দেশজুড়ে

রাতের আঁধারে লোনাপানি ঢুকিয়ে ১০ হাজার বিঘা ফসলি জমি নষ্ট

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দীর্ঘদিন ধরেই উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা লড়ছে লবণাক্ততার সঙ্গে। ঘূর্ণিঝড়, ভাঙা বেড়িবাঁধ আর জোয়ারের পানিতে বারবার কৃষি জমি নষ্ট হওয়ার পর নানা উদ্যোগে যখন চাষাবাদ কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক সেইসময় আশাশুনি উপজেলায় রাতের আঁধারে স্লুইসগেট খুলে লোনাপানি প্রবেশ করানোর ঘটনায় নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।

Advertisement

স্থানীয়দের অভিযোগ, কালকি স্লুইসগেটের পাট তুলে দিয়ে দুর্বৃত্তরা কপোতাক্ষ নদের লোনা পানি খাল হয়ে অন্তত ৮টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার বিঘা ধানক্ষেতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এতে খাজরা ও বড়দল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মৌসুমের শেষ ধানের ফসল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গজুয়াকাটি, রাউতাড়া, গোয়ালডাঙ্গা, পিরোজপুর, খালিয়া, ফটিকখালীসহ বিভিন্ন গ্রামে মাঠজুড়ে এখন লোনা পানির স্তর। অনেক জমিতে ধান কাটা শেষ হয়নি, তার আগেই পানিতে ডুবে গেছে ক্ষেত। কোথাও কোথাও পুকুরও লবণাক্ত পানিতে ভরে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত গজুয়াকাটি গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক শিবপ্রসাদ মণ্ডল জানান, প্রায় ১৫ দিন আগে রাতের আঁধারে স্লুইসগেটের পাট তুলে দেওয়া হয়। এতে আমাদের পূর্ব ও পশ্চিম বিলের শত শত বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। গাছপালাও মারা যাচ্ছে।

Advertisement

কৃষক সতীশ চন্দ্র বৈদ্য বলেন, ধান কাটার কাজ এখনও শেষ হয়নি। এর মধ্যে লোনা পানি ঢুকে সব শেষ করে দিচ্ছে। এখন শুধু ফসল নয়, খাওয়ার পানি আর গবাদিপশুর জন্যও সংকট দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের হিসাবে, শুধু রাউতাড়া গ্রামেই প্রায় ১৫০০ বিঘা জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া গোয়ালডাঙ্গা, পিরোজপুর, দূর্গাপুর, খালিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামে আরও হাজার হাজার বিঘা জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

ইউপি সদস্য রামপদ সানা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে এই পানি প্রবেশ করছে, অথচ অনেক ক্ষেতের ধান তখনও কাটা হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র মাছ ধরার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে স্লুইসগেট খুলে দিয়েছে।

Advertisement

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, গেট নিয়ন্ত্রণ করে একটি প্রভাবশালী মহল, যারা ভারি যন্ত্র ব্যবহার করে গেটের পাট তুলেছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ দায় স্বীকার করেনি।

খাজরা ইউনিয়ন নদী-খাল সুরক্ষা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব হাবিবুর রহমান বলেন, স্লুইসগেট সংস্কারের পর কোনো তদারকি কমিটি নেই। এই সুযোগে কুচক্রী মহল লোনা পানি ঢুকিয়ে মাছ ধরছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামা নন্দ কুন্ডু জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোনা পানি প্রবেশ, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনার কারণে উপকূলীয় কৃষি ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সরকার নানা প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালালেও এ ধরনের মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ সেই প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত স্লুইচগেট বন্ধ করে পানি নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমি পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উপকূলের এই জনপদে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

আহসানুর রহমান রাজীব/এফএ/এমএস