একটি ভোরের দৃশ্য দিয়ে শুরু করা যাক। রাজধানীর এক ব্যস্ত সিগন্যালের পাশে ছোট্ট একটি ছেলে—হাতে প্লাস্টিকের বোতল, কাঁধে ভারী বস্তা। বয়স বড়জোর ১০ বা ১১ বছর। ট্রাফিক সিগন্যাল লাল হতেই সে দ্রুত গাড়ির জানালার পাশে ছুটে যায়। কেউ দেয় পানি খাওয়ার বোতল, কেউ দেয় না। কেউ বিরক্ত হয়, কেউ করুণা করে। কিন্তু সিগন্যাল সবুজ হলে আবার গাড়ির চাকা গড়িয়ে যায়, আর শিশুটির শৈশব থেমে থাকে একই জায়গায়। এই দৃশ্য কেবল একটি শহরের নয়; এটি বাংলাদেশের বহু শহর, বন্দর, কারখানা ও গ্রামাঞ্চলের বাস্তব চিত্র। বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আমাদের সেই বাস্তবতার দিকে আবারও ফিরে তাকাতে বাধ্য করে—যেখানে শিশুর হাতে থাকার কথা বই, অথচ সেখানে আছে শ্রমের বোঝা।
Advertisement
বাংলাদেশে শিশুশ্রম নতুন কোনো সমস্যা নয়। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং শিক্ষা বিস্তারের পরও এটি যে এত গভীরভাবে টিকে আছে, তা উন্নয়ন-পরিকল্পনার এক বড় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১৬ কোটি শিশু কোনো না কোনোভাবে শিশুশ্রমে জড়িত। দক্ষিণ এশিয়া এই সমস্যার অন্যতম কেন্দ্রস্থল, আর এর মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন, যার একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বলতে বোঝায় এমন কাজ, যা শিশুর শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি বিস্তৃত—ইটভাটা, নির্মাণকাজ, কারখানা, পরিবহন খাত, হোটেল-রেস্তোরাঁ, এমনকি গৃহকর্মেও শিশুরা নিয়োজিত। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে শিশুশ্রম দৃশ্যমান ও সংগঠিত। গ্রামের দিকে কৃষি, মৎস্য ও অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম বেশি।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, শিশুশ্রমের সঙ্গে দারিদ্র্যের সম্পর্ক যতটা সরল বলে মনে হয়, বাস্তবে তা আরও জটিল। দরিদ্র পরিবার শিশুকে কাজে পাঠায় আয় বৃদ্ধির জন্য, কিন্তু সেই শিশুই আবার শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে ভবিষ্যতে দরিদ্রতার চক্রে আটকে যায়। এভাবেই শিশুশ্রম কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং একটি প্রজন্মগত দারিদ্র্যের পুনরুৎপাদন ব্যবস্থা।
Advertisement
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিমুখী চিত্র দেখায়। উন্নত দেশগুলোতে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা জার্মানিতে শিশুশ্রম কার্যত নিষিদ্ধ এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত; সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বাধ্যতামূলক শিক্ষা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ শিশুশ্রমকে প্রায় নির্মূল করেছে। আবার লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ যেমন ব্রাজিল বা পেরুতে শিশুশ্রম এখনো আছে, তবে রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং শর্তযুক্ত নগদ সহায়তা (conditional cash transfer) ব্যবস্থা শিশুশ্রম কমাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও নেপালে শিশুশ্রম কমলেও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। ভারতের ‘Right to Education Act’ এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শিশুশ্রম হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশও প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে উপবৃত্তি চালু করেছে এবং শ্রম আইন সংশোধন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা শিশুশ্রম টিকিয়ে রাখছে।
শিশুশ্রমের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ইটভাটা শিল্প একটি বড় অংশ দখল করে আছে। হাজার হাজার শিশু সেখানে ইট বহন, পানি দেওয়া বা মাটি প্রস্তুতের মতো কাজ করে। এই কাজগুলো তাদের শ্বাসতন্ত্র, হাড়ের গঠন এবং মানসিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করে। একইভাবে নির্মাণ খাতে শিশুরা ভারী সরঞ্জাম বহন করে, যেখানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে শিশুদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, অনেক সময় নির্যাতন ও শোষণের শিকারও হতে হয়।
একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন তার শিশুদের ঘাম নয়, হাসি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। বাংলাদেশ সেই পথেই এগোতে পারে, যদি আমরা শিশুশ্রমকে শুধু আইনগত অপরাধ নয়, বরং সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি। তখনই হয়তো সিগন্যালের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শিশুটির হাতে থাকবে বই, বোতল নয়।
Advertisement
