তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ আমাদের প্রত্যেকের দাবি আছে, প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা অনেক উচ্চ। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদেও যতটুকু আছে, তার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের জন্য যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ঘোষণা দেয়, তখন সেটাও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা। জুলাই জাতীয় সনদ লিখিত আছে, এখান থেকে কারও পিছিয়ে যাওয়ার জায়গা নাই। রক্তে লেখা দলিল, এই সংসদ জুলাই জাতীয় সনদের রক্তের জন্য আবদ্ধ।
Advertisement
সোমবার (২৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশন জুলাই সদন নিয়ে এসব কথা বলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৬ জুলাই বিএনপি মহাসচিব সংবাদ সম্মেলন করে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন। এই কথাগুলো রেকর্ডে থাকা দরকার। হ্যাঁ, একটা সময় এসে যখন ফ্যাসিবাদীরা বললো যে এটা বিরোধীদলের আন্দোলন, বিরোধীদল হাইজ্যাক করছে, তখন কৌশলগত কারণে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আমি ব্যক্তিগতভাবে তার সাক্ষ্য দিতে পারি।
তিনি বলেন, বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল যে, আমাদের এমনভাবে অবস্থান নিতে হবে যেন ফ্যাসিবাদীরা পুরোনো কৌশলে আন্দোলন ধ্বংস করতে না পারে। তারপরও আমরা দেখেছি কীভাবে তারা নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা পর্যন্ত তারা গেছে। রীতিমতো ব্রাশফায়ার করে মানুষ মেরেছে। শহীদের সংখ্যা নিয়ে এই বিতর্ক খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। এটা মাঝখানে বলে রাখলাম, শহীদের প্রত্যেকটি সংখ্যা কেবল তারা সংখ্যা নয়—একেকটি মানুষ, একেকটি জীবন, একেকটি স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের জায়গাগুলোকে আমরা যেন সংরক্ষণ করি এবং তাদের মর্যাদা দেই, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত করি।
Advertisement
জোনায়েদ সাকি বলেন, এই যে অভ্যুত্থান, সেই অভ্যুত্থান যা ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। এটা মানুষের আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছিল। তার রূপ হিসেবে আমরা সবাই মিলেই প্রস্তাব দিয়েছিলাম, এ কথা আবারও বলছি রেকর্ডের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে, ঐকমত্য অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হবে এটাকে ফ্যাসিলিটেট করা, এই যে সবারর আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা। ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়েছে। তার ইতিহাসটা এখানে রেকর্ড থাকা দরকার ছিল, যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে যেহেতু তিনি প্রতিটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, অনেক কথা বলেছেন।
সংসদে ঐকমত্য কমিশন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী সাকি বলেন, ঐকমত্য কমিশনের কাজ ছিল ঐকমত্য তৈরি করা। যখন প্রথমদিকে আলোচনা শুরু হলো এবং প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধানে বদলানো, সেখানে আলোচনা ঠিক হলো, সেই দিনই ঠিক হয়েছিল। সেদিন বলা হয়েছিল যে, নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া যাবে। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো বলেছিল দুটি এক্সেপশন রেখে আস্থা ভোট এবং বাজেট (অর্থবিল)। এই দুটো বিষয় রেখে ৭০ অনুচ্ছেদ করা। বিএনপিসহ আরও কয়েকটি দল বলেছিল আরও দুটো জিনিস যুক্ত করা দরকার, জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সংবিধান সংশোধন। তখন প্রশ্ন এসেছিল যে, এখানে সমাধানের পদ্ধতি হবে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া যাবে এবং দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে তাদের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করবেন। যে দল বিজয়ী হবে, তাদের চিন্তা তারা বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং সেটাই জুলাই জাতীয় সনদে লেখা হয়েছে। দিস ইজ নাম্বার ওয়ান, ইট শুড বি রেকর্ডেড।
‘নাম্বার টু: জুলাই জাতীয় সনদ নোট অব ডিসেন্টসহই আমরা স্বাক্ষর করেছি। প্রশ্ন ছিল সবাই আস্বস্ত হবেন এবং যে দল বিজয়ী হবে তারা তাদের মতো করে করবে। তারপর আসলো বাস্তবায়নের প্রশ্ন। বাস্তবায়নের প্রশ্নে এসে, হ্যাঁ এটা ঠিক গণসংহতি আন্দোলনের পক্ষ থেকে ২৮ জুলাই ২০২৩ সালে আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা দাবি তুলেছিলাম। কিন্তু আমরা কখনোই এটা বলিনি যে আমরা যা বলেছি সেটাই বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা সবসময় বলেছিলাম যে, একটা ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া এই ট্রানজিশন এগোতে পারবে না।’
