ফিচার

ফুটপাতে পেঁপে বিক্রি করে সচ্ছল মনির হোসেনের জীবন

নদীর ঢেউ, লঞ্চের সাইরেন, যাত্রীদের ভিড় আর হকারদের ডাক সব মিলিয়ে এক চিরচেনা কোলাহল। সেই ঘাটের পাশেই রয়েছে দেশের নামকরা কাপড়ের বাজার, যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা লেগেই থাকে সারাক্ষণ। এই ব্যস্ততাকেই কাজে লাগিয়ে রাস্তার ধারে বসে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদেরই একজন মনির হোসেন। ৪৪ বছর বয়সী এই মানুষটি গত ১৭ বছর ধরে পাকা পেঁপে কেটে বিক্রি করছেন। এই ফল বিক্রি দিয়েই তার সংসারে এসেছে সচ্ছলতা।

Advertisement

এটি হলো রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম জনপথগুলোর একটি সদরঘাট। ভোরের আলো ফোটার আগেই মনির হোসেনের দিন শুরু হয়। শহরের ঘুম ভাঙার আগেই তিনি নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে ফুটপাতে চলে আসেন। বাজার থেকে কিনে আনা পাকা পেঁপেগুলো যত্ন করে পরিষ্কার করেন, তারপর কেটে ছোট ছোট টুকরো করেন। পরে প্লেটে সাজিয়ে দেন রঙিন ফলের টুকরোগুলো।

এদিকে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে লঞ্চঘাটে নামা যাত্রী, অফিসগামী মানুষ, আশপাশের শ্রমজীবী ও ছাত্রছাত্রী সবাই মিলে এক কোলাহলে ভরে ওঠে। সেই ভিড়ের মাঝেই মনির হোসেন তার ছোট্ট জায়গাটিকে গুছিয়ে নেন। পাকা পেঁপের টুকরোগুলো সারিবদ্ধভাবে প্লেটে সাজানো থাকে, দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি খেতেও সুস্বাদু। প্রতি প্লেট মাত্র ৩০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় এটি অনেকেরই নাগালের মধ্যে। তাই দিনের বেশিরভাগ সময়ই ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে। এ ফল বিক্রিই মনিরের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বিক্রি হয়। কোনো কোনো দিনে, বিশেষ করে গরমের সময়ে এই অঙ্ক ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। গরমের দিনে পেঁপের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তপ্ত রোদে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ ঠান্ডা, রসালো পেঁপে খেয়ে কিছুটা স্বস্তি খোঁজেন। বছরের পর বছর কাজ করতে করতে মনির হোসেন এই ঋতুভিত্তিক চাহিদার ওঠানামা ভালোভাবেই বুঝে নিয়েছেন। সেই চাহিদাই তার মুখে হাসি ফোটায়।

Advertisement

মনির হোসেনের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলায়। গ্রামের সেই জীবন ছেড়ে অনেক বছর আগে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসেন তিনি। এক পর্যায়ে নিজের কিছু করার ইচ্ছা থেকেই পেঁপে বিক্রি শুরু করেন। শুরুর দিকে বিক্রি খুব বেশি ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিচিতি আর ক্রেতাদের আস্থা-সব মিলিয়ে তার ব্যবসা জমে ওঠে। এখন তিনি শুধু একজন বিক্রেতা নন, সদরঘাট এলাকার পরিচিত মুখ।

মনির বলেন, ‘পাকা পেঁপের চাহিদা সারা বছরই থাকে, তবে গরমের দিনে তা আরও বেড়ে যায়। সদরঘাট এলাকায় মানুষের চলাচল সবসময়ই বেশি থাকে। লঞ্চঘাট হওয়ায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। তার ওপর আশপাশে বাজার, অফিস-আদালত এবং বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের ভিড়ও নিয়মিত থাকে। তাই আলহামদুলিল্লাহ বিক্রি বেশ ভালোই হয়।’

