মতামত

সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার: নিরাপদ খাদ্যে জৈব কৃষির বিকাশ

বিশ্বজুড়ে নিরাপদ খাদ্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শিল্পায়িত কৃষির বিস্তার যেমন খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়েছে, তেমনি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় জৈব কৃষি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। কেউ এটিকে ধনী শ্রেণির কৃষি বলে মনে করলেও অনেকেই এটিকে মানবসভ্যতার প্রাচীন কৃষি ব্যবস্থার আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পুনরাবিষ্কার হিসেবে দেখেন। প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত এই কৃষি পদ্ধতিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার থাকে না বা অত্যন্ত সীমিত থাকে। ফলে জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাদ্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, পুষ্টিমানসমৃদ্ধ এবং স্বাভাবিক স্বাদের বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জৈব কৃষির প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট।

Advertisement

জৈব কৃষির ধারণা মোটেও নতুন নয়। কৃষির দীর্ঘ ইতিহাসে মানুষ বহু শতাব্দী ধরে প্রকৃতিনির্ভর কৃষি পদ্ধতির ওপরই নির্ভর করেছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক কৃষির আবির্ভাবের আগে পৃথিবীর অধিকাংশ কৃষিই ছিল জৈব ভিত্তিক। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে কৃষিবিজ্ঞানীরা কৃষি উৎপাদনের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন। ব্রিটিশ কৃষিবিজ্ঞানী স্যার আলবার্ট হাওয়ার্ডকে আধুনিক জৈব কৃষির জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৯০৫ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পুসা অঞ্চলে গবেষণা পরিচালনার সময় তিনি ভারতীয় কৃষকদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেগুলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ An Agricultural Testament প্রকাশিত হলে জৈব কৃষির ধারণা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। সেই থেকে জৈব কৃষি কেবল একটি কৃষি প্রযুক্তি নয়, বরং একটি সমন্বিত কৃষি দর্শনে পরিণত হয়েছে যেখানে মাটি, পানি, উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাসও মূলত এই প্রকৃতিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল। ১৯৭০ সালের আগে পর্যন্ত কৃষিতে গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ, সবুজ সার ও কম্পোস্ট ছিল প্রধান পুষ্টি উপাদান। গ্রামীণ কৃষি ছিল একটি প্রাকৃতিক চক্রভিত্তিক ব্যবস্থা যেখানে গবাদিপশু, মাছ, গাছপালা ও কৃষিজমি একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। কৃষকেরা গরুর গোবর থেকে জৈব সার তৈরি করতেন, ফসলের খড় পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতেন এবং জমির উর্বরতা বজায় রাখতেন। কিন্তু সবুজ বিপ্লবের পর উচ্চফলনশীল জাতের ধান ও অন্যান্য ফসলের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলন বৃদ্ধি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির জৈব উপাদান কমে যাওয়া, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং কৃষি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো সমস্যাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষি গবেষকদের মতে দেশের অনেক কৃষিজমিতে বর্তমানে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ এক শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে, যেখানে একটি সুস্থ কৃষি ব্যবস্থার জন্য মাটিতে কমপক্ষে আড়াই থেকে তিন শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন।

Advertisement

একইভাবে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারও গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে দেশে বছরে প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন কীটনাশক ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৪০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন সক্রিয় বিষাক্ত উপাদান রয়েছে। ধানের জমিতেই মোট ব্যবহৃত কীটনাশকের প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহার করা হয়। ব্যবহৃত কীটনাশকের মধ্যে ছত্রাকনাশক প্রায় ৪৫ শতাংশ, কীটনাশক প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং আগাছানাশক প্রায় ১৫ শতাংশ। দেশে হাজার হাজার ধরনের কীটনাশক নিবন্ধিত রয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত কিছু কীটনাশক এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে।

