দেশের কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণ এবং আদায়ে চলতি অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) কৃষিখাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। একই সঙ্গে ঋণ আদায়েও ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে একই সময়ে খেলাপি কৃষিঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
Advertisement
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ২৭ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে বিতরণ হয়েছিল ২২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা বা ২৪ দশমিক ২০ শতাংশ।
একইভাবে কৃষিঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও ভালো অগ্রগতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে মোট ২৭ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা ঋণ আদায় হয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ২৪ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ আদায় বেড়েছে ৩ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ১৩ দশমিক ৭০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষিখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে। যেসব ব্যাংকের নিজস্ব শাখা পল্লি অঞ্চলে নেই, তাদের ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা বা এনজিওর মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (এমআরএ) নিবন্ধিত এনজিওগুলোর মাধ্যমে এসব ঋণ বিতরণ হবে এবং অতিরিক্ত সুদ আদায় ঠেকাতে সুদের হারও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
Advertisement
তথ্য অনুযায়ী, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), গ্রামীণ ব্যাংকসহ বড় এনজিওগুলো গ্রামীণ অর্থায়নের আওতায় প্রায় ১৭ হাজার ২৩১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। তবে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ায় খেলাপিঋণের পরিমাণও বেড়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে কৃষিঋণের খেলাপিঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ঋণ শ্রেণিকরণের নতুন নীতিমালা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিই এই খেলাপিঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষিঋণ বিতরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য প্রতি বছর কৃষি ও পল্লিঋণ নীতিমালা ঘোষণা করা হয় এবং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তিনি জানান, ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ২ শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আর্থিক সহায়তা জোরদার করতেই এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। নতুন নীতিমালায় প্রাণিসম্পদ খাতে ২০ শতাংশ বরাদ্দ, সেচ ও কৃষিযন্ত্রপাতি খাতে ২ শতাংশ বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সিআইবি সার্ভিস চার্জ মওকুফ করা হয়েছে।
Advertisement
নীতিমালায় কন্ট্রাক্ট ফার্মিং, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতা বৃদ্ধি এবং খিরা, কচুর লতি, বিটরুট, কালোজিরা, আদা, রসুন, হলুদ ও খেজুর গুড়সহ নতুন কিছু ফসল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন সম্ভাবনা অনুযায়ী ঋণ বিতরণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ইএআর/ইএ