মতামত

শিশুদের প্রতি মহানবির হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা

সম্প্রতি রাজধানীর বেসরকারি একটি হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। চিকিৎসা অবহেলায় নবজাতকের মৃত্যুর সংবাদ গণমাধ্যমে নিয়মিতই প্রকাশ হয়। আমরা এমন অবহেলার তীব্র নিন্দা জানাই।

Advertisement

একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রতি আমরা কীভাবে অবহেলা করতে পারি? এই শিশুরাই তো আগামী পৃথিবীর কর্ণধার। একটি শিশু যখন স্নেহ ও ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তখন সে কেবল একজন সুস্থ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয় না, বরং আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য হয়ে ওঠে এক মূল্যবান অংশীদার।

হজরত মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের অনেক ভালোবাসতেন। স্নেহ করতেন। তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। কোলে নিতেন। চুমু খেতেন। তাদের জন্য দোয়া করতেন।

ইসলাম শিশুকে স্নেহ-মমতা ও আদর-যত্ন দিয়ে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছে। শিশুদের প্রতি যেন কোনোভাবেই কঠোরতা প্রদর্শন করা না হয় এবং দারিদ্র্যের ভয়ে যেন তাদের হত্যা করা না হয়, এ বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

Advertisement

এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘আর দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তাদের এবং তোমাদেরও রিজিক দিই। তাদের হত্যা করা নিশ্চয় মহাপাপ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩১)

এ আয়াতে শিশুদের হত্যার বিষয়ে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের যদি সঠিক শিক্ষা এবং উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে পূর্ণ মানসিক ও নৈতিক বিকাশে সহায়তা করা হয়, তাহলে তারা সমাজের সত্যিকার উপযোগী ও কার্যকর সদস্যে পরিণত হবে।

অথচ আজ শিশুরা বাবার কোলে, এমনকি মাতৃগর্ভেও নিরাপদ নয়। এমন সব নজিরবিহীন ও নির্লজ্জ ঘটনা আজ ঘটে চলেছে, যা শুনলে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।

একটি অঙ্কুরকে বৃক্ষে পরিণত করার জন্য বৃষ্টি, তাপ, পানি ও আলোর প্রয়োজনীয়তা যেমন অনস্বীকার্য, ঠিক তেমনি একটি শিশুকে ভবিষ্যতের শিক্ষিত, আদর্শ ও সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা এবং সুস্থ ও সুন্দর বিকাশ অপরিহার্য। একটি শিশুও যেন কোনোভাবে অবহেলার শিকার না হয়, সে বিষয়ে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। শিশুরা ফুল হয়ে ফুটে উঠুক সৌরভে। তাদের চাঁদমুখের হাসিতে ভরে উঠুক আমাদের সুজলা-সুফলা এই সোনার দেশ।

Advertisement

অথচ শিশুদের প্রতি মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা ছিল কতই না মধুর। বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ বাবা, শ্রেষ্ঠ ভাই, শ্রেষ্ঠ স্বামী, সেরা অভিভাবক এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। শিশুদের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা, হৃদয় উজাড় করা প্রেম।

মহানবি (সা.) শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন, ‘দেখো, কে আমার কাছে আগে পৌঁছাতে পারে!’ শিশুরা তাঁর কোলে, কাঁধে বা গলায় ঝুলে পড়ত। তিনি অপরিচিত শিশুদেরও সমান আদর করতেন। একবার হজরত আনাস (রা.)-এর ছোট ভাইয়ের পোষা পাখি মারা যায়। মহানবি (সা.) তাকে আদর করে বললেন, ‘হে আবু উমায়র, তোমার পাখির ছানাটির কী হলো?’ (বুখারি) শিশুটি মহানবির কথায় হেসে ফেলে। এ ঘটনা মহানবির (সা.) শিশুদের মন বোঝার অসাধারণ ক্ষমতার প্রমাণ বহন করে।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, ‘একবার এক ব্যক্তি নবি করিম (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হলো। লোকটির সঙ্গে একটি শিশুও ছিল। মহানবি (সা.) লোকটিকে বললেন, তুমি কি এই শিশুর প্রতি দয়া কর? সে বলল, হ্যাঁ। হজরত রাসুল করিম (সা.) বললেন, তাহলে এই শিশুর প্রতি তুমি যতটুকু দয়া করবে, তার চেয়ে বেশি আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করবেন। তিনি দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দয়ালু।’ (আল আদাবুল মুফরাদ)

