মেয়ে পদ্য পারমিতার প্রথম ইংরেজি বই বেরোচ্ছে পৃথিবীর বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র্যানডম হাউস থেকে। এ নিয়ে আবেগঘন একটি পোস্ট দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। সেই সূত্র ধরে আমরা তাকে আড্ডার আহ্বান করেছিলাম। ভারতে তখন চলছে ছাত্রদের আন্দোলন, বাংলাদেশে চলছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান উদ্যাপন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, সাহিত্য, জুলাই নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বললেন খ্যাতিমান এই লেখক। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের উপ-বার্তা সম্পাদক রাসেল মাহমুদ।
Advertisement
জাগো নিউজ: আপনার স্কুলের স্মৃতি থেকে শুরু করি। আপনি তো রংপুর জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন?
আনিসুল হক: ক্লাস সিক্স থেকে টেন আমি রংপুর জিলা স্কুলে পড়েছি। আমার শিক্ষাজীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে এই স্কুলে।
জাগো নিউজ: এই স্কুলটা আপনার ওপর কী প্রভাব ফেলেছে? সবাই বলে স্কুলজীবনটাই সেরা?
Advertisement
আনিসুল হক: এই স্কুলটি আমাকে তৈরি করেছে। আমার ভাইবোনেরা সব সময় ফার্স্ট হতো। আমি ফাস্ট হতে পারতাম না। আমি হয়তো থার্ড হতাম। আমার ভেতরে ফার্স্ট হতে না পারার একটা চাপ ছিল। এটা আমি মোকাবিলা করলাম শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা দিয়ে। ক্লাস সিক্সেই আমি একটা হাতে লেখা পত্রিকা বানিয়ে ফেললাম। দেয়াল পত্রিকাও করলাম একটা। সেটা স্যাররা হেডস্যারের রুমে রেখে দিলো। হাতে লেখা পত্রিকাটা হইচই ফেলে দিলো। আমাদের যিনি ক্লাস টিচার ছিলেন, তিনি হেডস্যারকে দেখালেন, এটা আনিসুল করেছে। স্কুলে আমি বিতর্ক করতাম, বক্তৃতা করতাম, আবৃত্তি করতাম। এসব করে আমি ফার্স্ট হতে না পারার ঘাটতি পূরণ করতাম। ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষায় আমি ফার্স্ট হয়ে গেলাম। প্রেসিডেন্ট আমাকে ডেকে পাঠালেন। ঢাকায় গেলাম, পড়ি ক্লাস নাইনে। ৭৯ সাল, প্রেসিডেন্ট তখন জিয়াউর রহমান। ক্লাস নাইন থেকে টেনে ওঠার সময় আমি ফার্স্ট হলাম।
জাগো নিউজ: সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয়গুলো কী, কোনগুলো খুব করে মনে পড়ে?
আনিসুল হক: ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে, কালচারাল অ্যাক্টিভিটি। সেসবই আমার মনে পড়ে। আমাদের স্কুলে দুটো বিশাল বটগাছ ছিল। ওই গাছ দুটোর নিচে আমাদের সব অনুষ্ঠান হতো। সিরাজুল ইসলাম নামে আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি সিক্স-সেভেন-এইটের বাচ্চাদের নিয়ে বাংলার ওপর একটা অনুষ্ঠান করেছিলেন। আমি এখনও স্বপ্ন দেখি, আমি যদি এ রকম একটা অনুষ্ঠান করতে পারতাম! ধরাযাক, তিনি একজনের বুকে লিখলেন উপসর্গ ‘প্রো’, আরেকজনের বুকে লিখলেন ‘কার’। প্রো যদি কারের পাশে বসে হয়ে যাবে ‘প্রকার’। আরেকজনের বুকের ওপর লিখলেন ‘আ’, আ যদি ‘কার’-এর পাশে বসে হয়ে যাবে আকার। বুকের ওপর ‘বি’ লেখা আরেকজন এসে বলবে, আমি যদি কারের পাশে বসি হয়ে যাবে ‘বিকার’। পনেরো-বিশ মিনিটের কি যে একটা অনুষ্ঠান করলেন! আমার ষাট-একষট্টি বছর বয়স হয়ে গেছে, আমি মেরিল-প্রথম আলো করি, টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখি আমি নানান অনুষ্ঠান করি। কিন্তু সিরাজ স্যারের ওই অনুষ্ঠানের মতো কল্পনা ও প্রেজেন্টেশন আজও কোথাও পাইনি।
জাগো নিউজ: সন্তানকে স্কুলে দেওয়ার সময় কী কী বিষয় মাথায় রেখেছিলেন?
