষয়ে কতকের কিছুটা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, রোগ প্রতিরোধে টিকা বা ভ্যাকসিন নেওয়ার বিষয়টি ষড়যন্ত্রমূলক। পশ্চিমারা টিকার মাধ্যমে আমাদের শরীরে বিভিন্ন রোগ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ঔষধ কিংবা ভ্যাক্সিনে ক্ষতিকর উপাদান আছে বলে প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও তারা এমন অভিযোগ করে থাকেন। তাদের এই অভিযোগ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেও ঠিক নয়।

মূল বিষয়ে হলো, টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণ মূলত সুস্থ থাকার জন্য চিকিৎসা গ্রহণের উপায়। রোগ-ব্যাধি থেকে সুস্থ থাকতে ইসলামে চিকিৎসা গ্রহণ ও ভ্যাকসিন নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকনির্দেশনা থেকেই তা প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-‘মৃত্যু ছাড়া এমন কোনো রোগ নেই; যার চিকিৎসা নেই।

Advertisement

মূলত রোগ-ব্যাধির আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য ভ্যাকসিন বা টিকা নেওয়া জায়েজ। ব্যাপারে ইসলামে কোনো ধরনের বাধা নেই। বরং রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে অগ্রিম প্রতিরোধ করা অধিক উত্তম।

হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি, যার ওষুধ অবতীর্ণ করেন নি। (অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা প্রতিটি রোগ-ব্যাধির সাথে সাথে সেগুলোর প্রতিষেধকও অবতীর্ণ করেছেন। সেগুলো কেউ জানে আর কেউ জানে না।’ (মুসনাদ আহমাদ এবং বুখারি)

আমরা কোনোভাবে শিশুদের প্রতি অবহেলা করতে পারি না। ইসলামে শিশুদের প্রতি স্নেহ ভালোবাসার বিষয়ে অত্যন্ত তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। একটি শিশু বীজের মত। আমরা বীজকে যত ভালোভাবে পরিচর্যা করবো তার ফুল ও ফল তত ভালো হবে।

আমরা জানি, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন ও ভালোবাসতেন, তাদের কাছে টেনে চুমু খেতেন। তাদের জন্য সর্বদা কল্যাণ ও মঙ্গলের দোয়া করতেন। এমনকি নামাজের সময় দুষ্টামি করলেও তাদের সুযোগ করে দিতেন।

একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবি (সা.) একবার হাসানকে (তার দৌহিত্র শিশু) চুমু খেলেন। তখন নবি করিম (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন হজরত আকরা ইবনে হাবিস (রা.)। তিনি বিরক্ত সুরে বললেন, আমার ১০টি সন্তান রয়েছে। আমি কাউকে কোনো দিন চুমু খাইনি। এ কথা শুনে মহানবি (সা.) তার দিকে তাকিয়ে করুণার সুরে বললেন, যে দয়া করে না সে দয়া পায় না। (বুখারি)

অপর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনসারদের দেখতে গিয়ে তাদের শিশুদের সালাম দিতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। তাদের জন্য সর্বদা কল্যাণ ও মঙ্গলের দোয়া করতেন। (নাসাঈ)

তাই আসুন, নিষ্পাপ এই শিশুদের সুচিকিৎসার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিই এবং তাদের প্রতি মমতাশীল হই।

আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক শিশুকে সুস্থ রাখুন এবং তার নিরাপত্তার চাদরে জড়িয়ে নিন, আমিন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ। masumon83@yahoo.com

এইচআর/জেআইএম