দেশজুড়ে

১৫ মোড়লের দাপটে ফিকে মেঘনায় নিষেধাজ্ঞা-অভিযান

মেঘনা নদীতে জাটকা রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা যেন কেবল কাগজে-কলমে। নদীতীরের ১৫ প্রভাবশালী মহাজন ও আড়তদারের ইশারায় অভয়াশ্রমে চলছে মাছ শিকারের মহোৎসব। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ‘খুশি’ করেই জেলেরা দিন-রাত পাল্লা দিয়ে নদীতে জাল ফেলছে। ফলে বিশাল অঙ্কের খাদ্য সহায়তা আর সরকারি বরাদ্দ সত্ত্বেও ভেস্তে যেতে বসেছে দুই মাসের দীর্ঘ অভিযান।

Advertisement

লক্ষ্মীপুরের রামগতির আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকাকে জাটকা ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ মার্চ ও এপ্রিল অভয়াশ্রমে জাটকা ইলিশ অবাধ বিচরণ করে। জাটকা বেড়ে ওঠার জন্য অভয়াশ্রমে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার। এসময় জাটকা আহরণ, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) এবারের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হবে।

‘নদীতে নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার শুধু চাল দেয়। সেটাতেও অনিয়ম-হয়রানির শেষ নেই। এ চাল দিয়ে কী হয়? বাজার, সংসার, সন্তানের পড়ালেখার খরচ কোথায় থেকে আসবে? এ সময়ে ঋণ-কিস্তি নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর নদীতে গেলে জেল-জরিমানার ভয়। না হলে কঠিন এ সময়ে না সবাইকে উপোস থাকতে হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার নদী সীমার মধ্যে ১৫ জন মহাজন ও আড়তদারের মদদে প্রকাশ্যেই নদীতে মাছ ধরা ও বেচাকেনা চলছে। তারা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে জেলেদের লোভে ফেলে নদীতে পাঠান। প্রভাব বিস্তারকারীদের মধ্যে রয়েছেন- চাঁদপুরের হাইমচর থেকে রায়পুরের অংশে জাকির দেওয়ান, দেলোয়ার হোসেন দেলু, মো. বাদশা, খোরশেদ হাওলাদার, ভুট্টো শনি, বাবুল গাজী, কবির বকাউল, দেলু বকাউল, রফিক সরদার, গিয়াস উদ্দিন গেসু গাইন, গিয়াস ওরফে গেসু মোল্লা, মেহেদী করিরাজ, মহিউদ্দিন গাজী, হাসনাত গাজী ও কমলনগরে ইউপি সদস্য মেহেদী হাসান লিটন। 

Advertisement

আরও পড়ুন:খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরুজ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধসবুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

নদীতে নৌকার বহর, তীরে হাট

সম্প্রতি চাঁদপুরের হাইমচর, কাটাখালি, রায়পুরের চরজালিয়া, চরবংশী, সদরের চররমনী মোহন, ভূঁইয়ারঘাট, কমলনগরের মতিরহাট, লুধুয়া, নাছিরগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, জেলেরা নদীতে আপন মনে মাছ ধরছেন। মাঝনদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার বহর। ওই এলাকাগুলোর নদীরপাড়ে প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রি করতে দেখা গেছে। আশপাশের এলাকা থেকে আসা নারী-পুরুষ তা কিনছেন। এছাড়া পরিবহন ও ক্রয়-বিক্রি নিষিদ্ধ থাকলেও গ্রামে ফেরি করে ইলিশ বিক্রি করছেন অসাধু জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা।

পরিচয় গোপন রেখে মতিরহাটের জেলে ফারুকের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, মূলত মহাজনের দাদনের কাছে তারা জিম্মি। মহাজনরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তাদের জানায়। তারপর তারা নদীতে যায়। যখন অভিযান হবে, তার আগেই খবর আসে। যাদের ভাগ্য খারাপ তাদেরই জেল-জরিমানা হয়।

‘দুই মাস জেলেদের মাছ শিকারে বিরত রাখতে খাদ্য সহায়তা ও জেলে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। ১৫ ব্যক্তির মদদে এবার নদীতে জেলেরা যাচ্ছে, এমন তথ্য আমার জানা নেই।’

