বিএনপি প্রত্যেকটি বিষয়ে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদের রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘হাজার চেষ্টা করেন ওই আওয়ামী লীগ হতে পারবেন না, দুর্বল আওয়ামী লীগ হতে পারবেন।’
Advertisement
শনিবার (২৫ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াত আয়োজিত এক সমাবেশে দলের আমির শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, সেই আওয়ামী লীগ যারা জাতিকে নিয়ে বিরোধী দলকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতো আজ তারা কোথায়? আর তারা (বিএনপি) একই কাজ শুরু করেছে। যে আওয়ামী লীগ তাদের পোষ্য লাঠিয়ালদের দিয়ে সমাজের বিভিন্ন জায়গায় কর্তৃত্ব কায়েম করেছিল। সেই আওয়ামী লীগের পাশে তাদের দুঃখের দিনে কোনো লাঠিয়াল এসে দাঁড়াতে পারেনি।
সুশাসন কায়েমের জন্য রাষ্ট্রের মৌলিক যেসব জায়গায় পরিবর্তন করা দরকার, প্রত্যেকটি বিষয়ে বিএনপি বিরোধিতা করে চলছে বলে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, এটি জাতির সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণা। বিএনপি তাদের ৩১ দফা কর্মসূচি, দলীয় ইশতেহারেরও বিরোধিতা করছে। তারা যে বিরোধিতা করছে, সেই জ্ঞানটাও তারা হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে।
Advertisement
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দুইটা ভোট হয়েছে। একটা ভোট তাদের পক্ষে গেছে, সেটি তারা মেনে নিয়েছে। আরেকটা ভোটে ৭০ শতাংশ জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, সেটি তারা মানে না, এটা লজ্জার। ৭০ শতাংশ ভোটের রায় যেদিন বাস্তবায়ন হবে, সেদিন দেশ থেকে সত্যিকার অর্থে ফ্যাসিবাদ বিদায় নেবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান না হলে, মানুষ জীবন না দিলে বিএনপি আজ ক্ষমতা উপভোগ করতে পারতো না উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, তারা এগুলো ভুলে গেছে। তবে তারা আগেই ভুলে গিয়েছিল। শহীদ পরিবার যখন বুকে কষ্ট নিয়ে কান্নাকাটি করছিল, শহীদ পরিবারের কাছে তাদের ছুটে দেওয়ার সময় ছিল না। তারা ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর ৭ আগস্ট নির্বাচনের দাবি তুলে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিল।
বিএনপিকে জুলাই বিপ্লবের সুবিধাভোগী উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যারা বিদেশে ছিলেন, বিপ্লবের কারণে স্বদেশে আসার সুযোগ পেয়েছেন। এই বিপ্লব না হলে তারা দেশে ফিরে আসার চিন্তা করতে পারতেন না।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এখন কেউ কেউ দাবি করে অমুক আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড, অমুকের নেতৃত্বে এই আন্দোলন সফল হয়েছে। এগুলো সব ভুয়া। কারও ন্যায্য অবদানকে কখনো আমরা অস্বীকার করি না। আন্দোলন আমরা সবাই করেছি। কিন্তু আমরা তীরে ভিড়তে পারিনি। আমাদের তরী সমুদ্রে ভাসমান ছিল। জুলাই আন্দোলনের নায়কেরা এই তরী নিয়ে ঘাটে ভিড়েছে, জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে। তাদের সম্মান করতে ভালোবাসতে শিখুন। তাদের নিয়ে তুচ্চতাচ্ছিল্য করবেন না।
Advertisement
বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, সম্প্রতি কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এমনকি এখান থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে মানুষের আশ্রয়ের জায়গা, আইনি আশ্রয়ের জায়গা থানা, সেই থানার ভেতরে ঢুকে দুঃখজনকভাবে ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপরে হামলা করা হয়েছে। বার্তা পরিষ্কার। যেদিন তারা গণভোটের রায় অস্বীকার করেছে, আমি বলেছিলাম বিএনপি আজ থেকে ফ্যসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করল। এটা ফ্যাসিবাদ।
গতকাল নেত্রকোনায় জামায়াতের সংসদ সদস্য মাসুম মোস্তফার ওপরে হামলার ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে সমাবেশে উপস্থিতদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, এটা কোন বাংলাদেশ? এই বাংলাদেশ কি আপনারা চেয়েছিলেন? আপনাদের সন্তানদের আবার পায়ের গোড়ালি দুই টুকরা করা হোক, আপনারা চেয়েছেন? আপনাদের সন্তানদের ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে দা-কিরিচ, কুড়াল আর হেলমেট দিয়ে আঘাত করা হোক আপনারা চেয়েছিলেন? এই বাংলাদেশকে আমরা ধিক্কার জানাই। এ বাংলাদেশ আমরা চাই না। আমরা পরিবর্তনের বাংলাদেশ চাই।
শফিকুর রহমান বলেন, কোনো আদুভাই, দাদুভাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমাদের সন্তানদের ওপর ছড়ি ঘুরাক, আমরা এটা দেখতে চাই না। এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। যদি বন্ধ না করেন মনে রাখবেন, জুলাই শুধু ২৪ সালে ছিল না, জুলাই প্রত্যেক বছরে আছে। সে জুলাই আবার ফিরে আসবে ইনশা আল্লাহ এবং তখন ফাইনালি ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হবে।
সরকারকে গণভোটের রায় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তারা যেন জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখান। ৭০ ভাগ মানুষের রায় মেনে নেয়। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে বিরোধী দলের লড়াই সংসদের ভিতরেও চলবে, খোলা ময়দানেও চলবে। এই লড়াইয়ে জনগণের বিজয় হবে।
সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটে ৫ কোটি মানুষ হ্যাঁ-তে ভোট দিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট খারিজ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণ রায় দিয়েছে, গণভোটের রায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। সেটি না হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দলের সংগ্রাম দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে। রক্তাক্ত আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিলে এর পরিণতিও ভোগ করতে হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধান বলেন, জাতির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার সংসদে দাঁড়িয়ে জুলাই শহীদদের অপমান করা হচ্ছে। জুলাই শহীদ পরিবারের আর্তনাদ তারা (বিএনপি) শুনতে পান না। ৭০ ভাগ মানুষের রায় মেনে না নিলে তারা আবার দেশে আন্দোলন হবে।
সমাবেশে শহীদ পরিবারের পক্ষে শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা ও জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী রোকেয়া বেগম বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন শহীদ পরিবার ও গণঅভ্যুত্থানে আহতদের দাবি। তিনি সংসদে গিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলবেন। জুলাই শহীদ ও আহত পরিবারের সমস্যাগুলো তুলে ধরবেন।
গণ-অভ্যুত্থানে হাত হারানো আহত জুলাই যোদ্ধা আতিকুল ইসলাম বলেন, ৭০ ভাগ মানুষের গণরায়কে অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই রায়কে গলা টিপে হত্যা করতে চাইলে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে হবে। তবে শেখ হাসিনা পালানোর পথ পেয়েছে, তারা সেই সুযোগও পাবেন না।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও হামিদুর রহমান আযাদ, খেলাফত মজলিসের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসেন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মুখলেসুর রহমান কাসেমী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, জামায়াতের ঢাকা দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জসীম উদ্দিন সরকার, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আতিকুর রহমান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম ও জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম।
আরএএস/এমআইএইচএস