দিনভর আপনি হয়তো সবার মুখে হাসি ফোটান। বন্ধুদের আড্ডায় আপনাকে ছাড়া যেন প্রাণই আসে না। অফিসে সবাই আপনাকে পছন্দ করে, পরিবারের কাছেও আপনি ‘সব ঠিক রাখা’ মানুষ। কিন্তু দিনের শেষে যখন নিজের ঘরে ফেরেন, তখন কি কখনো হঠাৎ এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করেন? মনে হয়, এত মানুষের ভিড়েও যেন সত্যিকার অর্থে কেউ আপনাকে জানে না।
Advertisement
এই অনুভূতিটা নতুন কিছু নয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক মানুষ আছেন যারা বাইরে থেকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত, মিশুক ও জনপ্রিয় হলেও ভেতরে ভেতরে গভীর একাকিত্ব বয়ে বেড়ান।
সবার প্রিয় হওয়াটাও এক ধরনের চাপঅনেকেই ছোটবেলা থেকেই শিখে যায় কীভাবে অন্যদের খুশি রাখতে হয়। কোথায় কী কথা বললে মানুষ পছন্দ করবে, কোন আচরণে সবাই স্বস্তি পাবে-এসব তারা খুব ভালো বোঝে। ধীরে ধীরে তারা এমন একটি ব্যক্তিত্ব তৈরি করে ফেলে, যেটা সবাই গ্রহণ করে সহজে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ‘পছন্দের মানুষ’ হয়ে ওঠার পথে তারা নিজের সত্যিকারের অনুভূতিগুলো আড়াল করতে শুরু করে। তারা কষ্ট পেলেও সেটা দেখায় না, মন খারাপ হলেও হাসিমুখে থাকে। ফলে মানুষ তাদের ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু সত্যিকার অর্থে চেনে খুব কমই।
মনোবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে অনেক সময় বলা হয়, ‘লাইকড বাট নট ট্রুলি নো’। অর্থাৎ মানুষ আপনাকে পছন্দ করে, কিন্তু আপনার আসল মানুষটাকে জানে না।
Advertisement
যারা সবাইকে খুশি রাখতে অভ্যস্ত, তারা সাধারণত নিজের আবেগ প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে। তারা মনে করে, আমি যদি আমার দুর্বল দিকটা দেখাই, মানুষ কি আমাকে আগের মতো পছন্দ করবে? এই ভয় থেকেই তারা নিজের কথাগুলো আটকে রাখে। কষ্ট পেলেও বলে, আমি ভালো আছি। সাহায্য দরকার হলেও চুপ থাকে। একসময় এই অভ্যাস এতটাই গভীর হয় যে তারা নিজের আসল অনুভূতির সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি করে ফেলে।
তারা সবার পাশে থাকে, কিন্তু নিজের পাশে কাউকে ডাকে না। এই ধরনের মানুষদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা অন্যদের সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনে। বন্ধুদের বিপদে পাশে থাকে, সবার মানসিক ভরসা হয়ে ওঠে। কিন্তু নিজের প্রয়োজনের সময় তারা খুব কমই কাউকে বলে, আমারও খারাপ লাগছে অথবা আমারও কাউকে দরকার। ফলে আশপাশের মানুষ ধরে নেয়, এই মানুষটির বুঝি কোনো কষ্টই নেই। কারণ সে তো সব সময় হাসিখুশি। অথচ ভেতরে ভেতরে সেই মানুষটিই হয়তো সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত।