Advertisement

জেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুরে ৪৬ হাজার নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। তবে বেসরকারি হিসেবে তা ৬০ হাজার। এবার ২৯ হাজার ৬০টি জেলে পরিবারকে ৪ হাজার ৬৪৯ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রত্যেক পরিবার প্রতিমাসে ৪০ কেজি করে চারমাসে ১৬০ কেজি চাল পাবেন।

গত ৪ এপ্রিল লক্ষ্মীপুরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জেলেদের মধ্যে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করেন। বিগত বছরগুলোতে জেলেদের শুধু চাল ও গরুর বাছুর বিতরণ করা হলেও এবারই প্রথম ১২ কেজি ময়দা, ১০ কেজি তেল, ৮ কেজি ডাল, ৪ কেজি চিনি, ৪ কেজি লবণ, ১৬ কেজি করে আলু দেওয়া হয়েছে। সারাদেশে ৪০ হাজার পরিবারকে এ খাদ্য সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে বলেও প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন।

জেলেদের আক্ষেপ

‘নদীতে নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার শুধু চাল দেয়। সেটাতেও অনিয়ম-হয়রানির শেষ নেই। এ চাল দিয়ে কী হয়? বাজার, সংসার, সন্তানের পড়ালেখার খরচ কোথায় থেকে আসবে? এ সময়ে ঋণ-কিস্তি নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর নদীতে গেলে জেল-জরিমানার ভয়। না হলে কঠিন এ সময়ে না সবাইকে উপোস থাকতে হবে।’ এসব আক্ষেপ লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের চরবংশী গ্রামের ৭০ বছর বয়সী জেলে সিরাজ মিয়ার। শরীরের সঙ্গে চামড়া লেপ্টে আছে তার।

মোতালেব মাঝি, জমির ও লতিফের মুখেও প্রায় একই ধরনের কথা। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) চরবংশীর নাইয়াপাড়া ও হাজীমারা এলাকায় তাদের সঙ্গে কথা বলে দুঃখ-দুর্দশার কথা জানা গেছে।

শিশুকাল থেকে বাবার সঙ্গে সিরাজ নদীতে আসা-যাওয়া করতেন। নদীতে জাল ফেলা, মাছ ধরা, ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়াসহ নানা বাস্তব অভিজ্ঞতার কমতি নেই তার। শেষ বয়সে এসে শুধু মেলাতে পারছেন না জীবনের হিসাব-নিকাশ। তাদের প্রত্যাশা, সরকার মানবিক হলে বৃহৎ এ সম্প্রদায় স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখবে। আরও পড়ুন:আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্পবন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্যপ্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’

প্রশাসনে বক্তব্য

রামগতির বড়খেড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসান মাকসুদ মিজান বলেন, নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও জেলেদের সচেতন করা হয়েছে। তারপরও কিছু অসাধু জেলে নদীতে যেতে পারে। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে যাওয়ার জন্য এখন জেলেরা পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সরকারি সহায়তা না পেয়ে কিছু জেলে নদীতে যাচ্ছে জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলে ফেডারেশনের সভাপতি মোস্তফা বেপারী। তার ভাষ্য, জেলে তালিকা হালনাগাদ, সুষম খাদ্য সহায়তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়ন হবে। পাশাপাশি ইলিশের উৎপাদন বাড়বে কয়েকগুণ।

কর্মকর্তাদের খুশি করে জেলেরা নদীতে যায়, এ কথা অস্বীকার করেন রায়পুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহাফুজুল হাসনাইন। তিনি বলেন, নদীতে নিয়মিত আমরা অভিযান করছি। তারপরও কিছু জেলে চুরি করে মাছ শিকার যায় তা সত্য।

লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, দুইমাস জেলেদের মাছ শিকারে বিরত রাখতে খাদ্য সহায়তা ও জেলে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। ১৫ ব্যক্তির মদদে এবার নদীতে জেলেরা যাচ্ছে, এমন তথ্য আমার জানা নেই।

কাজল কায়েস/এমএন/এএসএম