মির্জা ফারিহা ইয়াসমিন স্নেহাঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আরবি ভাষায় একে ‘ঈদুল আজহা’ বা ‘ইয়াওমুন নাহর’ বলা হয়। সাধারণভাবে এটি ‘কোরবানির ঈদ’ নামে পরিচিত। ‘ঈদ’ অর্থ আনন্দ বা উৎসব এবং ‘আজহা’ অর্থ ত্যাগ। তাই ঈদুল আজহা মূলত ত্যাগের উৎসব। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহর আদেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। আল্লাহর প্রতি তাঁর গভীর আনুগত্য ও আত্মত্যাগের স্মরণে মুসলমানরা প্রতি বছর জিলহজ মাসে পশু কোরবানি করেন।
Advertisement
ঈদুল আজহার অন্যতম শিক্ষা হলো ত্যাগ, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। ইসলাম ধর্মে পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। তাই কোরবানির সময় শুধু ধর্মীয় নিয়ম পালন করলেই হবে না, পাশাপাশি পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে। আনন্দ উদযাপনের নামে যেন কোনো অনিয়ম, অপচয় বা অন্যের কষ্টের কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
কোরবানির প্রস্তুতি ঈদের আগেই সম্পন্ন করা ভালো। পশু জবাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ছুরি, বটি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আগে থেকেই পরিষ্কার ও ধারালো করে রাখতে হবে। পাশাপাশি পলিথিন, দড়ি, পানি, জীবাণুনাশক এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখা উচিত। এতে কোরবানির কাজ সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সম্পন্ন করা যায়।
কোরবানির পশুর প্রতিও যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। ঈদের আগের রাত থেকে পশুকে অতিরিক্ত খাবার না দিয়ে পর্যাপ্ত পানি পান করানো ভালো। ঈদের দিন সকালে পশুকে গোসল করালে পশু সুস্থ থাকে এবং কোরবানির কাজও পরিচ্ছন্নভাবে সম্পন্ন করা সহজ হয়।
Advertisement
কোরবানির জন্য এমন স্থান নির্বাচন করতে হবে, যেখানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে এবং যা বসতবাড়ি বা চলাচলের রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে। এতে পরিবেশ দূষণ কম হয় এবং মানুষের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হয় না। পশু জবাইয়ের সময় শরিয়তের নিয়ম মেনে খাদ্যনালী, শ্বাসনালী ও প্রয়োজনীয় রগ কাটা নিশ্চিত করতে হবে। জবাইয়ের পর পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলাদা করা উচিত নয়।
পশুর রক্ত, মলমূত্র ও নাড়িভুঁড়ি খোলা স্থানে ফেলে রাখলে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ঘটে। তাই কোরবানির পরপরই স্থানটি প্রচুর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। বর্জ্যগুলো পলিথিন বা বস্তায় ভরে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে অথবা সম্ভব হলে মাটির নিচে চাপা দিতে হবে। পরে ব্লিচিং পাউডার, স্যাভলন বা ডেটল মিশ্রিত পানি ছিটিয়ে দিলে দুর্গন্ধ ও মাছি-মশার উপদ্রব কমে যায়।
মাংস কাটার সময় পরিষ্কার চট বা মোটা পলিথিন ব্যবহার করা উচিত। কাজ শেষে স্থানটি সাবান ও পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। যারা মাংস কাটার কাজে যুক্ত থাকবেন, তাদের পরিষ্কার পোশাক, হাতে গ্লাভস এবং পায়ে গামবুট ব্যবহার করা উচিত। কাজ শেষে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।
মাংস বিতরণের আগে পরিষ্কার পাত্রে রাখতে হবে এবং সংরক্ষণের জন্য ছোট ছোট টুকরো করে এয়ারটাইট বক্স বা প্যাকেটে ভরে ফ্রিজে রাখা ভালো। এতে মাংস দীর্ঘ সময় ভালো থাকে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে।
Advertisement
পরিশেষে বলা যায়, পবিত্র ঈদুল আযহা শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি ত্যাগ, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষাও দেয়। তাই কোরবানির সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। সচেতনতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা সুন্দর, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধবভাবে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপন করতে পারি।
লেখক: শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী।
আরও পড়ুনওয়ান হেলথ: মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য সংহতিসেতু থাকতেও নৌকায় নদী পাড় হয় এখানকার মানুষকেএসকে