অর্থনীতি

নীতিমালা ভেঙে বন্দরের কাছেই ডিপো, প্রশ্নের মুখে কাস্টমস-বন্দর

নিজেদের তৈরি নীতিমালা নিজেরাই ভাঙছে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস। নীতিমালা ভঙ্গ করে চট্টগ্রাম নগরের মধ্যে বন্দর স্থাপনার কাছেই নতুন বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর অনুমোদন দিয়েছে সংস্থাটি দুটি। ডিপোতে সম্প্রতি খালি কনটেইনার অপারেশনও শুরু হয়েছে।

Advertisement

অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালীদের সঙ্গে বন্দর-কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পরস্পর যোগসাজশে ডিপো নির্মাণ ও কার্যক্রমের অনুমোদন দেওয়া হয়। 

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মেসার্স শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার টার্মিনাল লিমিটেড (এসএমআরসিটিএল) নামে বেসরকারি ডিপো তৈরিতে নানান অনিয়মের তথ্য।

২০০২ সালের অনাপত্তিতে ২৪ বছর পর বন্দরের অনুমোদন

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০২ সালে চট্টগ্রাম নগরীর সিমেন্ট ক্রসিং এলাকায় মেসার্স শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার টার্মিনাল লিমিটেড (এসএমআরসিটিএল) নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি ডিপো নির্মাণের জন্য অনাপত্তি দেয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। ওই অনাপত্তির ওপর ভিত্তি করে ২০২৪ বছর পর ২০২৫ সালে আবার অনাপত্তি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে পুরাতন ডিপো থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে নতুন ডিপোর অনুমোদন পায়। ব্যস্ততম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে ডিপোটি সীমিত পরিসরে অপারেশনও শুরু করেছে।

Advertisement

নীতিমালাকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’

কাস্টমসের ‘বেসরকারি আইসিডি/সিএফএস বা অফডক স্থাপন ও পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২১’ এবং বন্দরের ‘বেসরকারি আইসিডি/সিএফএস নীতিমালা ২০১৬’ অনুযায়ী বন্দর স্থাপনার ২০ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ডিপো স্থাপনের সুযোগ নেই। আবার একটি নতুন ডিপো করতে হলে সর্বনিম্ন ১৫ একর জমি প্রয়োজন। নীতিমালার এই দুটি ধারা রহিত করে শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার ডিপোটি অনুমোদন দেয় কাস্টমস।

নতুন কনটেইনার ডিপো কাস্টমসের এক ফাইলে ২৪ বছরের নথি

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের সাধারণ বন্ড শাখার শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নথিটি পর্যালোচনায় দেখা যায়- ডিপো পরিচালনার জন্য ২০০১ সালের ৯ আগস্ট বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমোদন (নিবন্ধন নম্বর-২০০১০৮০৮) পান হাজি আহমদুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক ঠিকানা দেখানো হয় ১২৪, নতুন চাক্তাই।

কাস্টমস বন্ড লাইসেন্স দেওয়ার পর আমাদের অনাপত্তি না দিয়ে উপায় নেই। আগে লাইসেন্স বাতিল কিংবা কাস্টমস থেকে ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরত চাওয়ার কোনো তথ্য আমাদের জানানো হয়নি।-চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম 

পরবর্তীসময়ে ২০০২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠানটিকে বেসরকারি ডিপো হিসেবে খালি কনটেইনার (সর্বোচ্চ ১৫৬৮ টিইইউস) অপারেশনের অনুমোদন দিয়ে বন্ড লাইসেন্স দেয় কাস্টমস। একই বছরের ২১ অক্টোবর ডিপোটি স্থাপনে অনাপত্তি দেয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। অনুমোদন পেলেও ওই সময়ে ডিপো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না প্রতিষ্ঠানটির। পরে ২০০৫ সালের আগস্ট মাসে ডিপোটির বন্ড লাইসেন্স সাসপেন্ড (স্থগিত) করে কাস্টমস। ওই মাসেই লাইসেন্স বাতিলের আবেদন করে ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরত চান আহমদুর রহমান।

Advertisement

আরও পড়ুন

‘বসে বসে মাছি মারছে, তেলের কাস্টমার নাই’বিদ্যুৎ উৎপাদনের তেলেও টান, লোডশেডিংয়ে নাজেহালকনটেইনার সংকটে টালমাটাল আমদানি-রপ্তানি

