আমাদের দেশের রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, পার্কসহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশুকে খাবার, ফুল, খেলনা কিংবা নানা ধরনের পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায়। হালকা কাজের পাশাপাশি অনেক শিশু ভারী কাজের সঙ্গেও যুক্ত আছেন। তাদের অধিকাংশের বয়স মাত্র ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। যে বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন বুনার কথা, সেই বয়সেই বাধ্য হয়ে জীবিকার সংগ্রামে ছুটে চলছেন এসব শিশুরা।
Advertisement
শিশুরা দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাদের হাত ধরেই ভবিষ্যতে দেশ এগিয়ে যায়, গড়ে ওঠে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত সমাজ। আর প্রতিটি শিশুর জন্য শৈশব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়েই তাদের জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ জীবনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। শৈশব থেকেই শিশুরা শিক্ষা জীবন শুরু করে। এ বয়সে তারা নতুন নতুন জিনিস শিখতে শুরু করে, চারপাশের পৃথিবীকে চিনতে থাকে এবং ধীরে ধীরে নিজেদের সম্পর্কে ধারণা গড়ে তোলে। বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলা এবং সামাজিক আচরণ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে, যা তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ সময়ে শিশুরা ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। বড় হয়ে কী হবে ডাক্তার, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট কিংবা অন্য কোনো পেশাজীবী তা নিয়ে কল্পনা করতে থাকে। চারপাশের বড়দের দেখে তারা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে পরিচিত হয় এবং সেখান থেকেই নিজেদের পছন্দ ও আগ্রহ তৈরি করে।
শিশুরা সহজেই শেখে এবং তাদের কল্পনাশক্তিও অত্যন্ত প্রখর। তাই শৈশবে তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, ভালো শিক্ষা এবং সুন্দর পরিবেশ পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। একটি শিশুর স্বপ্ন যত বড় হয়, তার ভবিষ্যৎও তত বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠে। তবে যখন একটি শিশু স্কুলের বই ও খাতা হাতে নেওয়ার পরিবর্তে জীবিকার জন্য কাজ করতে বাধ্য হয়, তখন তার ব্যক্তিগত বিকাশ যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি সমাজও একটি দক্ষ ও শিক্ষিত নাগরিক হারায়।
Advertisement
বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে অসংখ্য শিশু নানা ধরনের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। কেউ চায়ের দোকানে কাজ করছে, কেউ হোটেল-রেস্তোরাঁয়, কেউ কারখানায়, আবার কেউ রাস্তায় বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছে। তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান।
শিশুশ্রমের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ দারিদ্র্য। অনেক পরিবারে দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পরিবারের আয়ের জন্য বাধ্য হয়ে শিশুদেরও কাজে নামতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা মনে করেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর চেয়ে কাজে পাঠানো বেশি লাভজনক। কারণ এতে পরিবার কিছু বাড়তি আয় পায়। আবার অনেক শিশুর বাবা-মা অসুস্থ, কর্মহীন বা পরিবার ছেড়ে চলে গেছেন। আবার কারো কারো বাবাও নেই। এসব কারণে শিশুদের বাধ্য হয়ে কম বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে হয়।
এছাড়া শিক্ষার সুযোগের অভাবও শিশুশ্রম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। দেশের অনেক এলাকায় এখনো মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সীমিত। অনেক পরিবার শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। ফলে শিশুরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও অল্প সময়ের মধ্যে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যোগ দেয়।
শিশুশ্রমের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো শিশুর স্বাভাবিক শৈশব কেড়ে নেয়। একটি শিশু যখন সারাদিন কাজ করে, তখন তার খেলাধুলা, শিক্ষা, মানসিক এবং সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। কঠোর পরিশ্রমের কারণে অনেক শিশু শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সময় তারা দুর্ঘটনার শিকার হয় কিংবা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত শিশুরা আরও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এমনকি কাজ করার সময় তাদের জীবনের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে।
Advertisement
শিশুশ্রমের কারণে শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যায়। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে তারা দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ফলে বড় হয়ে সাধারণত কম আয়ের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে দারিদ্র্যের একটি চক্র তৈরি হয়, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে। একজন অশিক্ষিত শিশুর পরবর্তীতে শিক্ষিত পরিবার গড়ে তুলতে কঠিন বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
বাংলাদেশ সরকার শিশুশ্রম প্রতিরোধে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো, আইন থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে তার সঠিক বাস্তবায়ন হয় না। ফলে শিশুরা এখনো বিভিন্ন খাতে শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
শিশুশ্রম প্রতিরোধে প্রথমেই দরিদ্র পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন জরুরি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে শিশুদের কাজে পাঠানোর প্রবণতা কমবে। পাশাপাশি দরিদ্র অঞ্চলে শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে মানসম্মত পড়াশোর পাশাপাশি বিদ্যালমুখী করতে নানা ধরণের অভিনব উদ্যোগও গ্রহণ করতে হবে।
আরও পড়ুন আর কত ইরা, আছিয়া, রামিসা গেলে বিচার পাবো?একটি শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন সে শুধু পড়াশোনাই শেখে না; সে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পায়। অন্যদিকে একটি শিশু যখন শ্রমে নিয়োজিত হয়, তখন তার সম্ভাবনার অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়।
উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে শিশুশ্রমমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের প্রতিটি শিশু যেন নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে, শিক্ষা লাভ করতে পারে এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায়- সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের। আজকের শিশুই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা আলোকিত, মানবিক ও উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।
কেএসকে