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যে আজকে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল কিনা। আমরা দেখেছি বাস্তবায়ন প্রশ্নে যখন অনৈক্য, তখন ঐকমত্য কমিশন তাদের মতো করে কিন্তু একতরফা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এবং সেই সিদ্ধান্ত সবার মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করেনি। ফলে গণভোটে কে কীভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন, তার অবস্থান কিন্তু প্রত্যেক দল নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, কেউ হয়তো আদেশ বাস্তবায়নের জন্য বলেছেন। এই বিতর্ক আমরা নিজের মধ্যে রেখেছি। রাজনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তন একটা অব্যাহত প্রক্রিয়া। সময়ের প্রয়োজনে, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনেই রাজনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্ন আসে।
Advertisement
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের চিত্র সংসদে তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জন্ম বছরের অন্তত একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষভাবে গত ১৭ বছর আমরা দেখেছি দিনে দিনে ক্রনি ক্যাপিটালিজম কীভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে পোষ্য অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। কীভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে ধন-সম্পদ লুট করে নিজেদের ব্যক্তিগত পকেটে ঢোকানো আর বিদেশে পাচার করার জায়গা তৈরি হয়েছে। এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যদি বহাল থাকে, তাহলে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না। এবং এই ধরনের অর্থনীতি ব্যবস্থা একটা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থাকেই তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে তোলে। আমরা পরিষ্কারভাবে সে কারণে মনে করি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রশ্ন এই যে রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। ৩১ দফা এবং তার পরবর্তীতে জুলাইয়ের এই যে প্রশ্ন এবং আমরা যদি দেখি আমাদের যুগপৎ জোট এবং বিএনপির যে নির্বাচনি ইশতেহার; বাংলাদেশে একটা অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করেছিল।
দেশের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম কথা হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষা খাতকে এমনভাবে আনা হয়েছে যেন আমাদের দেশের মানুষ আগে স্বস্তিতে থাকে। দ্বিতীয় কথা মানুষের আয় যেন বাড়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আর একদিকে বিনিয়োগ নির্ভর কর্মসংস্থানমুখী একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিগত সময়ে এডিপি ও প্রকল্পের অনিয়ম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই দেশে আমরা দেখেছি এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) নেওয়া হয় কিন্তু এডিপি বাস্তবায়ন হয় না। অথবা প্রকল্প এমনভাবে নেওয়া হয় নানা রকম ইন্টারেস্ট গ্রুপ প্রকল্পের মধ্যে তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করে। পুরো কাঠামোগত বদল আনা হচ্ছে, যে কাঠামোগত বদলে এই দেশে পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের যেমন জনগণের উপকারে আসবে, তেমনি একই সঙ্গে তা বেসরকারি বিনিয়োগকেও চাঙ্গা করবে, উৎসাহিত করবে। এই অর্থনৈতিক নীতি দর্শনে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে নেবে। কিন্তু কেবল সেটা অর্থনীতির আকারেই বড় নয়, একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা; যেখানে দেশের শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষ যারা গরিব মানুষ তারা অন্তর্ভুক্ত হবেন। এবং কেবল অন্তর্ভুক্ত নয়, নাগরিক মর্যাদায় বাঁচার মতো মর্যাদা নিয়ে থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, এই সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দৃষ্টান্ত আপনাদের সামনে হাজির করে বলবো যে কীভাবে ডিরেকশন চেঞ্জ হচ্ছে। বিদ্যমান জ্বালানি সংকট চলছে আন্তর্জাতিক কারণে। আমরা এই সরকারকে দেখেছি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় যে, একটা ক্রাইসিস কীভাবে অপরচুনিটিতে পরিণত হতে পারে। অপরচুনিটিতে পরিণত করার জন্য, সংকটকে সুযোগে পরিণত করার জন্য এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাপেক্সকে শক্তিশালী করে রিগ কিনে আমাদের দেশে যে পরিমাণ গ্যাস আছে যা এরই মধ্যে নানাভাবে কাজে লাগানোর কাজ চলমান আছে। আমরা দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে চাই, আমরা সব কিছু আমদানিমুখী হতে চাই না।
এমওএস/ইএ