এরপর প্রায় ৯ বছরের বেশি সময় ধরে বিষয়টি কাস্টমসে ঝুলে থাকে। পরে ২০১৪ সালের ১৬ নভেম্বর কাস্টমসের কাছ থেকে পুনরায় ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরত চায় প্রতিষ্ঠানটি। পরের ছয় মাসের মাথায় হঠাৎ উল্টো মোড় নেয় পুরো বিষয়টি। ২০১৫ সালের ৩১ মে ডিপোটি পুনরায় চালুর আবেদন করা হয়। তখন প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে মো. আকতার কামাল কাস্টমসে আবেদন করেন। এরপরও কাস্টমস বিষয়টি নিয়ে না এগোলেও ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের পর একটি প্রভাবশালী পক্ষ যুক্ত হয় এতে। ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি ইয়ার্ডটি সিমেন্ট ক্রসিং এলাকা থেকে পূর্ব পতেঙ্গা মৌজার স্থানান্তরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আবেদন করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব বোর্ড মতামত চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল ওই কমিটি পরিদর্শন প্রতিবেদন দেয়। পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার টার্মিনালের পক্ষে ২০০৫ সালে এবং ২০১৪ সালে টার্মিনালটি লাইসেন্স বাতিলের আবেদন এবং পিজি ফেরত চাওয়ার তথ্য গোপন করে প্রতিবেদনটি দেয় কাস্টমসের কমিটি।

শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার ডিপো স্থানান্তরের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। চট্টগ্রাম কাস্টমস রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে বন্ড লাইসেন্স দিয়েছে।-চট্টগ্রাম কাস্টমসের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার (প্রিভেন্টিভ) শরীফ মোহাম্মদ আল আমীন

সবশেষ ২০২৫ সালের ১৯ মে নীতিমালার ৫ খ.২ (খ) এবং (গ) ধারা রহিত করে পূর্ব পতেঙ্গা মৌজায় টার্মিনালটি স্থানান্তরের অনুমোদন দেয় এনবিআর। ধারাবাহিকভাবে ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর স্থানান্তরিত স্থানে ১০ দশমিক শূন্য ৬ একর জমিতে বেসরকারি ডিপো পরিচালনার অনাপত্তি দেয় চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন বিভাগ। গত বছরের ২৭ নভেম্বর ডিপোর অনুমোদন দেয় চট্টগ্রাম কাস্টমস।

বেসরকারি অফডক নীতিমালার ৫ খ.২ (খ) এবং (গ) ধারায় কী আছে

বেসরকারি আইসিডি/সিএফএস বা অফডক স্থাপন ও পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২১’-এর ৫ খ.২ (খ) উপধারায় রয়েছে- ‘আইসিডি/অফডকের আয়তন অন্তত ১৫ একর হতে হবে।’ ৫ খ.২ (গ) উপধারায় রয়েছে- ‘প্রস্তাবিত আইসিডি/সিএফএস বন্দর এলাকা থেকে অন্তত ২০ কিমি দূরে অবস্থিত হতে হবে।’

মালিকপক্ষ যা বলছে

ডিপোটির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে রয়েছেন রিলায়েন্স শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিকস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. রাশেদ। শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার টার্মিনালের বিষয়ে জানতে চাইলে জাগো নিউজকে বলেন, ‘লাইসেন্সটি ছিল আশির দশকের। জায়গা কম থাকায় ডিপোটি পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। এখন বড় জায়গা নিয়ে ডিপো পরিচালনার জন্য এনবিআরে আবেদন করি। এনবিআর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি দেয়।’

কাস্টমস ও বন্দর নীতিমালা ভঙ্গ করে চট্টগ্রাম নগরীর মধ্যে একের পর এক বেসরকারি কনটেইনার ডিপো অনুমোদন দিচ্ছে। এখন বিমানবন্দর সড়কের চলাচলের একমাত্র পথের মুখে নতুন ডিপোটি দেওয়ায় বন্দরের পুরো অপারেশন বাধাগ্রস্ত করবে। কারণ ওখানে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল হয়েছে, পাশে লালদিয়ায় টার্মিনাল হচ্ছে। এই টার্মিনালগুলো অপারেশনে গেলে ওই সড়কটি একেবারে কলাপ্স হয়ে যাবে।-পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া