Advertisement
আনিসুল হক: লোকে বলে যে, সন্তানকে লেখাপড়া করানোর জন্য ঢাকায় এসেছি। জেলা শহরগুলিতে খুব ভালো পড়ানো হয়। কিন্তু উল্টো যেটা হয়, আমাদের সন্তানকে তো আমরা ইংরেজি মাধ্যমে দেবো। এর কারণ আমি নিজে ইংরেজিতে ভালো বলতে পারি না। কোথাও গিয়ে যখন দেখি সবাই খুব ভালো ইংরেজিতে কথা বলছে, তখন নার্ভাস ফিল করি। সে জন্য আমি যেটা পারি না, সেটা যাতে আমার সন্তান পারে, সেজন্য তাকে ইংলিশ মিডিয়ামে দিলাম। ১৯৯৮ সালে আমার সন্তানকে স্কুলে দিতে হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, দশ বছর পর ইংরেজি যে ভালো পারবে না জানবে না তার হয়তো করার কিছু থাকবে না। তাই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমার সন্তানকে আমরা ইংরেজি মাধ্যমে দিলাম। সবাই তখন বলতো ‘সানবিম-সানবিম’, আমরাও দিলাম।
লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা এক ছাত্রকে বলেছিলাম নিউটনের তিনটা সূত্র বলো তো। সে বলতে পারলো না। হয়তো হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করায় বোকা হয়ে গেছে
জাগো নিউজ: ইংরেজি ওই স্কুলটা কেমন?
আনিসুল হক: সানবিম স্কুলে অনেক কিছু ভালো। তবে আমি একটা দুইটা সমালোচনা করবো। আমার মেয়ে বাস্কেটবল খেলতো। আমার মেয়ে গান গেয়ে ইন্ডিয়ার লক্ষ্মৌ থেকে গোল্ড মেডেল নিয়ে এসেছিল। সেদিক থেকে কতগুলো জিনিস ভালো আছে। আমি সব সময় বলেছি, তোমরা বিতর্ক করো না কেন? মঞ্চে ওঠা, উপস্থাপনা করা, এগুলো তো পারতে হবে। সেটা আমার মেয়ে করেনি নাকি সানবিম করায়নি আমার ঠিক জানা নেই। এটা নিয়ে আমি একটু সমালোচনা করবোই করবো, এসব করানো দরকার ছিল।
আনিসুল হক। ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলনে একটা প্ল্যাকার্ড দেখা গেল। সেখানে লেখা ছিল ভারতের এডুকেশন সিস্টেমে দুটো জিনিস নেই, ‘এডুকেশন’ আর ‘সিস্টেম’। আমাদের এখানে এগুলো আছে বলে মনে করেন?
আনিসুল হক: এটা সম্ভবত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও বেশি সত্য। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমি যে একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক তা নয়, দূরবর্তী পর্যবেক্ষক। একবার টেক্সটাইল বা লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা এক ছাত্রকে বলেছিলাম নিউটনের তিনটা সূত্র বলো তো। সে বলতে পারলো না। হয়তো হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করায় বোকা হয়ে গেছে। কিন্তু যদি এমন হয় যে একজন যুবক বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করলো কিন্তু নিউটনের তিনটা সূত্র মুখে মুখে বলতে পারবে না, তাহলে সেই শিক্ষা ভয়াবহ।
যারা মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে আসছে দেখছি তারাও যথেষ্ট স্মার্ট, ইংরেজিতে ভালো। কিন্তু সবাই কি ভালো, নাকি কেউ কেউ ভালো?
জাগো নিউজ: কী কী পরিবর্তন দরকার আর কার কানের ভেতর গিয়ে সেই কথাটা বলে আসা বা কার চোখে আঙুল দিয়ে সেসব দেখানো উচিত?
