দেশজুড়ে

‘রাজনৈতিক বিদ্বেষে’ দেড়যুগেও চাকা ঘোরেনি খাওয়ার স্যালাইন কারখানার

রাজনৈতিক কারণে অচল হয়ে পড়ে আছে ঝিনাইদহের সম্ভাবনাময় খাবার স্যালাইন কারখানা। প্রতিষ্ঠার পর দেড়যুগ পেরোলেও উৎপাদন শুরু হয়নি। অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে স্যালাইন তৈরির কোটি টাকা মূল্যের সরঞ্জাম। আধুনিক ভবনটিতে এখন চলে টিকাদান কার্যক্রম। এতে জেলার হাসপাতালগুলোতে খাবার স্যালাইনের চাহিদা মেটাতে ভরসা করতে হচ্ছে যশোর ও বগুড়ার কারখানা। ফলে বাড়ছে আমদানি খরচ ও ভোগান্তি।

Advertisement

অভিযোগ রয়েছে, ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে নির্মাণ হওয়ায় প্রায় ১৮ বছরেও কারখানাটি চালু হয়নি। রাজনৈতিক বিদ্বেষে প্রকল্পটি সামনে এগোতে দেওয়া হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের আওতায় ২০০৫ সালে খাবার স্যালাইন কারখানাটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঝিনাইদহ শহরের মদনমোহন পাড়ায় সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা হাসপাতাল ক্যাম্পাসের পাশে গড়ে তোলা হয় কারখানাটি। তৎকালীন ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য মসিউর রহমান এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৮ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর স্যালাইন কারখানাটি চালুর ব্যাপারে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক উদ্যোগ থমকে যায়।

Advertisement

অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি সরকারের আমলে তৈরি হওয়ায় কারখানাটি চালুর ব্যাপারে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অনাগ্রহ তৈরি হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও চিকিৎসক নেতারা এ নিয়ে কোনো কথা বলেননি বলে অভিযোগ জেলার সচেতন মহলের।

আরও পড়ুন:খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরুজ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধসবুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, দোতলা বিশিষ্ট কারখানা কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলার মেঝে ধুলোবালুতে ভরা। নিচ তলার একটি রুমে চলে টিকাদান কার্যক্রম। নিচতলার একপাশে রয়েছে সম্মেলন কক্ষ। দ্বিতীয় তলায় নেই কোনো কার্যক্রম। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা হাসপাতালের টিকাদান কার্যক্রম চলে স্যালাইন কারখানার কক্ষে। স্যালাইন তৈরির মেশিন ভবনের নিচ তলার বারান্দার ফাঁকা জায়গায় কালো পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় রাখা আছে। দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় প্রায় কোটি টাকা মূল্যের এই যন্ত্রটি পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়।

‘প্রয়াত সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মসিউর রহমান স্যালাইন কারখানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন। বিএনপি সরকারের আমলে কারখানাটি নির্মাণ হওয়ায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এটি চালু করেনি। তাদের মধ্যে বিএনপি ও মসিউর রহমানকে নিয়ে ঈর্ষা ছিল, বিদ্বেষ ছিল। এই কারখানাটি চালু করা ঝিনাইদহবাসীর প্রাণের দাবি।’

Advertisement

সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিথিলা ইসলাম বলেন, স্যালাইন কারখানার কার্যক্রম চালুর বিষয়ে তিনবার কাগজপত্র তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই কোনো কিছু হয়নি। স্যালাইন কারখানাটি কেন চালু করা হচ্ছে না, সেটা আমি নিশ্চিত নই।

কারখানার ভবন ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি একটি ভবন কোটি টাকা খরচ করে তৈরি হয়েছে। ভবনটি দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। ময়লা-আবর্জনা ও আগাছা জন্মেছিল স্যালাইন কারখানার ভবনের ভেতর-বাইরে। যে কারণে সিভিল সার্জন ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে আমরা ওই ভবনে টিকাদান কার্যক্রম চালাচ্ছি। ভবনটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করছি। এতে ভবনটি জরাজীর্ণ না হয়ে সুন্দর ও পরিপাটি অবস্থায় আছে। আমরা চাই, দ্রুত স্যালাইন কারখানা চালু হোক।

আরও পড়ুন:আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্পবন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্যপ্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’

জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মুন্সি কামাল আজাদ পান্নু বলেন, প্রয়াত সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মসিউর রহমান স্যালাইন কারখানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন। বিএনপির আমলে কারখানাটি নির্মাণ হওয়ায় বিগত আওয়ামী লীগের সরকার কারখানাটি চালু করেনি। তাদের মধ্যে বিএনপি ও মসিউর রহমানকে নিয়ে ঈর্ষা ছিল, বিদ্বেষ ছিল। এই কারখানাটি চালু করা ঝিনাইদহবাসীর প্রাণের দাবি।

তিনি আরও বলেন, কারখানাটি চালু হলে জেলার হাসপাতালগুলোর স্যালাইনের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলায়ও সরবরাহ করা সম্ভব। আমরা সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছি।

‘ভৌত অবকাঠামো থাকলেও স্যালাইন কারখানার কোনো নথিপত্র আমাদের কাছে নেই। আমরা যতটুকু জানি, এটি তৎকালীন একটি প্রজেক্টের আওতায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরে হয়তো সেই প্রজেক্ট না থাকায় স্যালাইন কারখানাটি চালু করা হয়নি। এছাড়া কারখানাটি চালু না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে বলেও বিভিন্ন সময় আমরা শুনেছি।’

জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ২২ হাজার পিস খাবার স্যালাইনের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মেটাতে যশোর ও বগুড়া থেকে স্যালাইন ক্রয় করে হাসপাতালগুলো। এতে প্রতি মাসেই পরিবহন খরচ বাবদ মোটা অর্থ খরচ হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টদের দাবি, কারখানাটি চালু হলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী জেলায় সরবরাহ করা যাবে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, ভৌত অবকাঠামো থাকলেও স্যালাইন কারখানার কোনো নথিপত্র আমাদের কাছে নেই। আমরা যতটুকু জানি, এটি তৎকালীন একটি প্রজেক্টের আওতায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরে হয়তো সেই প্রজেক্ট না থাকায় স্যালাইন কারখানাটি চালু করা হয়নি। এছাড়া কারখানাটি চালু না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে বলেও বিভিন্ন সময় আমরা শুনেছি।

সিভিল সার্জন আরও বলেন, আমরা নতুন করে কারখানাটির কাগজপত্র খুঁজে পেতে ও অধিদপ্তরসহ যথাযথ মাধ্যমে যোগাযোগ করবো। কারখানাটি চালুর ব্যাপারে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখবো।

এমএন/জেআইএম