মতামত

খাল পুনঃখনন: পরিবেশ ও অর্থনীতির টেকসই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি

অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন আমি স্কুলের স্যার এবং সহপাঠীদের সাথে তিস্তা বড় মসজিদ থেকে মোস্তফীরহাট পর্যন্ত খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলাম। তখন সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বেচ্ছাশ্রমে সেই স্বতঃস্ফূর্ত কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছিল। আমাদের লোহাখুঁচি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মহেন্দ্রনগরে লোকাল ট্রেন ধরে মাত্র একটি রেলস্টেশন পরেই তিস্তা জংশন। সেখান থেকে দেড় কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে প্রায় একশত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী কোদাল-টুকরি হাতে নিয়ে মাটি কাটার কাজে অংশ নিয়েছিলাম। আর-কে রোডের পাশ দিয়ে তৈরি সেই খালটিতে পরবর্তী বছরগুলোতে পানিপ্রবাহ ছিল। এখন সেটি খালের অস্তিত্ব হারিয়ে লোভী মানুষের দখলে চলে গেছে। এলাকার পরিবেশ রক্ষায় এখন সেটি উদ্ধার করা জরুরি মনে করি।

Advertisement

তখনকার দিনে খাল খনন করা বিষয়টি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প ছিল না। সেটি ছিল একটি স্বপ্ন, ছিল এলাকার মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা, মাটির গন্ধে ভরা দিনগুলো আজও স্মৃতিতে অমলিন। সেই খাল আজ ভরাট, প্রাকৃতিক প্রবাহ বন্ধ, স্মৃতি মুছে যাওয়ার উপক্রম। যে খাল একসময় জীবন, জীবিকা ও পরিবেশের অবলম্বন ছিল, তা কি এখন আবার জাগিয়ে তোলা উচিত? সেচ এবং দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের বাস্তবতা বলছে—অবশ্যই উচিত।

বাংলার ভূপ্রকৃতি, নদীনির্ভর জীবনযাপন এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে খাল-বিলের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একসময় গ্রামবাংলার যোগাযোগ, সেচব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রধান অবলম্বন ছিল প্রাকৃতিক ও খননকৃত খাল। কিন্তু সময়ের প্রবাহে অব্যবস্থাপনা, দখলদারিত্ব, ভরাট ও দূষণের কারণে এসব খাল আজ অনেকাংশেই মৃতপ্রায়। ফলে জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা, খরা ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা প্রকট হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় খাল পুনঃখননকে শুধু উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বললে ভুল হবে; এটি আমাদের কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই একটি টেকসই আর্থ-সামাজিক ভবিষ্যতের পূর্বশর্ত। খালগুলো পুনঃখননের জন্য নানামুখী অপরিহার্য বিষয় তুলে ধরা যেতে পারে।

প্রথমত: খাল পুনঃখনন দেশের নানা জায়গায় জলাবদ্ধতা নিরসণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের মতো নদীবহুল ও নিম্নভূমির দেশে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। ফলাফল—শহর ও গ্রামে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। রাজধানীসহ বিভিন্ন মহানগরে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ডুবে যায়। খালগুলো যদি দখলমুক্ত ও পুনঃখনন করা হয়, তবে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নদী বা জলাধারে নেমে যেতে পারবে। এতে নগরজীবন যেমন স্বস্তি পাবে, তেমনি কৃষিজমিও রক্ষা পাবে।

Advertisement

বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে খাল ও জলপথের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকলে জলোচ্ছ্বাস ও অতিবৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অতীতে প্রাকৃতিক খালগুলোই ছিল অতিরিক্ত পানির নিরাপদ বহিঃপ্রবাহের মাধ্যম। আজ সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নে খাল পুনঃখনন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কৃষিনির্ভর। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। খাল পুনঃখনন করলে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে তা শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা যায়। এতে একদিকে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে।

আমি স্কুলের স্যার ও সহপাঠীদের সাথে কিশোর বয়সে কোদাল হাতে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননে অংশ নিয়েছিলাম—সেই স্মৃতি আমাকে আজও মনে করিয়ে দেয়, সম্মিলিত উদ্যোগে অসম্ভব কিছু নয়। এখন প্রয়োজন নতুন করে সেই উদ্যোগ, নতুন করে সেই অঙ্গীকার। কারণ খালগুলোকে বাঁচালে আমাদের জমি বাঁচবে, কৃষক বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে—আর বাঁচবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির সুজলা-সুফলা ঐতিহ্য।

খালগুলোকে জলাধারের সঙ্গে সংযুক্ত করলে পানি ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে ওঠে। এর ফলে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলানো সম্ভব হয়। কৃষকের আয় বাড়ে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়।

Advertisement

তৃতীয়ত: খাল পুনঃখনন মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে পারে। একসময় খাল-বিল ছিল দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রধান আবাসস্থল। কিন্তু খাল ভরাট ও দূষণের কারণে বহু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির গভীরতা ও প্রবাহ পুনরুদ্ধার হলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি সম্ভব হয়। এতে প্রান্তিক জেলেদের জীবিকা সুরক্ষিত হয় এবং দেশীয় মাছের জোগান বৃদ্ধি পায়।