ডিপো নির্মাণ ও পরিচালনার আবেদনের ক্ষেত্রে তথ্য আড়াল করার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। বলেন, ‘আবেদনের পর বন্দর ও কাস্টমস কমিটি গঠন করে একাধিকবার পরিদর্শন করে আমাদের সক্ষমতা দেখেছেন। এখন আমরা শুধু খালি কনটেইনার অপারেশন করে বন্দর কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছি। বন্দরে খালি কনটেইনার রাখার জায়গা নেই।’

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক ঠিকানার অস্তিত্ব নেই

অনুসন্ধানে জানা যায়, মেসার্স শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার টার্মিনাল লিমিটেডের মূল মালিক আহমদুর রহমান গত বছর মারা যান। ডিপোর অফিসিয়াল ঠিকানা ১২৪, নতুন চাক্তাই ঠিকানাটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আহমদুর রহমানের ছেলে মোরশেদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা দুই কানি জায়গায় ডিপোটি করেছিলাম। অনেক আগে ডিপোর জায়গা অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছি।’

বন্দর ও কাস্টমস যা বলছে

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তির ওপর ভিত্তি করে বন্দর থেকেও অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে।’

একই অনাপত্তিতে ভিন্ন জায়গায় ডিপোর অনুমোদনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কাস্টমস বন্ড লাইসেন্স দেওয়ার পর আমাদের অনাপত্তি না দিয়ে উপায় নেই। আগে লাইসেন্স বাতিল কিংবা কাস্টমস থেকে ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরত চাওয়ার কোনো তথ্য আমাদের জানানো হয়নি।’

চট্টগ্রাম কাস্টমসের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার (প্রিভেন্টিভ) শরীফ মোহাম্মদ আল আমীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার ডিপো স্থানান্তরের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। চট্টগ্রাম কাস্টমস রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে বন্ড লাইসেন্স দিয়েছে।’

শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া কনটেইনার টার্মিনালটিকে ওয়্যারহাউজ স্টেশন হিসেবে ঘোষণা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ওই প্রজ্ঞাপন জারি করেন রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব (কাস্টমস-রপ্তানি ও বন্ড) মো. আল আমিন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনুমোদন দেয় বোর্ড। বোর্ডের নির্দেশনা অনুসারে পত্র ইস্যু করেছি।’

সমালোচকরা কী বলছেন

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের যতটুকু আশা ভরসা ছিল যে দেশ এগিয়ে যাবে, মনে হচ্ছে সবকিছুই শেষ হয়ে যাচ্ছে। আইন সবার জন্য সমান- একথা সঠিক নয়। যারা প্রভাবশালী, প্রতিপত্তিশালী, যারা ক্ষমতাবলিষ্ঠ, তাদের জন্য আইন রচিত হয়, আইন পরিবর্তিত হয়।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি ডিপো নির্মাণের জন্য এক জায়গায় অনাপত্তি দিয়ে আরেক জায়গায় অনুমোদন দেওয়াটা একটি অনিয়ম। দুর্নীতির আশ্রয়ে যা খুশি তা হচ্ছে। রাজস্ব বোর্ড চাইলেই তো একটি নীতিমালার শর্ত শিথিল করতে পারে না।’

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘কাস্টমস ও বন্দর নীতিমালা ভঙ্গ করে চট্টগ্রাম নগরীর মধ্যে একের পর এক বেসরকারি কনটেইনার ডিপো অনুমোদন দিচ্ছেন। এখন বিমানবন্দর সড়কের চলাচলের একমাত্র পথের মুখে নতুন ডিপোটি দেওয়ায় বন্দরের পুরো অপারেশন বাধাগ্রস্ত করবে। কারণ ওখানে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল হয়েছে, পাশে লালদিয়ায় টার্মিনাল হচ্ছে। এই টার্মিনালগুলো অপারেশনে গেলে ওই সড়কটি একেবারে কলাপ্স হয়ে যাবে।’তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই প্রভাবশালী কেউ করছে। সরকারের উচিত বিষয়টিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। না হলে বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যাতায়াতও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’

এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