জনপ্রিয়তা আর গভীর সম্পর্ক এক জিনিস নয়অনেক মানুষ আপনাকে চিনতে পারে, আপনার সঙ্গে সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা আপনার ভেতরের মানুষটাকেও বুঝে। পরিচিতি আর সংযোগ, এই দুই বিষয় আলাদা। একজন মানুষের অনেক বন্ধু থাকতে পারে, কিন্তু গভীরভাবে মনের কথা বলার মতো মানুষ হয়তো একজনও নেই। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় একাকিত্ব। গবেষণায়ও দেখা গেছে, যাদের সামাজিক পরিচিতি বেশি কিন্তু আবেগগতভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কম, তারা মানসিকভাবে বেশি নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন।
আরও পড়ুন: স্ত্রী বাবার বাড়ি গেলে পুরুষদের মনে কী চলে? নেতিবাচকতার ভিড়ে যেভাবে থাকবেন ইতিবাচক সন্তান কি সত্যিই বাড়ায় দাম্পত্য দূরত্ব? ‘ভালো মানুষ’ হয়ে থাকার ক্লান্তিসব সময় সবার মন রেখে চলা বাইরে থেকে সহজ মনে হলেও, বাস্তবে এটি খুব ক্লান্তিকর। কারণ তখন প্রতিটি আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। কোন কথায় কে কষ্ট পাবে, কোথায় কী বলা উচিত, কোন অনুভূতি লুকাতে হবে এসব হিসাব সব সময় মাথায় রাখতে হয়। ধীরে ধীরে মানুষ নিজের স্বাভাবিক সত্তা হারিয়ে ফেলে। সে এমন একটি সংস্করণে পরিণত হয়, যেটা সবাই পছন্দ করে; কিন্তু যেটা পুরোপুরি তার নিজের নয়।
Advertisement
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ সম্পর্ক গড়তে হলে নিজের বাস্তব অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সব সময় নিখুঁত বা শক্তিশালী দেখানোর প্রয়োজন নেই। বরং মাঝেমধ্যে নিজের দুর্বলতা, ভয় বা কষ্টের কথাও বলা দরকার। কারণ প্রকৃত সম্পর্ক তৈরি হয় তখনই, যখন একজন মানুষ তার মুখোশ ছাড়াই অন্যের সামনে দাঁড়াতে পারে।
একাকিত্ব কমাতে কী করতে পারেন? সব সময় ‘পারফেক্ট’ হওয়ার চেষ্টা করবেন না। সবাইকে খুশি রাখতেই হবে, এই চাপ থেকে বের হওয়া জরুরি। মানুষ হিসেবে আপনার মন খারাপ হতে পারে, ভুল হতে পারে, দুর্বল লাগতেই পারে। এটাই স্বাভাবিক। ছোট ছোট সত্য বলা শুরু করুন। সব অনুভূতি একদিনে খুলে বলতে হবে না। কিন্তু অন্তত বিশ্বাসের মানুষের কাছে নিজের বাস্তব অবস্থাটা জানানোর অভ্যাস করুন। আজ একটু খারাপ লাগছে, এই ছোট বাক্যটাও অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শুধু দেওয়াই নয়, নেওয়াও শিখুন। আপনি যদি সব সময় অন্যের পাশে থাকেন, তাহলে নিজের প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাইতেও দ্বিধা করবেন না। সুস্থ সম্পর্ক কখনো একতরফা হয় না। সংখ্যার চেয়ে গভীরতাকে গুরুত্ব দিন। জীবনে শত পরিচিত মানুষের চেয়ে দু-একজন সত্যিকারের মানুষ বেশি মূল্যবান। যারা আপনার হাসির পাশাপাশি কান্নাটাও বুঝতে পারে, তারাই আসলে আপনার আপনজন।সবাইয়ের প্রিয় হওয়া খারাপ কিছু নয়। কিন্তু সেই চেষ্টায় যদি একজন মানুষ নিজের আসল অনুভূতিগুলো হারিয়ে ফেলেন, তাহলে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা তৈরি হয়। দিনশেষে মানুষ সবচেয়ে বেশি শান্তি পায় সেখানে, যেখানে তাকে অভিনয় করতে হয় না। যেখানে ‘ভালো আছি’ বলার বাধ্যবাধকতা নেই। যেখানে সে নিজের মতো করেই গ্রহণযোগ্য। কারণ সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি হয় নিখুঁত মানুষ দিয়ে নয়, বরং সত্যিকারের মানুষ দিয়ে।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্পেস
জেএস/