ধর্ম

নবীজির (সা.) শেষ জান্নাতুল বাকি জিয়ারত, কী ঘটেছিল সেই রাতে?

নবীজির সাহাবি আবু মুওয়াইহিবা (রা.)

সাহাবি আবু মুওয়াইহিবা (রা.) তিনি ছিলেন নবীজির (সা.) মুক্তদাস। ধারণা করা হয় তিনি যুদ্ধবন্দী হিসেবে মদিনায় এসেছিলেন। পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে মুক্ত করে দেন এবং তিনি 'আহলুস সুফফা'র অন্তর্ভুক্ত হন। আহলুস সুফফার অন্যান্যদের মতোই তিনি মসজিদে নববিতে থাকতেন এবং কোরআন, হাদিস ও দ্বীনের বিধি-বিধান শিখতেন।

Advertisement

পঞ্চম হিজরিতে সংঘটিত বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। এটি সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধ, যে যুদ্ধের পর উম্মুল মুমিনীন আয়েশার (রা.) বিরুদ্ধে মুনাফিকরা অপবাদ রটিয়েছিল। আয়েশার (রা.) বর্ণনা অনুযায়ী আবু মুওয়াইহিবা (রা.) সে সময় তার উটের চালক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। অর্থাৎ, আয়েশার (রা.) উটের দেখাশোনা ও তা চালিয়ে নেওয়ার মূল দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

নবীজি (সা.) অন্তিম অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ার আগের রাতে নবীজি (সা.) জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন আবু মুওয়াহিবাকে (রা.) সঙ্গে নিয়ে। জান্নতুল বাকির কবর জিয়ারতের সময় নবীজি (সা.) কবরবাসীকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেন, আবু মুওয়াহিবাকেও তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কথা বলেন যা পরবর্তীতে বর্ণনা করেছেন আবু মুওয়াইহিবা (রা.)।

আবু মুওয়াইহিবা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস

আবু মুওয়াইহিবা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন, আমাকে বাকী কবরস্থানের অধিবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তুমি আমার সঙ্গে চল। 

Advertisement

মধ্যরাতে আমি নবীজির (সা.) সঙ্গে জান্নাতুল বাকির দিকে চললাম।

হাঁটতে হাঁটতে নবীজি (সা.) কবরবাসীদের কাছে পৌঁছলেন। কবরবাসীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন:

“কবরবাসীগণ! আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। মানুষ যে ফেতনায় পড়তে যাচ্ছে তার তুলনায় আপনারা যে অবস্থায় আছেন তা আপনাদের জন্য কতই না সৌভাগ্যের! যদি আপনারা জানতেন আল্লাহ আপনাদের কী ভয়ানক পরিস্থিতি থেকে বাঁচিয়েছেন!

অন্ধকার রাতের মতো ফেতনা ধেয়ে আসছে। একটির পেছনেই আরেকটি আসছে। পরবর্তী প্রতিটি ফেতনা আগেরটির চেয়ে আরও বেশি অন্ধকার ও ভয়াবহ হবে!”

Advertisement

তারপর নবীজি (সা.) আমার দিকে ফিরে বললেন:

“আবু মুওয়াইহিবা! আমাকে দুনিয়ার ধনভাণ্ডারের চাবিগুচ্ছ এবং দুনিয়াতে চিরস্থায়িত্ব, অতঃপর জান্নাত দেওয়া হয়েছিল। এরপর আমাকে এগুলো ও আমার রবের সাক্ষাৎ- এ দুটির মাঝে একটিকে বেছে নিতে বলা হয়েছে।”

(আবু মুওয়াহিবা বলেন,) আমি বললাম, আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোন। হে আল্লাহর রাসুল! আপনি দুনিয়ার ধনভাণ্ডারের চাবিগুচ্ছ, দুনিয়াতে চিরকাল থাকার সুযোগ, অতঃপর জান্নাত গ্রহণ করুন।

নবীজি (সা.) বললেন:

“আল্লাহর কসম, না, হে আবু মুওয়াইহিবা! বরং আমি আমার রবের সাক্ষাতই বেছে নিয়েছি।”

(আবু মুওয়াহিবা বলেন,) এরপর তিনি জান্নাতুল বাকি’র কবরবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং ঘরে ফিরে এলেন। এরপরই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই অসুস্থতায় আক্রান্ত হন, যে অসুস্থতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

(মুসনাদে আহমদ)

এই ঘটনাটি থেকে যে শিক্ষাগুলো আমরা পাই

আবু মুওয়াইহিবার (রা.) বর্ণিত এই ঘটনা থেকে যে দুটি শিক্ষা আমরা পাই:

১. সর্বাবস্থতায় ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ওপর আখেরাত ও আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একদিকে দীর্ঘ জীবন, পৃথিবীর রাজত্ব ও ধন-ভাণ্ডার ও আখেরাতে জান্নাত আর অন্যদিকে আল্লাহর সঙ্গে এখনই সাক্ষাৎ এই দুটির মধ্যে যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি সমস্ত পার্থিব সম্মান ও ধনভাণ্ডার উপেক্ষা করে আল্লাহর সাক্ষাৎকেই বেছে নেন। এ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, একজন মুমিনের কাছে দুনিয়ার সুখ-সমৃদ্ধির চেয়ে আখেরাত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

২. সব মানুষকে মর্যাদা দিতে হবে, কাউকে অবজ্ঞা করা যাবে না

নবীজি (সা.) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, তৎকালীন পুরো আরবের বাদশাহ আর আবু মুওয়াইহিবা (রা.) ছিলেন একজন সাধারণ মুক্তদাস যাদেরকে সামাজিকভাবে নিচু শ্রেণীর মনে করা হতো। কিন্তু গভীর রাতে নবীজি (সা.) তাকে সঙ্গে নিয়ে জান্নতুল বাকিতে যান। তার সঙ্গে অত্যন্ত সম্মানজনক আচরণ করেন। আল্লাহর তাআলার পক্ষ থেকে তাকে কী বলা হয়েছে এবং তিনি কী উত্তর দিয়েছেন তাও তাকে জানান। সুতরাং আমরাও যেন নবীজির (সা.) মত সব মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেই, কাউকে অবজ্ঞা না করি, ছোট মনে না করি।

ওএফএফ