আনিসুল হক: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আমরা যেমনটা ভাবি তার চেয়ে অনেক জটিল। যদি মাদ্রাসার কথা বলি, মাদ্রাসাই কত প্রকার আছে। আবার খ্রিস্টানদের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কত ভাগ আছে আমরা সঠিকভাবে বলতেও পারবো না। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কত বিচিত্র। শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না, আরও অনেক ... একটা ছেলে ক্লাস ফাইভ পাশ করলো, সে বাংলাটা ঠিকমতো লিখতে-পড়তে পারবে, ইংরেজিটা ঠিকমতো পড়তে একটু একটু লিখতে পারবে, অঙ্কটা ঠিকমতো হিসাবটা করতে পারবে। সেটা যখন হয় না, তখন ভয় লাগে। এত বৈষম্য ... মাদরাসা শিক্ষা ক্রমপ্রসার হলো।
আনিসুল হক, মেয়ে পদ্য পারমিতার সঙ্গে
মানুষের মধ্যে অনন্ত সৃজনশীলতা আছে। সেটা কওমি হোক, আলিয়া হোক বা অন্য পদ্ধতি হোক, যারা সেসব থেকে বেরিয়ে আসছে দেখছি তারাও যথেষ্ট স্মার্ট, ইংরেজিতে ভালো। কিন্তু সবাই কি ভালো, নাকি কেউ কেউ ভালো? ওই কারিকুলামের মধ্যে সাধারণ বিজ্ঞান, সাধারণ অঙ্ক এগুলো থাকতে হবে, দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র-ভাষা এগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। এটা নিয়ে আমি বলার যোগ্যতা রাখি না, তবে দুর্ভাবনা আছে।
জাগো নিউজ: মেয়ের বই বেরোচ্ছে। কেমন লাগছে? ফেসবুকে একটা উচ্ছ্বসিত লেখা পড়লাম।
আনিসুল হক: বই বের হবে ৪ আগস্ট। নাম ‘অ্যাপিটাইট’। পেঙ্গুইন র্যানডম হাউস, আগে রিভিউ করে, তারপর কমার্শিয়াল। ৪ আগস্ট সারা নর্থ আমেরিকা, ৬ আগস্ট প্রথম অনুষ্ঠান হবে, ৮ আগস্ট হবে, আমি থাকবো। ও আমার সাথে সাহিত্য বা বই নিয়ে কথা বলে না। ও কী লিখেছে আমি জানি না, আমি কী লিখি ওর সঙ্গে শেয়ার করি না। তবে নিজের মেয়ে তো, ওর বই বের হওয়ায় আমি একটু উত্তেজিত...
রিলস্, একবার দেখতে শুরু করলে একঘণ্টা-দুঘণ্টা কখন চলে যাবে টের পাওয়া যায় না। যদি কেউ পড়তে চান, লিখতে চান ...
জাগো নিউজ: আপনার প্রথম বইটা, ‘খোলা চিঠি, সুন্দরের কাছে’ যখন বেরুলো ...
আনিসুল হক: আমার বই বের হয় ১৯৮৯ সালে, আব্বা মারা যান ১৯৮৫ সালে। আমি কবিতা লিখি, বিতর্ক-বক্তৃতা করি, এগুলোতে আব্বার উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে আব্বাকে আমি খুব মিস করি। আমার আম্মা আমার শিল্প-সাহিত্যকে উৎসাহিত করতেন না। আম্মা খুবই প্রাকটিক্যাল মানুষ ছিলেন। তিনি জানতেন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার, লেখাপড়া করে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে হবে। ফলে ফার্স্ট হও, বৃত্তি পাও, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ো এসব তার চাওয়া ছিল। বই বেরিয়েছে, সেটা নিয়ে আমার আম্মা খুশি হয়েছেন সেই খবর আমি কখনও পাইনি।
জাগো নিউজ: আপনার সঙ্গে মেলায় ঘুরতে গিয়ে দেখেছি আপনি আক্ষেপ করেছেন যে বই বিক্রি কম হচ্ছে। আবার মেলা শেষে আমরা শুনতে পাই কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে? ফেসবুকে লাখ লাখ মানুষ আপনার লেখা পড়ছে। মানুষ কি জায়গা সংকটের কারণে হার্ড কপি ছাড়ছে? আমাদের কি সিরিয়াসলি সফট বইয়ের দিতে যাওয়া উচিত?
