নেত্রকোনা জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম এখন পুরোদমে চলছে। তবে চারদিকে সোনালি ধানের সমারোহ থাকলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির পর এবার ধান বিক্রিতে ওজনে কারচুপির অভিযোগে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন তারা। অতিরিক্ত ওজনে ধান নেওয়ার প্রবণতা ও কম দামের চাপে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, যা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত করছে।
Advertisement
জানা গেছে, এবার অতিবৃষ্টিতে কলমাকান্দার গুড়াডোবা, মেদাবিল; মদনের গোবিন্দশ্রী, উচিতপুর; মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা; খালিয়াজুরির কীর্তনখোলা, নন্দের পেটনা, লক্ষ্মীপুর, চুনাই, কাটকাইলেরকান্দা, বৈলং, লেপসাই, চৈতারাসহ বিভিন্ন হাওরের নিচু ধানখেতে জমে থাকা পানিতে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির আধা পাকা বোরো ধান নষ্ট হয়েছে।
‘সব মিলিয়ে এমনিতেই হিসাব মিলছে না। এরপরও ধান বিক্রি করতে গিয়ে দেখি ব্যবসায়ীরা ৪৩-৪৫ কেজিতে মণ ধরছে। এতে করে আরও লসের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি।’
খালিয়াজুরি, মদন ও মোহনগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কৃষাণ-কৃষাণিদের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। কোনো কোনো খেতে ধান আধা পাকা থাকলেও বেশিরভাগ খেতেই পাকা ধান বাতাসে দুলছে। এসব ধান কাটার ধুম পড়েছে। হাওরে জিরাতি (অস্থায়ী ঘর) তৈরি করে ধান কাটা হচ্ছে। শ্রমিকের পাশাপাশি যন্ত্র দিয়েও ধান কাটা হচ্ছে। শ্রমিকরা ধানের বোঝা মাথায় করে এনে সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখছেন। কেউ যন্ত্রের সাহায্যে মাড়াই করা ধান স্থানীয় মহাজনদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এসব ধান আবার ট্রাক, লরি, টমটম ও ইজিবাইক দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কেউ আবার কাটা ধানের আঁটি আঙিনায় এনে মেশিন দিয়ে মাড়াই করছেন। এছাড়া জমির পাশে বা বাড়ির সামনে ধান সিদ্ধ ও শুকানোর জন্য জায়গাও তৈরি করছেন তারা।
Advertisement
আরও পড়ুন- ধানের বাম্পার ফলনেও হাওরজুড়ে হতাশা, খরচের টাকা উঠছে না কৃষকেরপহেলা বৈশাখের ভোরেই সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটার ধুমপানির নিচে ১০ হাজার বিঘা জমির ধান, দিশেহারা হাওরের হাজারো কৃষক
কৃষকদের অভিযোগ, দেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ৪০ কেজিতে এক মণ ধরা হলেও স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ৪২ থেকে ৪৫ কেজিতে এক মণ হিসেবে ধান কিনছেন। এতে প্রতি মণে কয়েক কেজি ধান অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে, যা সরাসরি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাঠপর্যায়ে দর কষাকষির সুযোগ কম থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে এই শর্তে ধান বিক্রি করছেন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দফা শিলাবৃষ্টি ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে হাওরের নিম্নাঞ্চলের অনেক জমির ধান তলিয়ে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। এর মধ্যেই শ্রমিক সংকট ও ডিজেলের বাড়তি দামে চাষাবাদ ও ধান কাটার খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে মৌসুমের শুরু থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছেন তারা।
বর্তমানে হাওরের মাঠে দিন-রাত পরিশ্রম করে ধান কাটছেন শ্রমিকরা। বজ্রপাতের ঝুঁকি উপেক্ষা করেই চলছে কাজ। ধান মাড়াই শেষে অনেক কৃষক মাঠেই তা বিক্রি করে দিচ্ছেন। কিন্তু সেখানেও দেখা দিয়েছে নতুন সমস্যা- কম দামের পাশাপাশি ওজনে বেশি দিয়ে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
Advertisement
‘আমাদের উপজেলায় যেতে যে সড়কটি আছে তা তিন বছর ধরে বন্ধ। হাওরের রাস্তা খারাপ থাকায় ধান শহরে নিয়ে বিক্রির উপর নেই। তাই ৭৫০ থেকে ৮২০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার ওজনে মণ প্রতি ৫ কেজি ‘ঢলক’ নেওয়া হয়। কৃষকের ক্ষতি কেউ দেখছে না।’
