ফিচার

শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করি

আজ ১২ জুন আর্ন্তজাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। ২০২৬ সালের বিশ্ব শিশুশ্রম বিরোধী দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য হলো ‘শিশুশ্রমকে লাল কার্ড: শিশুদের জন্য ন্যায্য সুযোগ, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শোভন কাজ’। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয়ভাবে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: ‘শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করি’। প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশেও প্রতিবছর দিবসটি পালন করে আসছে। কিন্ত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছাঁনো যাচ্ছেনা। কারণ শিশুশ্রম প্রতিরোধ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

Advertisement

বিশ্বে ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু এখনো শিশুশ্রমে যুক্ত। বাংলাদেশে কিছুটা অগ্রগতি হলেও সংকট রয়ে গেছে। আইএলও, ইউনিসেফ নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি শতকের শুরুর তুলনায় শিশুশ্রম প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে, কিন্তু বিশ্ব শিশুশ্রম নির্মুলের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। বৈশ্বিক প্রচেষ্টার ফলে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু ২০২৪-২৫ সালে শিশুশ্রমে যুক্ত ছিল, যার মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত, যা তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আরও পড়ুন শিশুশ্রমের বেড়াজালে বন্দি শৈশব, হারিয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘চাইল্ড লেবার: গ্লোবাল এস্টিমেটস ২০২৪-২৫ ট্রেন্ডস অ্যান্ড দ্য রোড ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। শিশুশ্রম নিরসনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন হলেও প্রতিবেদনে একটি কঠিন বাস্তবতা উঠে এসেছে, যে এখনো লাখ লাখ শিশু শিক্ষা, খেলা এবং শুধু শিশু হিসেবে বেড়ে ওঠার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। প্রতিবেদনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শিশুশ্রম কমার চিত্র দেখা গেলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি সে রকম নয়।

এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, গত দুই দশকে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বাড়ায় কিছু উন্নতি হয়েছে, তবে বাংলাদেশ এখনো ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সঠিক গতিতে নেই। শ্রমে যুক্ত অধিকাংশ শিশু কাজ করছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে তারা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই বাস্তবতা পরিবর্তনে বাংলাদেশে জরুরি প্রয়োজন স্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই প্রচেষ্টা। ব্যুরো অব স্ট্যাটিকস জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫-১৭ বছরের শিশুর সংখ্যা ৪ কোটি ২৩ লাখ ৮৭ হাজার। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৩৩ লাখ ৮১ হাজার। আর ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এসব শিশু শ্রমিক প্রায় ৩’শ ধরনের অর্থনৈতিক কাজে শ্রম দিচ্ছে। এর মধ্যে ৪৫ ধরনের কাজ শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

Advertisement

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠনের জরিপে দেখা যায়, শ্রমজীবী শিশুরা বাংলাদেশে ৩’শরও বেশি বিভিন্ন ধরনের কাজে ৯১ লক্ষাধিক শিশু নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ ধরনের কাজ হচ্ছে শিশুদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছরের জানুয়ারি-০৭ থেকে জুলাই-০৭ পর্যন্ত দেশে প্রায় আড়াই হাজার শিশু অধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটেছে। জরিপে সার্ক অটোনোমাস অ্যাডভোকেসি গ্রুপের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, দেশের ১৪টি পতিতালয়ে প্রায় ১৫ হাজার যৌনকর্মী রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অধিকাংশকেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়েছে। আবার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে অধিকার বঞ্চিত শিশুর সংখ্যা ৪০ শতাংশ এবং নানা ধরনের শ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ। যা মোট শিশুর সাড়ে ১৭ ভাগ। অথচ আজকের এ শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশের কর্ণধার। একটি দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার হচ্ছে সে দেশের শিশুরা। যারা দেশকে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু দেশের শিশুদের একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকায় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে।

এসব শিশু শিক্ষা ও সুন্দর শৈশব থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপনের মাধ্যমে বেড়ে ওঠছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ কি তা সহজেই অনুমান করা যায়। বাংলাদেশে বর্তমানে শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা ও কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে ‘শিশু অধিকার সনদ’ (সিআরসি) অনুসমর্থন করেছে। সিআরসি অনুসমর্থনকারি প্রথম ২২টি দেশের একটি বাংলাদেশ। এছাড়া শিশুশ্রম নির্মূলে বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৮২ অনুসমর্থন করেছে ২০০১ সালে। এই অনুসমর্থনের অর্থই হচ্ছে সরকার নিকৃষ্ট ধরনের শিশুশ্রম নিরসনের প্রতিরোধ অ্যাশক প্রোগ্রাম প্রণয়ন করা। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের শনাক্তকরণে ও পূর্ণবাসনে অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশে শিশুশ্রমের মূলকারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দারিদ্রকে চিহিৃত করেছেন। দারিদ্র বিমোচন না হওয়া পর্যন্ত শিশুশ্রম নির্মূল করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ।

শিশুশ্রম নিরসন করতে সরকারের পাশাপাশি অভিাবক, নিয়োগকর্তা, সুশীল সমাজ, এনজিওসহ সবাইকে সমম্বিত ভূমিকা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। শিশুশ্রম বিশেষজ্ঞরা শিশুশ্রম নির্মূল করতে নিম্নের পদক্ষেপগুলো কার্যকরি ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

আরও পড়ুন শিশুশ্রম: হারিয়ে যাওয়া শৈশব, আমাদের দায়িত্ব কী ১. সরকারকে শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ২. শিশুশ্রম নির্মূল করতে স্থানীয় সরকারকে সংশ্লিষ্ট করতে হবে। ৩. শিশুশ্রমের কুফল সম্পর্কে শিশুর বাবা-মাকে সচেতন করতে হবে। ৪. শিশুর পরিবারের বিকল্প আয়ের দিকনির্দেশনা ও ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুশ্রমিকদের জন্য মানসম্মত ও আনন্দমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ৬. ১৪-১৭ বছর বয়সী শিশুশ্রমিকদের কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। ৭. কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিশুদের আর্থিক সহায়তা প্রদান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। ৮. ঝুঁকিপূর্ণ ৪৫ ধনরণের কাজে পর্যায়ক্রমে একটি র্নিদিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে। ৯. ইনফরমাল সেক্টরে আইন কার্যকর করতে হবে এবং মালিকপক্ষকে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সচেতন করতে হবে। ১০. কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। ১১. শিশুশ্রমিকের বাবা-মাকে পরিবার পরিকল্পনায় উদ্বুদ্ধ করাতে হবে। ১২. ব্যাপকভাবে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণের পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিশুশ্রম একটি জাতীয় সমস্যা। তাই অবশ্যই সরকারের পাশাপাশি এক্ষেত্রে সবারই কমবেশি দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। শিশুশ্রম প্রতিরোধ করা নাগেলে দেশের উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। আমরা আশাকরি সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাসহ বিভিন্ন সংগঠন বাংলাদেশ থেকে শিশুশ্রম দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। প্রতিটি শিশু আনন্দময় শৈশবের মধ্যদিয়ে আদর্শ নাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে।

Advertisement

কেএসকে