আনিসুল হক: যখন টেকনোলজি বদলে যায়, তখন প্রকাশনাও বদলে যাবে। আমরা ঠেকাতে পারবো না। তবে এখনও আমরা আশা করি মানুষ হাতে নিয়ে বই পড়ুক। আবার বই বিক্রি হয় না এমনও না। ২০২৪ সালে ‘কখনও আমার মাকে’ ১২তম মুদ্রণ বেরিয়েছে। মেলার মধ্যেই আমরা ১০ হাজার কপি বিক্রি করেছিলাম। ‘যারা ভোর এনেছিল’ ২৫তম মুদ্রণ বেরিয়েছে, মানে ২৫ হাজার কপি, ‘মা’ ২ লাখ কপি!
জাগো নিউজ: তাহলে আমরা আরও অন্তত দশ বছর হার্ডকপি পড়তে পারবো?
আনিসুল হক: চার কোটি ছেলে-মেয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। এদের দশ শতাংশকে যদি পড়াতে পারি, তাহলেও আমরা চল্লিশ লাখ পাঠক নিয়মিত পাবো। এই চল্লিশের মধ্যে ২ লাখ যদি আমার বই কিনে পড়ে, আমি তো বড়লোক হয়ে যাবো।
জাগো নিউজ: সম্প্রতি কিছুদিন আপনি ফেসবুকের বাইরে ছিলেন, কেমন ছিলেন?
আনিসুল হক: অনেক বই পড়েছি, অনেক লিখেছি এমন নয়। তার আগে যখন আমি সচেতনভাবে ফেসবুক বন্ধ করে দিয়ে উপন্যাস লিখতাম, তখন আমি বুঝেছি যে, ফেসবুক অনেক সময় নষ্ট করে। এখন এসেছে রিলস্, একবার দেখতে শুরু করলে একঘণ্টা-দুঘণ্টা কখন চলে যাবে টের পাওয়া যায় না। যদি কেউ পড়তে চান, লিখতে চান, তার কর্তব্য হবে ১২ ঘণ্টা যন্ত্রের কাছ থেকে দূরে থাকা।
সাকিব আল হাসানের মতো ক্রিকেটার বাংলাদেশ আর কবে বানাতে পারবে? তিনটি ফর্মে পৃথিবীর এক নম্বর হয়েছে সে বহুবার। তাকে যত ট্রল করেছে, আর কাকে করেছে?
জাগো নিউজ: বাংলাদেশের ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি কটাক্ষের শিকার হন আপনি। তাই না?
আনিসুল হক: আমি কোনো কমেন্টস পড়ি না। প্রথম দিকে আমার মেয়ে ও স্ত্রী খুব মন খারাপ করতো। বলতো তোমাকে নিয়ে এগুলো এগুলো লিখেছে। আমি বলেছি, তোমরা এগুলো দেখবা না। এখন ওদেরও অভ্যাস হয়ে গেছে। আর যখনই দেখি কেউ আমাকে ট্রল করছে, আমি ওকে ব্লক করে দিই। ভবিষ্যতে আরও যদি করে, সেটা আমার চোখে পড়ে না। আমি একটা বাবলের মধ্যে বাস করি, ভাবি কেউ আমার নিন্দা করছে না, ট্রল করছে না।
জাগো নিউজ: মনটাকে সামাল দেন কীভাবে?
আনিসুল হক: রবীন্দ্রনাথ তখনকার দিনে সবচেয়ে বেশি ট্রলের শিকার হয়েছেন। তার প্রকাশিত লেখা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রে তুলে দিয়ে বলা হয়েছিল ভুলগুলো শুদ্ধ করো। রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক, জগদীশ চন্দ্র বসু সবাই মিলে তাকে সংবর্ধনা দিতে গেছেন শান্তি নিকেতনে। গাছে নিচে মঞ্চ বানিয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে ... তিনি বললেন, আজ আপনারা আমাকে যে সংবর্ধনা দিচ্ছেন, এটা আমি গ্রহণ করবো না। এর আগে আপনারা কোনোদিন আমার লেখা ভালো বলেননি। আজ আমি পশ্চিম থেকে একটা স্বীকৃতি পেয়েছি বলে আমার লেখা একরাতে ভালো হয়ে গেল? রবীন্দ্রনাথকে এসব সহ্য করতে হয়েছে। পাতার পর পাতা তার বিরুদ্ধে লেখা আছে, জীবনানন্দের ওপর লেখা আছে। জীবনকে বলা হতো গণ্ডার কবি। তারা তো মহৎ, অত বড় তো আমরা নই। কাছে দেখেন, তামিম ইকবাল বিসিবির সভাপতি। তাকে নিয়ে আমরা কতগুলো মিম বের করেছিলাম? সাকিব আল হাসানের মতো ক্রিকেটার বাংলাদেশ আর কবে বানাতে পারবে? তিনটি ফর্মে পৃথিবীর এক নম্বর হয়েছে সে বহুবার। তাকে যত ট্রল করেছে, আর কাকে করেছে?