একাধিক কৃষক বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই তারা নতুন করে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সরকারি ক্রয় কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় বাজারে ন্যায্য দামও পাচ্ছেন না। ফলে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে, তার ওপর আবার ওজনের কারচুপি। সব মিলিয়ে লোকসান আরও বাড়ছে।
আরও পড়ুন- ‘পানিতে ডুবে কাঁচা ধান চোখের সামনে পচে যাচ্ছে, চিন্তায় ঘুম হয় না’হাওরে পরিবারহীন জিরাতিদের জীবনে নেই ঈদের ছোঁয়াশেষ হয়নি ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ, ঝুঁকিতে হাওরের বোরো ধান
স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ১০ উপজেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। হাওরপারের মানুষদের একমাত্র ফসলই হচ্ছে বোরো। এ ফসলের ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসাসহ সারা বছরের সংসার খরচ। গত রোববার খেতের পাকা ধান কাটতে শুরু করেন কৃষকরা। হাওরে উৎপাদিত বোরো ধানের বাজারমূল্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী এলাকার কৃষক জলিল মিয়া বলেন, ‘আগাম বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে উঠতি বোরো ধান। জমিতে পানি থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না। মেশিনের জন্য ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি। সব মিলিয়ে এমনিতেই হিসাব মিলছে না। এরপরও ধান বিক্রি করতে গিয়ে দেখি ব্যবসায়ীরা ৪৩-৪৫ কেজিতে মণ ধরছে। এতে করে আরও লসের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি।’
‘ধান ভেজা, তাই মণে তিন কেজি করে বেশি নিই। এটাই এই অঞ্চলের নিয়ম। কেউ কেউ ৫ কেজি করে বেশি নেয়। মিল মালিকদেরও ওজনে বেশি দিতে হয়।’
খালিয়াজুড়ির চাকুয়া গ্রামের কৃষক গফুর মিয়া বলেন, ‘আমাদের এলাকার রাস্তাঘাট নেই। সরকার থেকেও ধান কিনছে না। তাই বাধ্য হয়েই কম দামে বিক্রি করছি। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে কম দামে ধান কিনছে। আবার ওজনে ঠকাচ্ছে। আমাদের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই।’
মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর গ্রামের কৃষক কাজল চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় যেতে যে সড়কটি আছে তা তিন বছর ধরে বন্ধ। হাওরের রাস্তা খারাপ থাকায় ধান শহরে নিয়ে বিক্রির উপর নেই। তাই ৭৫০ থেকে ৮২০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার ওজনে মণ প্রতি ৫ কেজি ‘ঢলক’ নেওয়া হয়। কৃষকের ক্ষতি কেউ দেখছে না।’
অন্যদিকে স্থানীয় ফড়িয়ারা দাবি করেছেন, ভেজা ধান কেনার কারণে কিছুটা বেশি ওজন ধরা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, মিল মালিকদের কাছে ধান বিক্রির সময়ও ৪১ কেজি করে দিতে হয়। সেই কারণেই তারা কৃষকদের কাছ থেকে বেশি ওজনে ধান নিচ্ছেন।
তবে কৃষকরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এভাবে নিয়মের বাইরে গিয়ে ওজন নেওয়া অন্যায্য।
আশুগঞ্জ এলাকা থেকে ধান কিনতে আসা (ফড়িয়া) ব্যবসায়ী হবির মিয়া বলেন, ‘ধান ভেজা, তাই মণে তিন কেজি করে বেশি নিই। এটাই এই অঞ্চলের নিয়ম। কেউ কেউ ৫ কেজি করে বেশি নেয়। মিল মালিকদেরও ওজনে বেশি দিতে হয়।’
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এখনো সরকারিভাবে ধান-চাল কেনার নির্দেশনা জারি হয়নি। তবে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ওজনে বেশি নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমান বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। কৃষকদের যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হবে।
নেত্রকোনা-১ আসনের এমপি ও সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘ওজনে বেশি নেওয়ার বিষয়টি শুনেছি। কৃষকদের কষ্টার্জিত ফসল ওজনে বেশি নিয়ে ঠকানো হচ্ছে। কৃষকদের সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।’
কৃষকদের দাবি, দ্রুত সরকারি ক্রয় কার্যক্রম শুরু করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাজারে ওজনের কারচুপি বন্ধে কঠোর নজরদারি জোরদার করার আহ্বান জানান তারা।
এফএ/এএসএম