অনেক ক্ষেত্রে সবজি উৎপাদনের সময় কৃষকেরা এক মৌসুমে দশ থেকে ত্রিশবার পর্যন্ত কীটনাশক প্রয়োগ করেন, যা খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত উপাদান প্রবেশের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বাজারজাতকরণ পর্যায়েও ফল, সবজি ও মাছ দীর্ঘদিন তাজা রাখতে ফরমালিনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকার বাজার থেকে সংগৃহীত মাছের প্রায় অর্ধেক নমুনায় ফরমালিন রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে রুই মাছের প্রায় ৭০ শতাংশ নমুনায় এটি শনাক্ত হয়েছে। মৌসুমি ফলের ক্ষেত্রেও একই উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায়। এক গবেষণায় রাজধানীর বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় ৯৩.৭৫ শতাংশ আমের নমুনায় ৭ থেকে ২৮ পিপিএম পর্যন্ত ফরমালিন পাওয়া গেছে। এসব রাসায়নিক খাদ্যের গুণগত মান নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পরিবেশসম্মত জৈব কৃষির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে জৈব কৃষির বিকাশ তাই অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে যেখানে পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খামারকে কৃষির সঙ্গে যুক্ত করে জৈব সারের একটি টেকসই উৎস তৈরি করা যায়। একই সঙ্গে জৈব কৃষিপণ্যের মান নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্মত সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারের নীতি সহায়তা, গবেষণা কার্যক্রম, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং বাজার উন্নয়নের মাধ্যমে জৈব কৃষিকে একটি শক্তিশালী খাতে রূপান্তর করা সম্ভব। কৃষক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও ভোক্তা সবাই যদি সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসে, তবে জৈব কৃষির বিকাশ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

এই বাস্তবতায় নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নটি এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং চার লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য দূষণ ও অনিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এই সমস্যা আরও তীব্র। বাংলাদেশেও প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। খাদ্যশৃঙ্খলে অতিরিক্ত কীটনাশক, ভারী ধাতু ও জীবাণুর উপস্থিতি এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য কৃষি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি এবং সেই পরিবর্তনের অন্যতম পথ হতে পারে জৈব কৃষির বিস্তার।

Advertisement

বিশ্বব্যাপী জৈব কৃষি বর্তমানে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ১৯০টি দেশে জৈব কৃষি চর্চা হচ্ছে এবং প্রায় ৯৯ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। একই সঙ্গে জৈব খাদ্যের বৈশ্বিক বাজারমূল্য ইতোমধ্যে ১৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে এবং প্রতি বছর গড়ে আট থেকে দশ শতাংশ হারে এই বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও জাপান বিশ্বের বৃহত্তম জৈব খাদ্য বাজারের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব দেশে ভোক্তারা ক্রমেই স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব খাদ্যের দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশেও জৈব কৃষিপণ্যের বাজার ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয় এবং জৈব কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের জৈব চা, মসলা, ফল, সবজি ও ভেষজ পণ্য ইতোমধ্যে জার্মানি, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

তবে জৈব কৃষির সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রচলিত কৃষি পদ্ধতির তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদন পাঁচ থেকে ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনুপস্থিতি এবং মাটির জৈব ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জৈব কৃষি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে যে দীর্ঘ সময় ধরে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি পায়, মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ে এবং কৃষি উৎপাদনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয়। এই কারণে জৈব কৃষিকে শুধু একটি বিকল্প কৃষি পদ্ধতি নয়, বরং টেকসই কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়।

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে জৈব কৃষির বিকাশ তাই অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে যেখানে পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খামারকে কৃষির সঙ্গে যুক্ত করে জৈব সারের একটি টেকসই উৎস তৈরি করা যায়। একই সঙ্গে জৈব কৃষিপণ্যের মান নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্মত সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারের নীতি সহায়তা, গবেষণা কার্যক্রম, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং বাজার উন্নয়নের মাধ্যমে জৈব কৃষিকে একটি শক্তিশালী খাতে রূপান্তর করা সম্ভব। কৃষক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও ভোক্তা সবাই যদি সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসে, তবে জৈব কৃষির বিকাশ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

লেখক: কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।rssarker69@gmail.com

এইচআর/জেআইএম