তাসনিম সংবাদ সংস্থার ‘ইমাম ও নেতৃত্ব’ গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকমণ্ডলীর সদস্য আলি আগাজানি ‘শহীদ আয়াতুল্লাহ সায়্যেদ আলি খামেনির রাজনৈতিক চিন্তায় ইরানের ধর্মতত্ত্ব’ শিরোনামের একটি নিবন্ধে লিখেছেন।
Advertisement
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির রাজনৈতিক চিন্তায় ইরানের ধর্মতত্ত্ব, কোনো বিমূর্ত ঐতিহাসিক ধারণা নয় বরং এটি একটি জীবন্ত, গতিশীল এবং ব্যবহারিক চিন্তাপদ্ধতি যেখানে ইসলামকে ইরানি পরিচয়ের আত্মা ও প্রাণ হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে।
এই ধর্মতত্ত্বে জাতীয় সব উপাদান-প্রাচীন ইতিহাস থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পর্যন্ত, ফারসি ভাষা থেকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিচিত্রতা, জাতীয় শক্তি থেকে ইরানি পণ্য সমর্থন করা পর্যন্ত-সবকিছু ধর্মীয় মানদণ্ডের (তওহিদ, ন্যায়বিচার, জিহাদ, আত্মবিশ্বাস এবং উম্মাহর ঐক্য) কাঠামোর মধ্যে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে।
এই চিন্তাধারার দৃষ্টিতে ইরান শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয় বরং ইরান একটি ‘ইসলামি মাতৃভূমি’। ইরান এমন একটি স্থান, যেখানে ইসলাম প্রবেশ করে এটি দখল করেনি, বরং এটি পরিপূর্ণ করেছে, উন্নত করেছে এবং আধুনিক ইসলামি সভ্যতার বিকাশের জন্য একটি ভিত্তিতে পরিণত করেছে।
Advertisement
এই ধর্মতত্ত্বের মূল কেন্দ্রীয় ধারণা হলো একটি মৌলিক বাক্য
‘ইসলামিকতা এবং ইরানিত্ব পরস্পরবিরোধী দুই মেরু নয়, বরং এক ও অভিন্ন সত্য। যে কেউ ইসলামের পক্ষ নেয়, যে কেউ ইসলামের সৈনিক হয়, সে স্বাভাবিকভাবেই সব মূল্যবোধের মধ্যে মাতৃভূমির মূল্যবোধও রক্ষা করে। মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ইমানের অংশ।’
এই দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামকে বিরোধের জায়গায় না রেখে বরং পারস্পরিক শক্তিবর্ধনের অবস্থানে রাখে এবং ইরানকে ইসলামি ব্যবস্থার বাস্তবায়নের হৃদয় ও কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করে, যা জাতীয় কিন্তু আন্তর্জাতিক, ইরানি কিন্তু উম্মাহভিত্তিক।
ইরান ও ইসলামের সম্পর্ক: সমন্বয় এবং এক অভিন্ন সত্য
Advertisement
এই ধর্মতত্ত্বে ইরান ও ইসলামের সম্পর্ক কোনো বিরোধ নয়, বরং পারস্পরিক সমন্বয়, পারস্পরিক সেবা এবং পরিপূর্ণতার সম্পর্ক। ইসলাম ইরানকে বর্ণবাদ ও চরম জাতিগত গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করেছে এবং এটিকে একটি বৈশ্বিক উম্মাহভিত্তিক পরিচয় দিয়েছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রে জাতীয়তাবাদ হলো ‘উম্মাহভিত্তিক জাতীয়তাবাদ’
বর্ণবাদ ছাড়াই নিপীড়িতদের (মজলুমদের) সমর্থন করা। যারা জাতীয়তাকে ইসলামের বিপরীতে দাঁড় করায়, তারা উভয়কেই দুর্বল করে।
আরোপিত যুদ্ধ (ইরান-ইরাক যুদ্ধ) এটি প্রমাণ করেছে। ইসলাম ইরানের সীমান্ত রক্ষা করেছে এবং ইরানি হওয়াটা বিশ্বাসের মাধ্যমে শক্তি অর্জন করেছে। ‘মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ইমানের অংশ’—এটি কোনো স্লোগান নয়, বরং একটি ফিকহি (ইসলামি আইনগত) মূলনীতি।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থায় মূল্যায়নের কেন্দ্র হলো ‘ইসলামিকতা এবং ইরানি হওয়া’। জাতীয় পরিচয় শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর একটি বৈশ্বিক প্রভাবও রয়েছে।
