সাহিত্য

বিজয়ী অথবা পরাজিত

রাত এগারোটার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে নাহার টেবিলে পড়তে বসলো। টেবিলের ওপর কার্ল মার্কসের তিনটি বই, ভাঁজ করা নোট খাতা আর একটা ঠান্ডা চায়ের কাপ; যেটায় চুমুক দিতে সে ভুলে গেছে। বাইরে ঢাকার রাস্তায় গাড়ির হর্ন এখনো থামেনি! যেন শহরটা কখনো ঘুমায় না, যেন এই শহরের ঘুমানোর কোনো অধিকার নেই, ঘুমালে পিছিয়ে পড়তে হয়। মোহাম্মদপুরের এই একতলা বাসায় তার মাত্র একটা কামরা। দেওয়ালে বর্ষার ছোপ, ছাদে একটা ফ্যান; যেটা ঘোরে কিন্তু বিশেষ হাওয়া দেয় না। বাড়িওয়ালার স্ত্রী প্রথম দিনই বলেছিলেন, ‘আপা, আপনি মেয়েমানুষ। একা। রাত দশটার পরে যেন কেউ না আসে।’ নাহার সেদিন শুধু হেসেছিল। রাত দশটার পরে কে তাকে দেখতে আসে।

Advertisement

সে এমফিল করছে অর্থনীতিতে। সমস্ত শিক্ষাজীবনে মেধার স্বাক্ষর রেখেই শিক্ষাজীবন শেষ করেছে। দুটো গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে জমা পড়ে আছে পর্যালোচনার অপেক্ষায়। পাঁচটা সেমিনারে পেপার পড়েছে, দেশে-বিদেশে। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে প্রচণ্ড আদর্শবাদী ও অন্তর্মুখী নাহারের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির স্থায়ী পদ নেই। চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক, প্রতি সেমিস্টারে নবায়ন। মা প্রতিদিন ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, ‘বিয়ের কী হলো?’ বিভাগীয় প্রধান মনে করিয়ে দেন আসন্ন সেমিস্টারে কোর্স কমছে, ‘দেখা যাক।’ আর রাইহান, তার তিন বছরের পুরোনো প্রেমিক রাইহান প্রায়ই বলে, ‘তুমি একটু প্র্যাকটিক্যাল হও না কেন!’

ফোনটা বেজে উঠলো। রাইহান। সে প্রথমে ধরলো না। বইয়ের পাতায় চোখ রাখলো কিন্তু শব্দগুলো আর ঢুকছিলো না মগজে। দেওয়ালের দিকে তাকালো। পুরোনো পোস্টার, চে গুয়েভারার মুখ, ছাত্রজীবন থেকে আছে। বয়সে জীর্ণ হয়েছে কাগজ কিন্তু সরায়নি। ফোন আবার বাজছে।‘হ্যালো।’‘কী করছো?’ রাইহানের গলায় সেই নিশ্চিন্ত সুর, যে সুরে কথা বলে মানুষ যখন সে জানে পৃথিবীটা তার জন্যই বানানো।‘কার্ল মার্কস পড়ছি।’‘আবার মার্কস?’ হাসির শব্দ এলো। ‘নাহার, মার্কসের উপযোগিতা কবে মরে গেছে। এখন এই পুঁজিবাদী সমাজে ওসব আদর্শবাদের কেউ ধার ধারে না। যারা সমাজতান্ত্রিক, তারাও না। সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট।’

