বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থা, জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের প্রভাবে সংকটে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের শিল্প কারখানাগুলো। এরই মধ্যে বিভিন্ন কারখানায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদন কমে এসেছে। সংকট চলমান থাকলে উৎপাদন আরও কমার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
Advertisement
শিল্প কারখানার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেকদিন ধরেই ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। অর্ডার অনেক কমে যাচ্ছিল। এর মধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে জ্বালানি সংকট। বড় বড় শিল্প কারখানায় জ্বালানি সংকটের তেমন প্রভাব না থাকলেও ছোট কারখানাগুলোর মালিকরা বিপাকে রয়েছেন।
এদিকে বর্তমানে জ্বালানি সংকট অনেকটা কমে এলেও নতুন করে যোগ হয়েছে লোডশেডিং। সরকারের নেওয়া লোডশেডিংয়ের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে শিল্প কারখানার মালিকদের। লোডশেডিং থাকলে আবার জ্বালানি তেলের ওপর চাপ বাড়বে। সবমিলিয়ে উৎপাদনে ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়ছে।
আরও পড়ুন:খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরুজ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধসবুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
Advertisement
জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার ৮৩৪টি পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার বেশিরভাগেই আগের থেকে উৎপাদন কমেছে। হাতেগোনা বড় বড় কয়েকটি কারখানা কোনো রকম উৎপাদন ধরে রাখতে পারলেও ছোট কারখানাগুলোর জন্য টিকে থাকাই কষ্টকর বলছে কর্তৃপক্ষ।
‘আমাদের একটা সুইং লেন থেকে ২৫০০ পিস পণ্য উৎপাদন করতে হবে। সেখানে সারাদিনে আসছে ২০০০-২২০০ পিস। ফলে উৎপাদন কম হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট। দ্রুত উত্তরণ না হলে সারাদেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বে।’
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার ‘ফতুল্লা ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং’র ম্যানেজার তুষার বলেন, ‘আমাদের উৎপাদন মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ আছে, পাশাপাশি গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক। তবে রাতের দিকে গ্যাসের চাপ কমে যায়। তখন বাড়তি জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়।’
শহরের ভিটেক ফ্যাশন লিমিটেডের ম্যানেজার ইসমাঈল হোসেন বলেন, ‘আমাদের একটা সুইং লেন থেকে ২৫০০ পিস পণ্য উৎপাদন করতে হবে। সেখানে সারাদিনে আসছে ২০০০-২২০০ পিস। ফলে উৎপাদন কম হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট। দ্রুত উত্তরণ না হলে সারাদেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বে।’
Advertisement
বিকেএমইএ’র পরিচালক শাহরিয়ার সাঈদ বলেন, ‘গত মৌসুমে আমরা যে পরিমাণ অর্ডার পেয়েছি, এই সিজনে সেটা কমে গেছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় সময়মতো অর্ডার সাপ্লাই দেওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছি। আবার কোনো কোনো কারখানার মালিক ইচ্ছাকৃতভাবেই কমিয়ে অর্ডার নিচ্ছেন, যেন তারা সময়মতো সাপ্লাই দিতে পারেন। এই অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ করা জরুরি।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে আমাদের উৎপাদন কমেছে। অর্ডার কম, তাই কাজও কম। কাজ কম থাকলে ফোর্স কম। উৎপাদন কম থাকলেও খরচ চলমান রয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকের ইন্টারেস্টও কম নিচ্ছে না। ফলে খরচের ক্ষেত্র সবগুলোই চালু রয়েছে। তেলের ক্ষেত্রে বড় বড় কোম্পানিগুলোর ডিলারদের সঙ্গে চুক্তি থাকলেও ছোট ছোট কোম্পানির ডিলারদের সঙ্গে চুক্তি নেই। ফলে ছোট কোম্পানির তেলের সংকট থেকেই যাচ্ছে।’
‘উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থান কমে যাবে। কারণ কেউ বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেবে না, এটা সম্ভবও নয়। ব্যবসায়ীরাই যদি টিকে থাকতে না পারেন তাহলে মানবিক দিকও বিবেচনা করতে পারবেন না। সেই সঙ্গে তেলের দাম যেহেতু বৃদ্ধি হয়েছে এই সময়ে বিদ্যুৎও যদি না থাকে তাহলে সবকিছুতেই খরচ বাড়বে। উৎপাদন খরচ বাড়লে পণ্যের দামও বাড়বে। এটা লাঘব করার জন্য সরকারকে নজর দেওয়া উচিত। ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসে সমন্বয় করা প্রয়োজন।’
আরও পড়ুন:আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্পবন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্যপ্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’
তিনি আরও বলেন, ‘এতদিন তেমন লোডশেডিং ছিল না। এবার সরকার শহরকেন্দ্রিক লোডশেডিং বাড়ানোর চিন্তা করছে। কিন্তু শহরে কর্মসংস্থান-কারখানা সবই বেশি। লোডশেডিং, তেলের মূল্যবৃদ্ধি, তেলের স্বল্পতা সবকিছু মিলিয়ে উৎপাদনের বিষয়টি খেয়াল রাখা উচিত। উৎপাদন যদি ব্যাহত হয় তাহলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখানে শুধু ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কাজ কমতে থাকলে অতিরিক্ত জনবল ছাঁটাই করতে হবে। বিদ্যুতের পার্সেন্ট যত কমবে উৎপাদন তত কমবে। বৈশ্বিক ও তেলের সংকটে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদন কমতে শুরু করছে। এই হার ক্রমেই বাড়তে থাকবে।’
কর্মসংস্থান কমবে উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থান কমে যাবে। কারণ কেউ বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেবে না, এটা সম্ভবও নয়। ব্যবসায়ীরাই যদি টিকে থাকতে না পারে তাহলে মানবিক দিকও বিবেচনা করতে পারবে না। সেই সঙ্গে তেলের দাম যেহেতু বৃদ্ধি হয়েছে, এই সময়ে বিদ্যুৎও যদি না থাকে তাহলে সবকিছুতেই খরচ বাড়বে। উৎপাদন খরচ বাড়লে পণ্যের দামও বাড়বে। এটা লাঘবের জন্য সরকারের নজর দেওয়া উচিত। ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসে সমন্বয় করা প্রয়োজন।’
মোবাশ্বির শ্রাবণ/এমএন/এফএ/এমএস