জাতিগত বৈচিত্র্য কোনো হুমকি নয়, বরং ঐক্য গঠনের একটি সুযোগ। কারণ, ইসলাম জাতি ও ভাষার মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।
ইতিহাসের উৎসসমূহ
বিপ্লবের আগে, ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী এবং পাহলভি শাসনব্যবস্থা জাতীয়তাবাদকে ইসলামের বিপরীতে একটি কৃত্রিম বিরোধ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। পাহলভিদের চরম প্রাচীনতাবাদ (বস্তুত প্রাক-ইসলামিক যুগের মহিমা প্রচার) সেই যুগকে স্বর্ণযুগ হিসেবে দেখাত এবং ইসলামকে অবনতির কারণ হিসেবে তুলে ধরত। ইসলামি বিপ্লব এই কৃত্রিম দ্বৈততা ভেঙে দেয়।
এই ধর্মতত্ত্বের বাস্তব পরীক্ষা আরোপিত যুদ্ধে (ইরান-ইরাক যুদ্ধ)
যখন আন্তর্জাতিক আক্রমণ ইরানের সীমান্তে পৌঁছে যায়, তখন যারা নিজেদের ‘ইরানপ্রেমী’ বলে দাবি করত তারা ঘরে লুকিয়ে পড়ে, কিন্তু ‘ধর্মপ্রাণ মুসলিম তরুণরা, যারা রাতের নামাজ পড়ত’ তারা সীমান্ত রক্ষায় এগিয়ে আসে।
ইসলাম ইরানকে রক্ষা করেছে, আর ইসলাম ছাড়া ইরানীয়তা নির্ভরতা ও অপমানের দিকে নিয়ে গেছে। পবিত্র প্রতিরক্ষা (যুদ্ধ) প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃত দেশপ্রেম হলো উম্মাহভিত্তিক এবং ইসলামিক দেশপ্রেম। ইসলাম শুধু ইরানের সীমান্তই রক্ষা করেনি, বরং ইরানীয়তাকে বিশ্বাসের মাধ্যমে শক্তি ও মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
ইরানের ইতিহাস: পারস্পরিক পরিপূর্ণতা ও উৎকর্ষ
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনির চিন্তাধারায়, প্রাচীন ইরানের ইতিহাসকে না সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়, না এটিকে পূজার বস্তু (বিগ্রহ) বানানো হয়। এর মধ্যে ন্যায়বিচার-চেতনা এবং জুলুমবিরোধিতার শিকড় রয়েছে, তবে ইসলাম এটিকে পূর্ণতা দিয়েছে।
শহীদ মোতাহারি তার ‘ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক সেবা’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে ইসলাম ইরানকে সেবা করেছে (যুক্তিবাদ ও আধ্যাত্মিকতাকে বিকশিত করেছে) আর ইরান ইসলামের বিস্তারের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করেছে।
পাহলভি শাসকরা চরম প্রাচীনতাবাদের মাধ্যমে ইসলামকে পশ্চাৎপদতার কারণ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। ফল ছিল বাহরাইনসহ কিছু ভূখণ্ড হারানো। ইসলামি বিপ্লব এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাতিল করে দেয়।
ইসলামের পরবর্তী ইতিহাস ইরানের প্রকৃত বিকাশের যুগ
অনুবাদ আন্দোলন, ইসলামি বিজ্ঞান, ফারসি সাহিত্য এবং ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ইরানের গৌরবময় অর্জনগুলো ইসলামের পরবর্তীসময়েই সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়েছে, যা প্রাক-ইসলামিক যুগে দেখা যায়নি।
ইরানি পরিচয় ইসলাম ছাড়া অসম্পূর্ণ, আর ইরানি ভিত্তি ছাড়া ইসলাম সাংস্কৃতিক গভীরতা থেকে বঞ্চিত থাকে।
এই সমন্বয়ের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো আয়াতুল্লাহ খামেনির সেই পদক্ষেপ, যেখানে তিনি বিপ্লবের শুরুর দিকে ফেরদৌসীর কবর ধ্বংস করা থেকে রক্ষা করেন। কিছু লোক হাতুড়ি নিয়ে তুস শহরে গিয়েছিল, কিন্তু তার একটি নির্দেশনা সেই ধ্বংস ঠেকিয়ে দেয় এবং দেখায় যে, ‘শাহনামা’ ও ফেরদৌসীর প্রজ্ঞা ইরানি-ইসলামি ঐতিহ্যেরই অংশ।