নাহার চুপ করে রইলো। এই বাক্যটা সে আগেও শুনেছে। রাইহানের মুখে। মায়ের মুখে। বিভাগীয় প্রধানের মুখে। যেন একটাই স্ক্রিপ্ট, সবাই একই পাঠ মুখস্থ করেছে, সবাই একই ভাষায় কথা বলছে; পুঁজিবাদের ভাষা, বাজারের ভাষা।‘কাল আসবে?’ নাহার জিজ্ঞেস করলো।একটু থামলো রাইহান। ওই ক্ষণিক নীরবতায় নাহার যা বুঝলো, সেটা বলতে দিলো না নিজেকে।‘দেখি। সিঙ্গাপুর থেকে একটা ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম আসছে ঢাকায়। মিটিং আছে। যে করেই হোক অন্যান্য ডিলারদের থেকে এগিয়ে থাকতে হবে।’‘আর যারা পিছিয়ে পড়বে?’‘তারা হারবে। এটাই নিয়ম।’

Advertisement

নাহার ফোন রেখে দিলো। টেবিলের বইটার দিকে তাকালো। এঙ্গেলস লিখেছিলেন দ্বন্দ্বই গতির মূল উৎস, থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিনথেসিস। কিন্তু রাইহানের দর্শনে কোনো সিনথেসিস নেই। শুধু বিজয়ী আর পরাজিত। শুধু যে টেবিলে বসে খায়, আর যে মেঝে থেকে কুড়িয়ে নেয়।

সকালে ঘুম ভাঙলো পাশের ঘরের শিশুর কান্নায়। নাহার উঠে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। চোখের নিচে কালো দাগ, চুলে রাতের জট। আটাশ পেরিয়ে ঊনত্রিশে পড়া একটা শরীর, যার থেকে প্রতিদিন কিছু না কিছু নেওয়া হচ্ছে; ঘুম, সময়, স্বপ্ন! আর বদলে কিছু দেওয়া হচ্ছে না।

বাজার করে ফিরতে ফিরতে মোড়ে নতুন একটা বিলবোর্ড দেখলো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপন, ‘সাফল্যই লক্ষ্য, আমরা তোমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবো।’ ছবিতে হাসিমুখ তরুণ-তরুণী, পেছনে চকচকে কাচের দালান। কোথাও লেখা নেই সফলতার ভিড়ে কে পিছিয়ে পড়বে। কোথাও লেখা নেই যে, এসব প্রতিষ্ঠানে মেধার চেয়ে পুঁজি বেশি কথা বলে।

আরও পড়ুনউম্মে মাহবুবা ইমার গল্প: জীবনের লক্ষ্যের খোঁজে 

বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দেখলো বিভাগীয় প্রধান বেরিয়ে আসছেন তার কামরা থেকে। তার মুখ দেখেই বোঝা গেলো ভালো কিছু নয়। ‘নাহার আপা, আগামী সেমিস্টারে বাজেট কমছে। ম্যানেজমেন্ট কিছু কোর্স একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তিনি একটু ইতস্তত করলেন। ‘আপনি কি অন্য কোথাও দেখছেন? মানে, পার্টটাইম কিছু?’ চুক্তি নবায়ন হবে না, এটুকু বুঝতে অসুবিধা হলো না নাহারের।সে শুধু বলল, ‘দেখবো।’ক্লাসে ঢুকলো।সামনের সারির একটা ছেলে প্রশ্ন করলো, ‘ম্যাডাম, মার্ক‌সবাদ কি এখনো এই বৃহত্তর বিশ্ব বাজারের জন্য প্রাসঙ্গিক? ব্যক্তিক প্রতিযোগিতা না থাকলে তো উন্নতি করার বা সম্পদ অর্জনের তাড়না থাকবে না মানুষের। আমার বাবা বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে এই তত্ত্বের কোনো শক্ত ভিত্তি নেই।’নাহার থামলো। বোর্ডে না লিখে সরাসরি ক্লাসের দিকে ঘুরলো।‘তোমাদের কেউ কি কখনো ভেবেছো, কেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একজন ভালো চাকরি পায়, আরেকজন পায় না? কেন মেধাবী হলেই যথেষ্ট হয় না? কেন প্রতিদিন এত কাজ করেও মনে হয় পিছিয়ে পড়ছো? কেন কৃষক বিপুল শ্রম দিয়েও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে ঘুরে মরে, আর সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা সে ফসল বিক্রি করে ফুলে ফেঁপে ওঠে? কেন একদিকে সম্পদের প্রাচুর্য আর কেনইবা অন্যদিকে অনাহারীর হাহাকার? কেন ঈদের সময়ে পোশাক শ্রমিকেরা বেতন পায় না, গ্রামের বাড়ি যেতে পারে না, আর তাদের শ্রমে অর্জিত সম্পদ দিয়েই বিলাসযাপন করে মালিকপক্ষ?’কেউ কথা বললো না।‘মার্কস ওই প্রশ্নটাই করেছিলেন। এবং সেই প্রশ্নের উত্তরের পথ এখনো সুগম হয়নি। কাজেই মার্কসবাদ মরেনি। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় পড়েছো না—‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্তআমি সেই দিন হব শান্ত,যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্তআমি সেই দিন হব শান্ত!’যতদিন উৎপীড়িতের কান্না থাকবে পৃথিবীতে, সে কান্না থামানোর জন্য মার্কসবাদও থাকবে।’ পেছনের সারিতে সিনথিয়া হাত তুললো। চুপচাপ মেয়ে, কম কথা বলে। ‘ম্যাডাম, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ মানে কি শুধু শ্রেণিসংগ্রাম?’‘না। মানে হলো, যে কোনো দ্বন্দ্ব থেকে একটা নতুন কিছু জন্মায়। সংঘাত মানেই ধ্বংস নয়, সংঘাত মানে রূপান্তর। একটা আশা থেকে যায়।’ঠিক তখনই পকেটে ফোন কাঁপলো। রাইহানের ফোন। ‘আসব আজ সন্ধ্যায়।’