গৃহকর্মী শিশুরা তুলনামূলকভাবে ‘অদৃশ্য শ্রমিক’। তারা অনেক সময় পর্দার আড়ালে কাজ করে, ফলে তাদের ওপর নির্যাতন শনাক্ত করা কঠিন হয়। যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন এবং মানসিক চাপ—সবই এই অদৃশ্য জগতে ঘটে, যা প্রায়ই প্রকাশ পায় না।
শিশুশ্রমের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দারিদ্র্য যেমন প্রধান কারণ, তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং শ্রমবাজারের অনানুষ্ঠানিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক পরিবার এখনো মনে করে, শিশুকে স্কুলে পাঠানোর চেয়ে কাজে পাঠানো বেশি বাস্তবসম্মত। আবার অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার মান দুর্বল হওয়ায় স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুশ্রম শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক সংকট। একটি সমাজ যখন তার শিশুদের শ্রমশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তা ভবিষ্যতের মানবসম্পদকে দুর্বল করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে কম আয়ের পেশায় সীমাবদ্ধ থাকে এবং সামাজিক গতিশীলতা হারায়।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসনে কিছু অগ্রগতি হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ‘National Child Labour Elimination Policy 2010’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তবায়ন ধীরগতির। কিছু এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থা পুনর্বাসন এবং শিক্ষা কর্মসূচি চালালেও তা জাতীয় পর্যায়ে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারেনি।
তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, শিশুশ্রম নিরসনে দারিদ্র্য হ্রাসকে কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবে নিতে হবে। দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি নগদ সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে, যাতে তারা শিশুকে কাজে পাঠাতে বাধ্য না হয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন জরুরি। স্কুলকে শুধু বাধ্যতামূলক নয়, আকর্ষণীয় ও দক্ষতামূলক করতে হবে, যাতে শিশু স্কুলে থাকতে আগ্রহী হয়।
তৃতীয়ত, শ্রমবাজারে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে ইটভাটা, নির্মাণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। চতুর্থত, স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শিশুশ্রম শনাক্ত ও প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। পঞ্চমত, গণমাধ্যম ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারকে বোঝাতে হবে, শিশুর কাজ তার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যেখানে রাষ্ট্র সামাজিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করেছে, সেখানে শিশুশ্রম দ্রুত কমেছে। উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের Bolsa Família কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য, যেখানে দরিদ্র পরিবারকে শর্তসাপেক্ষে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়—শর্ত হলো শিশু স্কুলে যাবে এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুশ্রম নির্মূল কেবল সরকারের কাজ নয়; এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। একজন নাগরিক হিসেবে আমরা যদি শিশুকে শ্রমে নিয়োজিত হতে দেখি এবং নীরব থাকি, তবে আমরা পরোক্ষভাবে সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে যাই। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র—তিন স্তরেই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আমাদের শুধু একটি দিন মনে করিয়ে দেয় না; এটি একটি নৈতিক প্রশ্ন সামনে আনে—আমরা কেমন ভবিষ্যৎ চাই? এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে শিশু শ্রমিক, নাকি এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে শিশু শিক্ষার্থী, স্বপ্নদ্রষ্টা এবং সৃষ্টিশীল মানুষ?
একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন তার শিশুদের ঘাম নয়, হাসি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। বাংলাদেশ সেই পথেই এগোতে পারে, যদি আমরা শিশুশ্রমকে শুধু আইনগত অপরাধ নয়, বরং সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি। তখনই হয়তো সিগন্যালের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শিশুটির হাতে থাকবে বই, পানির বোতল নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—আমরা কি শিশুদের শ্রমমুক্ত শৈশব দিতে পারব, নাকি আবারও তাদের ভবিষ্যৎকে বাস্তবতার ভারে চাপা পড়তে দেখব?
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com
এইচআর/এমএফএ/জেআইএম