ইরানের ধর্মতত্ত্বে দেশপ্রেম
এই চিন্তাধারায়, স্বদেশ হলো ‘ইসলামি মাতৃভূমি’ এবং এটি ভালোবাসা ইমানের একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। দেশপ্রেম হলো ইসলামের সৈনিক হওয়ার স্বাভাবিক ফলাফল। পবিত্র প্রতিরক্ষা (ইরান-ইরাক যুদ্ধ) প্রকৃত ধর্মপরায়ণতা ও দেশপ্রেমের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।এই দেশপ্রেম ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ থেকে আলাদা এবং এটি উম্মাহভিত্তিক ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেয়। এটি তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানায় সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা এবং শক্তিশালী ইরান গঠনের জন্য।
ইরানকেন্দ্রিকতার ওপর গুরুত্বের তুলনা: ইমাম আলি খোমেনি এবং আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি
ইমাম খোমেনী (রহ.) এবং শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনির মধ্যে ‘ইরানকেন্দ্রিকতা’ বিষয়ে গুরুত্বারোপের পার্থক্য কোনো বিরোধ নয়, বরং এটি ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশ ও পরিপূর্ণতা।
ইমাম খোমেনী বিপ্লবের পর্যায়ে ‘বিশুদ্ধ ইসলাম’ (খাঁটি ইসলাম) এর ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন যাতে পাহলভি শাসনের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদকে নিষ্ক্রিয় করা যায়।
অন্যদিকে শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনি স্থিতিশীলতা ও প্রতিরক্ষার পর্যায়ে ইসলামিকতা ও ইরানীয়তার পূর্ণ ঐক্য ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে জাতীয় পরিচয়কে ইসলামের সেবা এবং রাষ্ট্রের শক্তির জন্য কাজে লাগানো যায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় ঐক্য, আত্মবিশ্বাস এবং ইসলামি সভ্যতার স্থানীয় রূপায়ণকে আরও শক্তিশালী করে।
ফারসি ভাষা: জাতীয় পরিচয়ের দ্বিতীয় স্তম্ভ
ইরানের ধর্মতত্ত্বে ফারসি ভাষা হলো জাতীয় পরিচয়ের দ্বিতীয় স্তম্ভ, যেখানে প্রথম স্তম্ভ হিসেবে ইসলামকে (ঐক্যের ভিত্তি) ধরা হয়। শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনি ফারসি সাহিত্য সম্পর্কে অসাধারণ জ্ঞান রাখতেন। রুদাকি ও ফেরদৌসী থেকে শুরু করে হাফিজ, সাদি এবং রুমির মতো কবিদের তিনি ইরানি-ইসলামি চিন্তা, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার বাহন হিসেবে বিবেচনা করতেন।
জ্ঞান-বিজ্ঞান ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে প্রসারিত হওয়া উচিত নয়, কারণ, ফারসি ভাষা সব বৈজ্ঞানিক ধারণা প্রকাশ করতে সক্ষম। ভাষা সংস্থা (আকাদেমি) নতুন শব্দ তৈরি করবে, যাতে ‘ফারসি ভাষা অক্ষম’—এই ধারণা দূর হয়।
ফারসি সাহিত্য ইসলামি বিশ্বাসের প্রতিফলনকারী আয়না হিসেবে বিবেচিত এবং প্রতি বছরের সাহিত্য আসরগুলো এই গভীর সম্পর্কের প্রতীক।
অন্য জাতিগোষ্ঠীর উচ্চারণ নিয়ে বিদ্রূপ করা হারাম এবং এর পেছনে ঔপনিবেশবাদী চিন্তার প্রভাব রয়েছে। কুর্দি ও তুর্কি ভাষা জাতীয় সম্পদ, তবে ফারসি হলো ঐক্য ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির ভাষা।
