যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধের কারণে ইরান আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ছে এবং প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার হারাচ্ছে।
Advertisement
ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেন, ইরান আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ছে! তারা চায় হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়া হোক—টাকার জন্য হাহাকার করছে! প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে। সামরিক ও পুলিশ বাহিনী অভিযোগ করছে তারা বেতন পাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ শুরু হয় ১৩ এপ্রিল থেকে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ইরানি পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজে গুলি চালিয়ে সেটি জব্দ করে এবং সমুদ্রে ইরানগামী বা ইরান থেকে আসা পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে দিক পরিবর্তনে বাধ্য করে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই পদক্ষেপকে অবৈধ এবং জলদস্যুতা বলে অভিহিত করেছে।
এই অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান সব বিদেশি জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং কয়েকটি বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ আটক করে। এর আগে তারা বন্ধুসুলভ হিসেবে বিবেচিত কিছু জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল।
Advertisement
১৯ এপ্রিল ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ রেজা আরেফ বলেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিনামূল্যে নয়।
এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেন, ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করে অন্যদের জন্য বিনামূল্যে নিরাপত্তা আশা করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, হয় সবার জন্য মুক্ত তেলের বাজার, নয়তো সবার জন্য বড় খরচের ঝুঁকি। বৈশ্বিক জ্বালানি দামের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে ইরান ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের স্থায়ী অবসানের ওপর।
বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রধান আলোচক মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া না হলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে না।
Advertisement
বিশ্লেষকরা বলছেন, অবরোধ ইরানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তবে দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে তা সহ্য করার।
ইরান কতদিন টিকে থাকতে পারবে?
ইরান সমুদ্রপথে তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যালসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিসহ ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এই বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালি দিয়েই স্বাভাবিক সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। তবে এরপর থেকে ইরান নিজস্ব জ্বালানি পণ্য রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। বাণিজ্য তথ্য সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ইরান প্রতিদিন ১.৮৪ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে এবং এপ্রিলেও প্রায় একই মাত্রা বজায় রেখেছে।
১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ইরান ৫৫.২২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। গত এক মাসে ইরানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নামেনি, অনেক সময় ১০০ ডলারও ছাড়িয়েছে।
রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার ধরলেও গত এক মাসে ইরান অন্তত ৪.৯৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
এর বিপরীতে, যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইরান প্রতিদিন প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার আয় করতো।
সহজভাবে বলতে গেলে, যুদ্ধের পর গত এক মাসে ইরানের তেল আয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
এই প্রবাহ থামানোই যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের অন্যতম লক্ষ্য।
১৪ এপ্রিল আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশ্লেষক ফ্রেডরিক বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে তেলের আয়ের দিক থেকে ইরান লাভবান হয়েছে, তবে অবরোধের ফলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
তিনি বলেন, ইরানের কাছে ভাসমান ট্যাঙ্কারে সংরক্ষিত প্রায় ১২৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে, যা কিছুটা সুরক্ষা দিলেও অবরোধের প্রভাব এড়ানো যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্র কতদিন অবরোধ চালাতে পারবে?
শ্নাইডার বলেন, ১ মে’র মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হতে পারে, কারণ অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিনের বেশি সামরিক পদক্ষেপ চালানো কঠিন।
তিনি আরও বলেন, চীন এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে বাধাকে অগ্রহণযোগ্য বলেছে এবং হরমুজ বন্ধ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইরান কি তেল সংরক্ষণ করতে পারবে?
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিশোধন ক্ষমতা দৈনিক ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল। তবে অবরোধের কারণে সংরক্ষণে চাপ বাড়ছে।
বিশ্লেষক মাইউন ঝু বলেন, বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় ২০ দিনের উৎপাদন ধারণ করা সম্ভব, তবে মে মাসে উৎপাদন কমাতে হতে পারে।
ইরান কি আয় চালিয়ে যেতে পারবে?
বিশেষজ্ঞ কিনাথ ক্যাটম্যান বলেন, সমুদ্রে থাকা ১৬০–১৭০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল থেকে ইরান কয়েক মাস আয় চালিয়ে যেতে পারবে—সম্ভবত আগস্ট পর্যন্ত।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপ করেছে। কিছু জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ইরান অসম যুদ্ধ কৌশল—গেরিলা হামলা, সাইবার আক্রমণ, প্রক্সি গোষ্ঠী—ব্যবহার করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তারা জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং হরমুজে মাইন পেতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করেছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাডাম ইরিলি বলেন, ইরান দীর্ঘ সময় চাপ সহ্য করতে পারে এবং সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার চেয়েও বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে।
তিনি বলেন, তাদের জন্য এটি টিকে থাকার যুদ্ধ, এবং তারা দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম