ফিচার

বুড়িগঙ্গার বুকে ২৫ বছরের সংগ্রাম, ভাগ্য বদলায়নি রইস উদ্দিনের

ভোরের আলো ফোটার আগেই, যখন বুড়িগঙ্গা নদীর কালচে পানিতে প্রথম নৌকার বৈঠা পড়ে, তখনই শুরু হয় রইস উদ্দিনের দিনের লড়াই। বয়স পঞ্চান্ন ছুঁইছুঁই, তবু শরীরের ক্লান্তিকে পাত্তা দেওয়ার সময় তার নেই। সদরঘাটের কোলাহলময় ঘাটে তিনি গত পঁচিশ বছর ধরে নৌকা চালিয়ে আসছেন। শহরের ব্যস্ততা, মানুষের আসা-যাওয়া, জাহাজ ও লঞ্চের বাঁশির শব্দ আর নদীর চিরচেনা গন্ধ সবই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে চারপাশের অনেক কিছুই বদলে গেছে, কিন্তু রইস উদ্দিনের জীবনের হিসাব-নিকাশে তেমন পরিবর্তন আসেনি।

Advertisement

বুড়িগঙ্গা নদীই রইস উদ্দিনের জীবনের অবলম্বন। গত ২৫ বছর ধরে তিনি এই নদীর বুকে বৈঠা চালিয়ে সংসারের চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছেন। নিজের নেই এক টুকরো ফসলি জমি, নেই কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস। শহরের এই নদীই তার রুজির একমাত্র ভরসা। নদীর বুকে নৌকা চালিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন সংসার। স্ত্রী ও দুই সন্তানের মুখের হাসি দেখতেই প্রতিদিন নতুন করে বৈঠা হাতে নেন তিনি। কিন্তু সেই হাসি ধরে রাখা এখন আর সহজ নয়।

ঘাটে নৌকা নিয়ে যাত্রীদের অপেক্ষায় বসে আছেন মাঝিরা

একসময় বুড়িগঙ্গার বুকে বৈঠাচালিত নৌকার কদর ছিল বেশি। মানুষের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন সব ক্ষেত্রেই এই নৌকার চাহিদা ছিল। তখন রইস উদ্দিনের মতো মাঝিরা দিন শেষে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারতেন। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন নদীতে নেমেছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। একইসঙ্গে বেঠাচালিত নৌকার সংখ্যাও বেড়েছে। একই নদীতে বেশি মাঝি, কম যাত্রী। ফলে আয় কমে এসেছে চোখে পড়ার মতো। সারাদিন নদীতে কাটিয়েও আগের মতো রোজগার করা সম্ভব হচ্ছে না।

Advertisement

‘আগে দিনে হাজার টাকার মতো আয় হতো, এখন ৭০০ টাকাও ঠিকমতো হয় না’ হতাশার সুরে কথাগুলো বলছিলেন মাঝি মো. রইস উদ্দিন। একটু থেমে আরও বলেন, ‘মানুষ এখন তাড়াহুড়ো করে, তারা দ্রুত যেতে চায়। আমাদের নৌকায় উঠতে চায় না। অদক্ষ মাঝির সংখ্যাও বেড়ে গেছে। অনেকেই ঠিকমতো নৌকা চালাতে পারেন না, তবুও তারা নদীতে নেমেছে।

মাঝি রইস উদ্দিনের জীবনের গল্প শুনছেন লেখক মোহাম্মদ সোহেল রানা

রইস উদ্দিন বলেন, ‘এই ৭০০ টাকার মধ্যেই নৌকার ভাড়া দিতে হয় ১৩০ টাকা। এরপর নিজের খাওয়া-দাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে যা থাকে, সেটুকুই নিয়ে ফিরতে হয় পরিবারের কাছে। সেই টাকায় চলতে হয় পুরো সংসার। তাই একটু বেশি আয়ের আশায় মাঝে মাঝে যাত্রীদের অবস্থার ওপর নির্ভর করে ১০-২০ টাকা বাড়তি চেয়েও নেন। কেউ খুশি হয়ে দেন, আবার কেউ দেন না।’

রইস উদ্দিনের স্ত্রী ও দুই সন্তানের প্রয়োজন, খাবার, পোশাক সব কিছুই নির্ভর করে এই সীমিত আয়ের ওপর। তার ঘরে আছে ১২-১৩ বছরের একটি কন্যাসন্তানও। জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিকগুলোর একটি হলো সঞ্চয়ের অভাব। এত বছর কাজ করেও জমানো টাকা নেই তার। সংসারে কোনো বড় প্রয়োজন দেখা দিলেই তাকে আশ্রয় নিতে হয় কিস্তির টাকায়, যা একদিকে সাময়িক স্বস্তি দেয়, অন্যদিকে বাড়িয়ে তোলে ভবিষ্যতের চাপ।

Advertisement

এই মাঝি বলেন, বাড়িতে নিজের কোনো ফসলি জমি নেই, অন্যের জমিতে একটা চাষাবাদ করি। বড় অঙ্কের কোনো সঞ্চয়ও নেই। তাই পরিবারের বিশেষ কোনো প্রয়োজনে হলে বাধ্য হয়ে কিস্তি থেকে টাকা তুলতে হয়। তবে সেই টাকা পরিশোধের জন্য চিন্তায় পড়ে যাই।

নৌকায় যাত্রী নিয়ে অন্য মাঝিরাও ছুটে চলেছেন

রইস উদ্দিনের জীবনে প্রকৃতিও যেন এক অদৃশ্য প্রতিপক্ষ। সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে কিছুটা বেশি আয় হলেও ঝড়-বৃষ্টির দিনে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। আকাশ কালো হয়ে এলে, নদীতে ঢেউ বাড়লে যাত্রী কমে যায়। অনেক সময় নিরাপত্তার কারণেও নৌকা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এমনও সময় যায় পুরো দিন পার করেও হাতে তেমন টাকা আসে না।

বয়স বাড়ছে, শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না। তবুও থেমে নেই রইস উদ্দিন। কারণ থেমে যাওয়ার সুযোগ তার নেই। তার জীবনে অবসর বলে কিছু নেই, আছে শুধু দায়িত্ব। সন্তানদের ভবিষ্যৎ, পরিবারের চাহিদা সবকিছু তাকে প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করার শক্তি দেয়। প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙে তার নতুন দিনের আশায় নয়-বৈঠা হাতে নেমে পড়েন নদীতে। আয় কমে গেছে, কিন্তু প্রয়োজন কমেনি।

ঘাটে নৌকা থেকে নামছেন যাত্রীরা

শহরের হাজারো মানুষের ভিড়ে রইস উদ্দিন যেন এক অদৃশ্য মানুষ। তার গল্প কেউ শোনে না, তার কষ্ট কেউ দেখে না। অথচ প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে নদী পার করে দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন শহরের নীরব সহযোদ্ধা। তার বৈঠার প্রতিটি টানে লুকিয়ে থাকে জীবনের গল্প, সংগ্রামের ইতিহাস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতিচ্ছবি।

বুড়িগঙ্গার কোলাহলময় পাড়ে রইস উদ্দিনের মতো আরও অনেক মাঝিই আছেন, যাদের জীবন এভাবেই নদীর স্রোতের মতো অনবরত বয়ে চলেছে। কেউ ক্লান্ত, কেউ সংগ্রামী, আবার কেউ স্বপ্ন দেখেন পরের দিনের। তবুও তারা থেমে যান না, কারণ তারা বিশ্বাস করেন-জীবন মানেই চলার নাম। এই চলার পথে বুড়িগঙ্গার বুকে ভেসে থাকা ছোট্ট নৌকাটিই তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। এই নৌকাই তাদের জীবিকার মাধ্যম, পরিবারের আশা আর টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

আরও পড়ুনসদরঘাট: যেখানে প্রতিদিন গড়ে ওঠে হাজারো জীবিকার গল্পচাকরির পাশাপাশি সাইক্লিং-ম্যারাথনে অনন্য সাফল্য মামুনের

কেএসকে