তিনি ফারসি সাহিত্যে এতটাই গভীর জ্ঞান রাখতেন যে, তা সাধারণ স্তরের বাইরে। গোলাম আলি হাদ্দাদ আদেল এই জ্ঞানকে ‘অসাধারণ ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি নিজেও ‘আমিন’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন এবং তার কবিতাগুলোতে আধ্যাত্মিক, বীরত্বপূর্ণ ও প্রেমময়-ঐশী (আধ্যাত্মিক প্রেম) ভাব দেখা যায়। তার কিছু কবিতা যেমন “دل را ز بیخودی سرِ از خود رمیدن است” (অর্থ: হৃদয় নিজ সত্তা হারিয়ে নিজ থেকে পালাতে চায়) প্রকাশিত হয়েছে।
ইরানি জাতিগোষ্ঠী: ঐক্যের মধ্যে বিচিত্রতা
আয়াতুল্লাহ খামেনির দৃষ্টিভঙ্গিতে ইরানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী (ফারসি, তুর্কি, কুর্দি, আরব, বেলুচ, তুর্কমেন, লর) জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাহলভি শাসন এসব জাতিগোষ্ঠীকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে দেখত, কিন্তু ইসলামি বিপ্লব বিভিন্ন জাতি ও উপভাষার মধ্যে ঐক্য ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করেছে।সব জাতিগোষ্ঠীই ইসলামি ইরানের প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী এবং এটিকে নিজেদের মাতৃভূমি হিসেবে গণ্য করে।
জাতিগত বৈচিত্র্য কোনো হুমকি নয়, বরং জাতীয় কল্যাণে গঠনমূলক প্রতিযোগিতার একটি সুযোগ ও শক্তি। জাতিগত পরিচয়কে জাতীয় অগ্রগতির সেবায় ব্যবহার করতে হবে। ইসলাম বর্ণবৈষম্য প্রত্যাখ্যান করে এবং বৈচিত্র্য একটি নিয়ামত হিসেবে দেখে।
পবিত্র প্রতিরক্ষা (যুদ্ধ) এবং বাসিজে কোনো জাতিগত সীমারেখা ছিল না; খ্রিষ্টান, ইহুদি, জরথুস্ত্রীয় এবং সুন্নি মুসলিমরা শিয়া মুসলমানদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইসলাম ও ইরানের জন্য যুদ্ধ করেছে।
শত্রুরা জাতিগোষ্ঠীগুলোকে বিভক্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু ইসলামি ইরানের শাসনব্যবস্থা সবাইকে ‘ইসলামি ইরান’ নামক একক পতাকার নিচে একত্র করেছে।
ইরানি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনির চিন্তাধারায় জ্ঞান হলো ‘শক্তি’—অর্থাৎ “العلم سلطان” (জ্ঞানই ক্ষমতা)।বিপ্লবের পর ইরান বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ন্যানোপ্রযুক্তি, জীবপ্রযুক্তি, পারমাণবিক বিজ্ঞান এবং স্টেম সেল গবেষণায় বিশ্বমানের অবস্থানে পৌঁছেছে।
এই অগ্রগতি ইসলামি আত্মবিশ্বাস এবং বিশ্বাসী তরুণদের জিহাদি মানসিকতার ফল। বৈজ্ঞানিক জিহাদ মানে হলো অবিরাম, নিষ্ঠাবান এবং ঝুঁকি গ্রহণকারী প্রচেষ্টা। জ্ঞানকে ফারসি ভাষায় প্রসারিত করতে হবে, যাতে জাতীয় ভাষা জ্ঞানের বাহন হয়ে উঠতে পারে। বৈজ্ঞানিক পশ্চাৎপদতা দুর্বলতা সৃষ্টি করে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি জাতীয় ও ইসলামি শক্তি গড়ে তোলে।
বিপ্লবের আগে ইরান বৈজ্ঞানিক উৎপাদনে প্রায় শূন্য অবস্থায় ছিল, কিন্তু বিপ্লবের পর এটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির গতিতে রেকর্ড অর্জন করেছে।
ক্ষমতা, কর্তৃত্ব এবং ইরানি পণ্য: জাতীয় ও ধর্মীয় সমন্বয়
এই চিন্তাধারায় ইরানের শক্তি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের সমন্বয়ের ফল। পবিত্র প্রতিরক্ষা (যুদ্ধ) ছিল এই সমন্বয়ের বড় পরীক্ষা। ইসলাম ছাড়া জাতীয়তাবাদ নির্ভরতার দিকে নিয়ে যায়, কিন্তু ইসলামের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইরান তার পুরো ভূখণ্ড রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।