Advertisement

সন্ধ্যায় রাইহান এলো পরিপাটি শার্ট পরে।চায়ের কাপে চুমুক দিলো। ঘর দেখলো। চে গুয়েভারার পোস্টারের দিকে এক মুহূর্ত তাকালো, মুখে কিছু বললো না। তারপর বললো, ‘নাহার, তোমাকে সৎভাবে একটা কথা বলতে চাই।’নাহার সোফায় বসলো। দুই হাত কোলে রাখলো। শুনলো। নাহার জানে রাইহান কী বলবে! তাও চুপ করে রইলো।‘আমার বসের মেয়ে শান্তা, বসের পরিবার থেকে একটা প্রস্তাব এসেছে। তোমাকে না বলে এগোনো ঠিক হবে না, তাই...’‘তুমি রাজি হয়ে গেছো।’‘এখনো না। কিন্তু ভাবছি।’‘ভাবছো?’রাইহান একটু বিরক্ত হলো। ‘নাহার, বাস্তবতা দেখো। তোমার চাকরির নিশ্চয়তা নেই, ভবিষ্যৎ নেই। আমার পরিবারের জন্য ক্যারিয়ারের এই সময়ে আমার পাশে এমন কাউকে দরকার যে সাপোর্ট করবে, যে...’‘পুঁজি বিনিয়োগ করবে?’রাইহান চুপ করে গেলো।‘তুমি একটা সম্পর্ককেও বাজারের পণ্য করে দেখছো। সম্পদ যার বেশি, সে টিকে থাকে। যার কম, সে বাদ পড়ে।’ নাহার উঠে দাঁড়ালো। ‘তুমি এখন যেতে পারো। আমার মতো একজন মানুষ তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, এই ক্ষত আমি কয়েকটা বছর বয়ে বেড়িয়েছি। তুমি কষ্ট পাবে ভেবে তোমায় কিছু বলিনি। তুমি আমায় আজ ভারমুক্ত করলে। তোমাকে ধন্যবাদ।’দরজা বন্ধ হলো।নাহার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। চে গুয়েভারার পোস্টার নীরবে তাকিয়ে আছে। ঘরটা শান্ত। বাইরে শহর গর্জাচ্ছে। ভেতরে একটা শূন্যতা নামলো, কিন্তু সেই শূন্যতার চেহারা দুঃখের না বরং অনেকটা বুক থেকে ভারী হয়ে চেপে বসা পুরোনো পাথর নেমে যাওয়ার মতো।

