আবুল কালাম আজাদ
Advertisement
একটি দেশের রাজনীতি কেবলমাত্র রাজনৈতিক দল বা রাজনীতিবিদদের কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা গভীরভাবে সম্পর্কিত সেই দেশের সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সচেতনতার সঙ্গে। তাই রাজনীতিবিদদের পরিবর্তনের আগে দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন ও উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। কারণ জনগণ যেমন, তাদের নেতৃত্বও তেমনই হয়ে থাকে, এটি একটি স্বীকৃত সামাজিক বাস্তবতা। জনগণ যদি লোভী, অসচেতন এবং স্বার্থান্ধ হয়, তবে সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিবিদরা দুর্নীতি, লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহার করতে দ্বিধা করে না।
প্রথমত, আমাদের স্বীকার করতে হবে যে রাজনীতির অবক্ষয়ের পেছনে কেবল রাজনীতিবিদরা এককভাবে দায়ী নয়; জনগণেরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মানুষ সামান্য অর্থ, উপহার বা ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে ভোট প্রদান করে থাকে। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভোট একটি পবিত্র অধিকার, যা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কিন্তু যখন এই অধিকারকে অর্থ বা সামান্য সুবিধার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়, তখন তা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা ক্ষমতায় আসে এবং দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হয়।
দ্বিতীয়ত, অন্ধ রাজনৈতিক সমর্থন একটি বড় সমস্যা। অনেক মানুষ দল বা নেতার প্রতি এমনভাবে অনুগত থাকে যে তারা কোনো ভুল বা অনৈতিক কাজকেও সমর্থন করতে পিছপা হয় না। এই অন্ধ সমর্থন রাজনীতিবিদদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। তারা জানে যে তাদের সমর্থকরা যে কোনো পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষ নেবে, ফলে তারা আইন বা নৈতিকতার তোয়াক্কা না করেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে। তাই জনগণকে দল বা ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্য থেকে বেরিয়ে এসে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
Advertisement
তৃতীয়ত, জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাব একটি বড় অন্তরায়। অনেকেই রাজনীতি, নির্বাচন প্রক্রিয়া বা নাগরিক অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না। ফলে তারা সহজেই বিভ্রান্ত হয় এবং ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিকই পারে একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক সরকার গড়ে তুলতে। তাই আমাদের উচিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করা এবং নাগরিকদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
চতুর্থত, যে কোনো জনপ্রতিনিধির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু এই ক্ষমতা তখনই কার্যকর হয়, যখন জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। যদি জনগণ নীরব থাকে, তবে দুর্নীতি ও অন্যায় আরও বাড়তে থাকে। তাই আমাদের উচিত ভয় বা স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সংগঠনের মাধ্যমে এই প্রতিবাদকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
পঞ্চমত, ব্যক্তিগত লোভ, হিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণতা আমাদের সমাজকে বিভক্ত করে এবং সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। এই নেতিবাচক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদেরকে বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করতে হবে। দেশপ্রেম একটি শক্তিশালী প্রেরণা, যা মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করে। যদি আমরা সবাই নিজেদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে পারি, তবে আমরা ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে পারব।
এছাড়া, পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর মানসিকতা গঠনের প্রথম ধাপ শুরু হয় পরিবার থেকে। যদি পরিবারে সততা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দেওয়া হয়, তবে সেই শিশু ভবিষ্যতে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। একইভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শিক্ষার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
Advertisement
গণমাধ্যমও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক তথ্য প্রচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে গণমাধ্যম সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে গণমাধ্যমকে অবশ্যই নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে তারা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।
পরিশেষে বলতে চাই, একটি দেশের উন্নয়ন ও সুস্থ রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। রাজনীতিবিদরা জনগণের প্রতিফলন, তাই জনগণ যদি সৎ, সচেতন ও নৈতিক হয়, তবে রাজনীতিও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং দেশের কল্যাণে কাজ করা।
পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যদি আমরা সবাই মিলে এই পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাই, তবে একটি উন্নত, সুশাসিত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা সম্ভব। তাই আসুন, আমরা নিজেদের মানসিকতার পরিবর্তন দিয়ে শুরু করি, কারণ সেখান থেকেই একটি সুন্দর দেশের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
আবুল কালাম আজাদ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীcolumnistazad@gmail.com
এমআরএম