ঢাকায় স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন তিনি। বড় সংসার চালানো সহজ নয়, কিন্তু ফুটপাতের এই ছোট ব্যবসাই তার জীবনের বড় ভরসা। তিন সন্তানের মধ্যে একজন ছেলে ও দুই মেয়ে। এক মেয়ে এরই মধ্যেই বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে, আরেকজনের বয়স ১২ বছর। তাই মনির হোসেনের সংসারের চাপও বেড়েছে। সন্তানদের পড়াশোনা, সংসারের খরচ- সবকিছুই তিনি সামলাচ্ছেন এই পেঁপে বিক্রির আয় দিয়েই।

মনির বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে এই পেঁপে বিক্রির মাধ্যমেই পরিবারের স্বচ্ছলতা এসেছে। সন্তানের পড়াশোনার খরচসহ সংসারের সব প্রয়োজনও এই আয় দিয়ে চলে। প্রতিদিনের বিক্রির একটা অংশ তিনি আলাদা করে রাখার চেষ্টা করেন। মাস শেষে কয়েক হাজার টাকা ব্যাংকেও জমা রাখেন তিনি। ফুটপাতে কাজ করা একজন মানুষের জন্য ব্যাংকে সঞ্চয় রাখা অনেক সময় স্বপ্নের মতো মনে হলেও মনির হোসেন তা বাস্তব করেছেন।’

Advertisement

তিনি বলেন, ‘সংসার চালানোর পাশাপাশি মেয়েদের বিয়ে ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য তিনি প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকা ব্যাংকে জমা রাখি। আলহামদুলিল্লাহ ধীরে ধীরে ভালো একটা সঞ্চয় করতে পারছি।’

তার এই ব্যবসা খুব বড় কিছু নয় না আছে কোনো দোকান, না কোনো স্থায়ী কাঠামো। ফুটপাতই তার কর্মক্ষেত্র, আকাশই তার ছাদ। শুধু আছে একটি টেবিল আর কয়েকটি টুল। সদরঘাটের ফুটপাতের বাস্তবতা সহজ নয়। এখানে প্রতিযোগিতা আছে, আছে অনিশ্চয়তা, আবার আছে জায়গা পরিবর্তনের ভয়ও-সবকিছুর মাঝেই টিকে থাকতে হয়।

মনির হোসেনের মতো আরও অনেককেই এই এলাকায় পাকা পেঁপে কেটে বিক্রি করতে দেখা যায়। সদরঘাটের ব্যস্ত ফুটপাতে ছোট ছোট এই ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো যেন জীবিকার একেকটি ভিন্ন গল্প বলে। বর্তমানে গরমের কারণে এসব ফলের দোকানে বিক্রিও ভালো হচ্ছে। ফলে বিক্রেতারাও নিজেদের ছোট্ট ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কারো হাতে ছুরি, কেউ আবার ফল কাটায় ব্যস্ত, আবার কেউ ক্রেতা সামলাতে ব্যস্ত সব মিলিয়ে সদরঘাটের এই অংশটি দারুণ এক কর্মচাঞ্চল্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

এই শহরে প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসে-যায়। কেউ খোঁজে কাজ, কেউ স্বপ্ন। অনেকেই হারিয়ে যায় ভিড়ের মাঝে। কিন্তু মনির হোসেনের গল্পটা আলাদা এটা শুধু একজন ফুটপাত ব্যবসায়ীর নয়, বরং টিকে থাকার লড়াইয়ে এক পরিবারের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার গল্প। সদরঘাটের কোলাহলের মাঝেও মনিরের জীবন এক নিঃশব্দ প্রেরণার গল্প হয়ে থাকে।

আরও পড়ুনউপকূলে ভেসে আসছে মৃত ডলফিন, কারণ কী?আগুনের মতোই রুদ্ররূপী: উপকূলের রহস্যময়ী নদী ‘আগুনমুখা’

কেএসকে