বাসিজ (স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী) হলো জনগণের শক্তির প্রতীক। এই দর্শনে শক্তি মানে আধিপত্য বিস্তার নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান।
ইরানি পণ্য সমর্থন করাও একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশীয়ভাবে উৎপাদনযোগ্য পণ্য আমদানি করা শরীয়ত ও আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়।দেশীয় পণ্য ব্যবহার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শক্তিশালী করে এবং এটিকে
‘অর্থনৈতিক জিহাদ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
‘যখন আপনি দেশীয় পণ্য ব্যবহার করেন, তখন আপনি একজন ইরানি শ্রমিককে সাহায্য করেন।’
ইরানের বৈশিষ্ট্য এবং ইসলামি-ইরানি উন্নয়ন মডেল
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনির দৃষ্টিতে, ইরান একটি প্রাচীন সভ্যতার দেশ, যার রয়েছে বিশাল সাংস্কৃতিক সম্পদ, ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিক সম্পদ (বিশ্বের খনিজ সম্পদের প্রায় ৭ শতাংশ, অথচ জনসংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ), তরুণ ও বিশ্বাসী মানবসম্পদ এবং বিপ্লব-পরবর্তী উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন। ইরানি জাতি ইমানদার, ধৈর্যশীল, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং নিজের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন।
ইসলামি-ইরানি উন্নয়ন মডেলে ‘ইরানীয় পরিচয়’ একটি মৌলিক ও কেন্দ্রীয় উপাদান। এই মডেল অবশ্যই স্থানীয় বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হবে এবং ইরানের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূগোল ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, যাতে এটি বিমূর্ত না হয়ে যায়।
ইরান এই মডেল বাস্তবায়নের উপযুক্ত ভূমি। উন্নয়নকে ইরানি বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে—যেমন জ্ঞানের জন্য ফারসি ভাষার ব্যবহার, ঐক্যের জন্য জাতিগত বৈচিত্র্য এবং সম্পদের জন্য প্রাকৃতিক সক্ষমতা।
এই মডেল হলো একটি বড় ধরনের জিহাদ, যার লক্ষ্য একটি শক্তিশালী ইসলামি ইরান গঠন করা এবং আধুনিক ইসলামি সভ্যতার নেতৃত্ব দেওয়া।
উপসংহার
ইরানের ধর্মতত্ত্ব— আধুনিক সভ্যতার তৃতীয় পথ
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনির রাজনৈতিক চিন্তায় ইরানের ধর্মতত্ত্ব একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা, যেখানে সব জাতীয় উপাদানকে ধর্মীয় মানদণ্ডের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। ইরান হলো ইসলামি ব্যবস্থার বাস্তবায়নের উপযুক্ত ভূমি-জাতীয় কিন্তু আন্তর্জাতিক, ইরানি কিন্তু উম্মাহভিত্তিক।
এই ধর্মতত্ত্ব তরুণ প্রজন্মকে চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানায়, যাতে শহীদদের উত্তরাধিকার রক্ষা করা যায়।
একটি বিশ্বে, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ বা জাতীয় শিকড়বিহীন ইসলাম-দুটিই অকার্যকর, সেখানে খামেনির ধর্মতত্ত্ব তৃতীয় পথ দেখায়: একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভর এবং ন্যায়ভিত্তিক ইসলামি ইরান।
ইরান কোনো প্রান্তিক রাষ্ট্র নয়, বরং আধুনিক ইসলামি সভ্যতার স্পন্দিত হৃদয়।
সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সিকেএম