তারপর নাহার ড্রয়ার খুললো।ভেতরে একটা পদত্যাগপত্রের চিঠি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাডে, নিজের হাতে লেখা পদত্যাগপত্র। মাস দেড়েক আগে লিখেছিলো, যখন মনে হয়েছিল আর পারছে না, যখন মনে হয়েছিল এই যুদ্ধ তার জন্য না। সেই চিঠি ড্রয়ারে পুরে রেখেছিল, দেবে কি দেবে না ভাবতে ভাবতে। সে চিঠিটা হাতে নিলো। দুই হাতে ধরলো। ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলো।

সেই রাতে সে লিখলো ‘বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকশ্রমের পণ্যায়ন’ শীর্ষক একটা গবেষণাপ্রস্তাব। যেটা দুই বছর ধরে মাথার মধ্যে পুষে রেখেছিলো, কিন্তু লেখার সাহস হয়নি। মনে হয়েছিল প্রতিষ্ঠান বিরূপ হবে, চেয়ারম্যান রাগ করবেন, চাকরি যাবে। চাকরি তো এমনিই যাচ্ছে। তাহলে আর ভয় কীসের। রাত গভীর হলো। কলম থামলো না।

ভোরের দিকে ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে ই-মেইল, তার পাঠানো গবেষণাপত্রটি পর্যালোচনা পর্ব পেরিয়ে গৃহীত হয়েছে। দেশের বাইরের সেই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়েই পিএইচডির জন্য ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপে আবেদন করেছিলো নাহার, সে আবেদনটিও গৃহীত হয়েছে। অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু।

আরও পড়ুনঅধম নূর ইসলামের গল্প: নীরমালা 

নাহার স্ক্রিনের দিকে তাকালো। হাসলো না। কাঁদলো না। একটা লম্বা শ্বাস নিলো, যেভাবে অনেকক্ষণ ডুবে থাকার পর মাথা তুলে শ্বাস নেয় মানুষ।পরদিন সকালে ক্লাসে ঢুকলো।বোর্ডে লিখলো: দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ—থিসিস, অ্যান্টিথিসিস, সিনথেসিস।সিনথিয়া আবার হাত তুললো পেছন থেকে। ‘ম্যাডাম, তাহলে আমাদের যাদের পেছনে পুঁজি নেই, ক্ষমতা নেই; আমরা কীভাবে টিকবো?’নাহার থামলো। মেয়েটার মুখে নিজের মুখ দেখলো যেন একই প্রশ্ন, একই অনিশ্চয়তা, একই ভয়!‘টিকে থাকার নিয়মটা তারাই বানায়, যারা জিততে চায়। কিন্তু নিয়ম মানা আর নিয়মকে চিরন্তন সত্য বলে মেনে নেওয়া এক কথা নয়। প্রতিটি থিসিসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিথিসিস আসে। আর সেই দ্বন্দ্ব থেকেই যদি হাল না ছাড়ো, তাহলেই একটা নতুন সংশ্লেষ তৈরি হয়।’সিনথিয়ার মুখে এবার অভয়ের হাসি দেখা গেলো। নাহারও একটু হাসলো। প্রশান্তির হাসি।

ক্লাসরুমের বাইরে ঢাকার শহর তার নিয়মের শব্দে ভরা। হর্ন, ধুলো, প্রতিযোগিতা, তাড়া। পুঁজিবাদের শহর থামে না। কিন্তু নাহারের বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত স্থিরতা এখন। দীর্ঘ পতনের পর মাটি খুঁজে পাওয়ার স্থিরতা। সেই মাটি তার নিজের। অন্য কেউ তাকে দয়া করে দেয়নি।

এসইউ