ভোর না হতেই কর্ণফুলীর পাড়ে নড়াচড়া শুরু হয়। বন্দর এলাকায় ট্রাকের লাইন, কন্টেইনার ওঠানামা, আর তার মাঝখানে ছুটে চলা মানুষ। কারো হাতে দড়ি, কারও কাঁধে বোঝা, কারো চোখে রাতজাগার ক্লান্তি। শহর তখনো পুরো জাগেনি, কিন্তু শ্রমিকের দিন শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই।
Advertisement
এই শহরের অর্থনীতি অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে এই মানুষগুলোর ওপর, যাদের দেখা যায় প্রতিদিন, কিন্তু আলাদা করে মনে রাখা হয় কম। তাদের কথা সামনে আসে নির্দিষ্ট কিছু দিনে, তারপর আবার আড়ালে চলে যায়।
শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা আর ন্যায্যতার প্রশ্ন সামনে আনে। ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেটি এখনো একটি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু চট্টগ্রামের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা থেকেই যায় এই মানদণ্ড কতটা মানা হচ্ছে?
চট্টগ্রাম বন্দরের আশপাশে কাজ করা এক শ্রমিক বলছিলেন, দিনে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করি। কাজ রাখলে আয় বন্ধ। ৮ ঘণ্টা কাজের কথা কাগজে আছে, কর্মে নাই। আইনে শ্রমঘণ্টা নির্ধারিত। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা অতিক্রম করে। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়ন্ত্রণ কম, দরকষাকষির সুযোগও সীমিত। ফলে কাজের সময় বাড়লেও, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা থাকে না শ্রমিকের হাতে।
Advertisement
চট্টগ্রাম ইপিজেড ও আশপাশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো দেশের অর্থনীতির বড় অংশ বহন করে। হাজার হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করেন। উৎপাদনের টার্গেট পূরণে অতিরিক্ত সময় কাজ অনেক ক্ষেত্রে নিয়মে পরিণত হয়েছে। মজুরি বাড়ার কথা বলা হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে অনেকেই হিমশিম খান।
এখানকার একজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘মাসের শেষে টাকা পাই, কিন্তু নিজের জন্য কিছু থাকে না। বাসা ভাড়া, বাজার করতেই সব শেষ হয়ে যায়।’
নির্মাণ খাতে ঝুঁকি আরও স্পষ্ট। বহুতল ভবনের কাজ করতে গিয়ে প্রতিদিনই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত সেফটি গিয়ার থাকে না, প্রশিক্ষণ ছাড়াই উঁচু জায়গায় কাজ করতে হয়। দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকে।
একজন নির্মাণের কাছে কাছের সময় যে হেলমেট ছাড়া জীবনের ঝুঁকি আছে তা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলন, ‘হেলমেট দিলে ভালো, না দিলেও কাজ বন্ধ থাকে না। আমাদের সেই সুযোগ নাই।’
Advertisement
পরিবহন খাতেও একই চিত্র। ড্রাইভার ও হেলপারদের নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রায় নেই। দীর্ঘসময় গাড়ি চালানো, কম বিশ্রাম-এসব সরাসরি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু কাজ থামালে আয় থেমে যায়, বাড়িতে বাজার করার টাকা থাকে না-এই বাস্তবতা তাদের সিদ্ধান্তকে সীমিত করে দেয়।
বাংলাদেশে শ্রম আইন, নীতিমালা, নিরাপত্তা নির্দেশিকা সবই আছে। কাগজে কাঠামো পরিষ্কার। কিন্তু মাঠে গেলে দেখা যায়, সেই নিয়ম অনেক জায়গায় কার্যকর হয় না। তদারকির সীমাবদ্ধতা, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিস্তৃতি, আর বাস্তব চাপ সব মিলিয়ে আইন আর প্রয়োগের মধ্যে ফারাক থেকেই যায়।
শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগও সব জায়গায় সমান নয়। ফলে অনেকেই সমস্যার কথা জানলেও তা নিয়ে সামনে আসতে পারেন না। এই বাস্তবতায় আইন থেকে যায় কাগজে, আর কাজ চলে আলাদা নিয়মে। আমরা প্রতিদিন যে শহরে চলাফেরা করি, যে রাস্তায় হাঁটি, যে ভবনে থাকি, যে পোশাক ব্যবহার করি-সবকিছুর পেছনে শ্রমিকের অবদান জড়িয়ে আছে। তবু সামাজিকভাবে তাদের অবস্থান এখনো প্রান্তিক। এই দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে শুধু নীতিমালা দিয়ে খুব বেশি পরিবর্তন আনা কঠিন।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্রমের মূল্যায়ন স্পষ্ট। হাদিসে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি যথাযথভাবে পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। ঘাম শুকানোর আগেই প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। বাস্তবে এই নীতির প্রতিফলন কতটা ঘটছে, সেটি ভেবে দেখার জায়গা আছে।
প্রতি বছর বিভিন্ন কর্মসূচি হয়, আলোচনা হয়, প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির প্রভাব শ্রমিকের জীবনে কতটা পৌঁছায়, তার স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না। চট্টগ্রামের ভোর যেমন শ্রমিকের উপস্থিতিতে শুরু হয়, তেমনি এই শহরের গতি নির্ভর করে তাদের কাজের ওপর। কিন্তু সেই কাজের মূল্য যদি ন্যায্যভাবে না মেলে, তাহলে অগ্রগতির ছবির ভেতরেই থেকে যায় অসমতা। শ্রমিকের পরিশ্রম দৃশ্যমান। প্রশ্নটা থেকে যায়-এই পরিশ্রমের প্রতিফলন কতটা ন্যায্যভাবে তাদের কাছে ফিরে যাচ্ছে।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও গল্পকার
আরও পড়ুনসদরঘাট: যেখানে প্রতিদিন গড়ে ওঠে হাজারো জীবিকার গল্পচাকরির পাশাপাশি সাইক্লিং-ম্যারাথনে অনন্য সাফল্য মামুনেরকেএসকে