অর্থনীতি

সঠিক দিকনির্দেশনা আছে, বাস্তবায়নের রূপরেখা আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার চেষ্টা দেখা গেলেও এই দুই লক্ষ্য কীভাবে সমন্বিতভাবে অর্জিত হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।

Advertisement

বলছিলেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের প্রতিক্রিয়া নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি এ মন্তব্য করেন। কথা বলেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ইব্রাহীম হুসাইন অভি।

জাগো নিউজ: বাজেট নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

ড. সেলিম রায়হান: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট এমন এক সময়ে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব সংগ্রহে দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের চাপ, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।

Advertisement

ইতিবাচক দিক হলো, বাজেটে ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে

বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, যখন সরকারি ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে, তখন মূল্যস্ফীতি কীভাবে দ্রুত কমানো হবে?

জাগো নিউজ: রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব?

ড. সেলিম রায়হান: একদিকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে কর ছাড় ও প্রণোদনা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

Advertisement

আরও পড়ুন বাজেট ব্যবসাবান্ধব, সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব সংস্কার। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে, যা সমমানের অনেক দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।

বাজেটে কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে মূল বিষয়।

জাগো নিউজ: বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা নিয়ে কী বলবেন?

ড. সেলিম রায়হান: বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য প্রণোদনার প্রস্তাব ভবিষ্যতমুখী। তবে শুধু কর সুবিধা দিলেই শিল্পের রূপান্তর ঘটবে না। এর জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, সহজ অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সামাজিক খাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বরাদ্দের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যয়ের গুণগত মান ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা। সেবা প্রদানের দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া বাড়তি বরাদ্দের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছাবে না।

আরও পড়ুন বড় বাজেটে কৃষির হিস্যা ছোট

জাগো নিউজ: বাজেটে ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

ড. সেলিম রায়হান: ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কারের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেলাপি ঋণ ও দুর্বল সুশাসনের সমস্যা সমাধান না করে শুধু ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ করা হলে তা শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ দিয়ে ক্ষতিপূরণের শামিল হবে। তাই আর্থিক খাতে জবাবদিহি, সুশাসন ও তদারকি শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।

একদিকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে কর ছাড় ও প্রণোদনা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে

জাগো নিউজ: বাজেট ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. সেলিম রায়হান: ইতিবাচক দিক হলো, বাজেটে ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুস্পষ্ট সময়সূচি, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং বিকল্প পরিকল্পনা।

জাগো নিউজ: প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব কি না?

ড. সেলিম রায়হান: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছে এবং সংস্কারের কিছু প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

কিন্তু ঘোষিত লক্ষ্যগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আরও সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন কৌশল, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন। অন্যথায় বাজেটের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যগুলো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থেকে যাবে।

আইএইচও/এমকেআর