টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিই কৃষকের স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে। একদিকে নিচু জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে; অন্যদিকে ধান কাটার শ্রমিক পাচ্ছেন না। চোখের সামনে তলিয়ে যাওয়া স্বপ্ন বাঁচাতে পানিতে নেমে ধান কাটছেন নিজেরাই। ধানের ভড়া মৌসুমে জেলাজুড়ে ধান মাড়াইয়ের ব্যস্ততা থাকলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। একদিকে শ্রমিক সংকট; অন্যদিকে উচ্চ মজুরি। তারপরও বাজারে সেই ধানের দর পানির মতো। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ শুরু হলেও নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে কৃষকদের।
Advertisement
উত্তরের জেলা গাইবান্ধা। জেলার কৃষিপ্রধান অর্থকরী ফসল হলো ধান। ধান চাষের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখেন। এ বছর তেল, সার ও বীজ চড়া দামে কিনে আবাদ করছেন কৃষকেরা। অন্যদিকে দফায় দফায় ডিজেল সংকটে ভুগছেন। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের মাধ্যমে ধানের আবাদ করতে হয়েছে তাদের। সব কষ্ট ভুলে সারাবছরের খোরাকের আশায় বুক ভরা স্বপ্ন বুনছিলেন কৃষকেরা। হঠাৎ সেই স্বপ্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের হানায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।
সরেজমিনে জানা যায়, মাঠজুড়ে সোনালি ধানের শীষ উঁকি দিচ্ছে হাটু পানিতে। অনেক বিলে দলবেঁধে ধানের কাজ করছেন শ্রমিকেরা। অনেকেই শ্রমিকের দাম বেশি হওয়ায় নিজেরাই ধান কাটছেন। বিলে বিলে কৃষি শ্রমিকেরা মনের আনন্দে ধান কাটলেও গেরস্থদের মুখে হাসি নেই। অনেকেই ধার-দেনা করে ধানের আবাদ করেছেন। সেই ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করা তো দূরের কথা, সারাবছরের খোরাক নিয়ে চিন্তায় আছেন।
কৃষকেরা বলছেন, বোরো আবাদের ধানই তাদের সারাবছরের আয় রোজগারের হিসাব। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর সবকিছু চড়া দামে কিনে আবাদ করছেন। ধান কাটার শুরুর মুহূর্তে কয়েকদিনে টানা বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দ্বিগুণ দামে শ্রমিক নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাজারে ধানের দাম একেবারেই কম। আবাদ তুলে বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হবে। অন্যদিকে অনেকের সারাবছরের খোরাক ধান। সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে।
Advertisement
তারা বলছেন, এ বছর তাদের খোরাকে টান পড়ছে। সরকার নির্ধারিত মণপ্রতি ১৪৫০ টাকা করে দিলেও বাজারে ধানের দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। কৃষক সরকারি গোডাউনে ধান দিতে গেলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার মালীবাড়ীর কৃষক আফসার মিয়া বলেন, ‘ধানের দাম কমে যাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। হালচাষ, সেচ, সার, কীটনাশক সবকিছুর খরচ বেড়েছে। দোকানের ধার-দেনা, ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবো, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
আরও পড়ুনশার্শা-বেনাপোলে বোরো ধানের বাম্পার ফলনের হাতছানিপলাশবাড়ী উপজেলার আলেয়া বেওয়া বলেন, ‘এবার ঝড়-বাতাসোত সব ধানে শুতে গেছে। মোর এখান ৪০ শতক জমি। ধানের গো লাত পানি উঠছে। এই জমির ধান মুই সারাবছর খাম। কৃষাণের যে দাম। কৃষাণ দিয়ে কাটে নিলে যেক না ধান পাম। শোককোনা ধান বেচলেও কৃষাণের ট্যাকা দিতেই যাবে। তাই কষ্ট করে হলেও মোর ব্যাটি ছল কোনা নিয়ে কাটতেছোম। তারপরও এবার মোর খোরাকোত টান ধরবে।’
আরেক কৃষক জমির আলী বলেন, ‘বাজারোত ধানের দাম নাই বললেই চলে। খরচের ট্যাকা তোলার জন্য সরকারের ঘরোত ধান দিলে কিছুটা ক্ষতি কম হলো হয়। চারদিন ঘুরছোম অনলাইন নাকি বন্ধ।’
Advertisement
সুন্দরগঞ্জের কৃষক ছালাম মিয়া বলেন, ‘গত কয়েক বছরে ধান উৎপাদনের খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু বাজারমূল্য সেই তুলনায় বাড়েনি বরং অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। ফলে বিনিয়োগের টাকা ঘরে তুলতেই হিমশিম খাচ্ছি।’
সাঘাটার কৃষক ওমর ফারুক বলেন, ‘সরকারের গুদামে ধান দেওয়ার জন্য ঘুরছি। ইউনিয়ন পরিষদসহ কয়েক দোকানে গেলাম। সফট্যয়ার নাকি বন্ধ। যারা গতবার করতে পারছে, তারাই ঢুকতে পারছে। আমরা নতুন করে আবেদন করবো, তাদের হচ্ছে না।’
মাঠ পর্যায়ের কৃষকের দাবি, সরকার কৃষকদের ধান ক্রয় না করলে এবং বাজারে দাম না বাড়লে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।
গাইবান্ধা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘জেলায় চলতি মৌসুমে ৯ হাজার মেট্রিক টন ধান কেনা হবে। কৃষকেরা অনলাইনে আবদেন করবেন। লটারির মাধ্যমে যাদের নাম উঠবে; তাদের ধান নেওয়া হবে।’
আরও পড়ুননড়াইলে ব্ল্যাক রাইস চাষে রহমতের বাজিমাতএক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সফটওয়্যারের যদি সমস্যা হয়, তাহলে সারাদেশের একই অবস্থা। কেন্দ্রীয়ভাবে সমস্যা হচ্ছে। গাইবান্ধার জন্য আলাদা সফটওয়্যার নয়। যারা আবেদন করতে পারছে না, তাদের চেষ্টা করতে হবে। এটা আমার হাতের কাজ নয়।’
গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি বোরো মৌসুমে ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল ও দেশীয় জাতের ধান আবাদ করা হয়েছে। কয়েকদিনের ঝড়-বৃষ্টিতে কিছু ধান নষ্ট হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই কৃষকেরা তাদের কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাক। এবার ফলন ভালো হওয়ায় শুরুতে কৃষকদের মুখে হাসি থাকলেও বর্তমান বাজারদর নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন। তাপমাত্রা ভালো থাকলে কৃষকেরা ধানের ন্যায্য মূল্য পাবেন। মাঠে সোনা ফলিয়েও যদি ন্যায্য দাম না মেলে, তাহলে আগামী দিনে কৃষিকাজে মানুষ আগ্রহ হারাবে।’
এএনএইচএস/এসইউ