জলজ উদ্ভিদ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্যও খাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার অপরিহার্য। জলাধার ও খাল সংযুক্ত থাকলে জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হয় এবং প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র সক্রিয় থাকে।

চতুর্থত: খাল পুনঃখনন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। খাল পুনঃখনন জলবায়ু অভিযোজনের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ ও সংরক্ষণ করে খালগুলো একধরনের প্রাকৃতিক ‘রিজার্ভয়ার’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

এছাড়া খালের পানিপ্রবাহ সচল থাকলে আশপাশের তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকে, মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং খরার প্রভাব কমে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা সহজ হয়।

পঞ্চমত: খালের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুফল আসতে পারে। খাল পুনঃখনন একটি শ্রমনির্ভর কর্মসূচি। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় মৌসুমি বেকারত্ব কমাতে এ ধরনের প্রকল্প কার্যকর হতে পারে। এছাড়া খালপথ ব্যবহার করে স্বল্প ব্যয়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হলে সড়কের ওপর চাপ কমবে এবং জ্বালানি ব্যয়ও হ্রাস পাবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ষষ্ঠত: যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নে খাল পুনঃখনন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাকৃতিক জলপথ বন্ধ করে দিলে পানি তার পথ নিজেই তৈরি করে নেয়—কখনো রাস্তা ভেঙে, কখনো ঘরবাড়ি প্লাবিত করে। তাই খাল পুনঃখনন মানে কেবল পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনা নয়; বরং একটি বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশসম্মত পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

একসময় খালপথ ছিল নৌযান চলাচলের উপযোগী। ছোট নৌকা দিয়ে মানুষ ও পণ্য পরিবহন হতো। এতে সময় ও খরচ কমত। বর্তমানে সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে, জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে এবং যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে খননকৃত খালগুলো পুনরায় সচল করা গেলে স্বল্প ব্যয়ে সেচ সুবিধা এবং বহু দূরবর্তী এলাকায় গ্রামীণ কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এতে কৃষিপণ্য বাজারে দ্রুত পৌঁছাবে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।

খাল ভরাট হওয়ার পেছনে অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও প্রশাসনিক উদাসীনতা বড় কারণ। একবার পুনঃখনন করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও আইনি সুরক্ষা। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ফলে বহু খাল দখল হয়ে গেছে। আবাসন, শিল্পকারখানা ও অবৈধ স্থাপনা খালের প্রাকৃতিক গতিপথ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলাফল হিসেবে নগরজীবনে চরম ভোগান্তি বেড়েছে। খাল পুনঃখনন ও দখলমুক্তকরণ একটি সুপরিকল্পিত নগরব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত।

গোটা বাংলাদেশে যদি মুছে যাওয়া, দখল হওয়া খালগুলো পুনরুদ্ধার করে নান্দনিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তবে তা নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, পর্যটন উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আমাদের বর্তমান করণীয় হলো শুধু পুনঃখননে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থায়ী সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা। এজন্য খাল পুনঃখননের পাশাপাশি প্রয়োজন—অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও কঠোর আইন প্রয়োগ; নিয়মিত ড্রেজিং ও রক্ষণাবেক্ষণ; খালের দুই পাড়ে সবুজায়ন; বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধকরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি; এবং স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে তদারকির ব্যবস্থা করা। এগুলো বাস্তবায়িত হলে খাল আর কখনো ভরাট হবে না।

বিশেষ করে তিস্তা নদীর রেলব্রিজের উত্তরপাড় থেকে মোস্তফীরহাট পর্যন্ত খালটি ছিল একটি প্রাণরেখা—প্রকৃতি, কৃষি, জীবিকা ও স্মৃতির সংযোগসূত্র। আজ তা ভরাট হয়ে দখলবাজদের কবলে পড়ে আছে, কিন্তু সম্ভাবনা এখনও মুছে যায়নি। খাল পুনঃখনন মানে অতীতকে পুনরুজ্জীবিত করা, বর্তমানকে সুরক্ষিত করা এবং ভবিষ্যৎকে টেকসই করা।

আমি স্কুলের স্যার ও সহপাঠীদের সাথে কিশোর বয়সে কোদাল হাতে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননে অংশ নিয়েছিলাম—সেই স্মৃতি আমাকে আজও মনে করিয়ে দেয়, সম্মিলিত উদ্যোগে অসম্ভব কিছু নয়। এখন প্রয়োজন নতুন করে সেই উদ্যোগ, নতুন করে সেই অঙ্গীকার। কারণ খালগুলোকে বাঁচালে আমাদের জমি বাঁচবে, কৃষক বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে—আর বাঁচবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির সুজলা-সুফলা ঐতিহ্য।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন। fakrul@ru.ac.bd

এইচআর/এমএস