আনিসুল হক ও রাসেল মাহমুদ। ছবি: জাগো নিউজ
শচিন টেন্ডুলকার ঢাকার শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে শততম সেঞ্চুরি করলেন। ওই খেলায় ইন্ডিয়া বাংলাদেশের কাছে হেরে গেল। ওইদিন আমি টাইমস অব ইন্ডিয়ায় শচিন টেন্ডুলকারের নিউজটার নিজের কমেন্টস পড়েছি। ৯৯ পারসেন্ট গালাগাল করছে ইন্ডিয়ানরা। শচিন টেন্ডুলকারকে যদি ইন্ডিয়ানরা গালি দিতে পারে, বাঙালিরা আমাদের গালি দেবে, সেটা স্বাভাবিক। আমার তো পক্ষ-বিপক্ষ আছে। আমি তো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে। আমার বেসভূষা, চাল-চলন, কথাবার্তা তো দেশের ষাট ভাগ লোকের এমনিই অপছন্দ হবে।
শাহবাগে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হলো সঙ্গে সঙ্গে যারা লিখেছেন, তারা এখন সেটাকে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হবেন। চব্বিশের আন্দোলনটা আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করবো
জাগো নিউজ: জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে কি কখনও কিছু লিখবেন ভেবেছেন?
আনিসুল হক: এখনও ভাবিনি। এই জাতীয় উত্তেজনা থিতু হতে দিতে হয়। ১০-২০-১০০ বছর পর লেখা উচিত। তাড়াহুড়া করা উচিত না। যেমন এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভালো কাজ হওয়া উচিত। কারণ অনেক দিন হয়ে গেছে। এখন আমরা একটা নিরাপদ দূরত্বে আছি। শাহবাগে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হলো সঙ্গে সঙ্গে যারা লিখেছেন, তারা এখন সেটাকে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হবেন। চব্বিশের আন্দোলনটা আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করবো আমরা এখনো জানি না। ফলে আমি একটু অপেক্ষা করার পক্ষে।
জাগো নিউজ: বাংলা কবিতা নিয়ে অনেক দিন ধরে কোনো হইচই হয় না।
আনিসুল হক: বাংলাদেশের কবিতা ও বাংলা ভাষার কবিতা উভয়ই, কবিতার ভাটা যাচ্ছে, দুর্দিন যাচ্ছে। বড় কবি আমরা পাচ্ছি না। কলকাতায় যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুর পর একটা ফাঁকা হলো। জয় গোস্বামী বড় কবি, আমার প্রিয় কবি। তারপর আর কবি কই? শ্রীজাত ভালো লেখে, জয় গোস্বামী তো আর লেখে না। তারপরে আর কবি কই। বাংলাদেশে নির্মলেন্দু গুণদের পর আর কবি কই? ওই যা লিখেছেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহিদ কাদরি পড়ে পড়ে ষাটের দশকে আমরা নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান পর্যন্ত আসতে পেরেছি। অনেকে পছন্দ করে রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা, হেলাল হাফিজ একটা বিচ্ছিন্ন নাম। ইমতিয়াজ মাহমুদ ভাই কিছুটা জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন। কিন্তু ছোট ছোট কিছু কাপলেট লেখেন হুমায়ুন আজাদের প্রবচন গুচ্ছের মতো, যা হোক মানুষ বিভিন্ন রকম লেখে। বাংলাদেশে মনে হয় শিল্প-সাহিত্যে একটা গ্রহণের কাল চলছে। এটা চিরস্থায়ী হবে এটা মনে করার কোনো কারণ নাই। আশা করি নতুন প্রজন্মের কবিরা এসে বাংলাদেশের মরা গাঙে জোয়ার সৃষ্টি করবে।
আরএমডি