সমাজে আজ শিশুর প্রতি নৃশংসতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে সচেতন মহলে শিশুহত্যা প্রতিরোধের আহ্বান জোরদার হচ্ছে। অথচ ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগেই শিশুহত্যা নিষিদ্ধ করেছে।

বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) যুদ্ধক্ষেত্রেও কোনো শিশুকে হত্যা করতে বারণ করেছেন। রণাঙ্গনে ভুলক্রমে কোনো ইহুদি শিশু মারা গেলে হুজুর পাক (সা.) সাহাবিদের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। কারণ শিশুরা নিষ্পাপ, মাসুম। তাদের কোনো পাপ নেই।

আমরা জানি, এ বিশ্বের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ পরম দয়ালু আল্লাহতায়ালা মহানবিকে (সা.) প্রেরণ করেছেন। পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। মানুষকে মানুষ হিসেবে কীভাবে সম্মান করতে হয়, তা তিনি নিজ জীবনাদর্শের মাধ্যমে শিখিয়েছেন। শিশুদের প্রতি উত্তম আচরণ সম্পর্কে মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দেখায় না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি)

একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন সে নিষ্পাপ থাকে। মানুষ সাধারণত শিশুদের ভালোবাসে এবং আদর করতে চায়। শিশুদের ভালোবাসার প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আসলে শিশু একটি বীজের মতো। আমরা যত বেশি এর পরিচর্যা করব, এর ফুল ও ফল তত ভালো হবে।

মহানবি (সা.) শিশুদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন ও ভালোবাসতেন। তাদের কাছে টেনে চুমু খেতেন, তাদের জন্য সর্বদা কল্যাণ ও মঙ্গলের দোয়া করতেন। একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবি (সা.) একবার হাসানকে (তাঁর দৌহিত্র) চুমু খেলেন। তখন নবি করিম (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন হজরত আকরা ইবনে হাবিস (রা.)। তিনি বিরক্তি ভরে বললেন, ‘আমার ১০টি সন্তান রয়েছে, আমি কাউকে কোনো দিন চুমু খাইনি।’ এ কথা শুনে নবি করিম (সা.) তাঁর দিকে তাকিয়ে করুণাভরে বললেন, ‘যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।’ (বুখারি)

সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর অভ্যাস ছিল, সন্তান হলে তারা মহানবির (সা.) কাছে নিয়ে আসতেন। মহানবি (সা.) শিশুকে চুমু খেতেন, তাহনিক করতেন (খেজুর চিবিয়ে শিশুর মুখে দিতেন), শিশুর জন্য বরকতের দোয়া করতেন এবং কখনো কখনো নামও রাখতেন। এমনই সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর বড় ছেলে ইব্রাহিম। তিনি বলেন, ‘আমার একটি পুত্রসন্তান জন্মালে আমি তাকে নিয়ে হজরত নবি করিম (সা.)-এর কাছে গেলাম। তিনি তাঁর নাম রাখলেন ইব্রাহিম। তারপর খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দিলেন এবং তার জন্য বরকতের দোয়া করলেন। অতঃপর তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিলেন।’ (সহিহ বুখারি)

শিশুদের প্রতি মহানবির (সা.) ভালোবাসার কারণে শিশুরাও তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসত। হজরত আবদুল্লাহ বিন জাফর (রা.) বলেন, ‘মহানবি (সা.) যখন কোনো সফর শেষে বাড়িতে ফিরতেন, তখন বাচ্চারা তাঁর আগমনের পথে গিয়ে অভ্যর্থনা জানাত। একবার তিনি সফর থেকে এসে আমাকে তাঁর বাহনের সামনে বসালেন। অতঃপর নাতি হাসান ও হোসেন (রা.)-কে বাহনের পেছনে বসালেন। তারপর আমাদের নিয়ে তিনি মদিনায় প্রবেশ করলেন।’ (মুসলিম)

উমামা বিনতে আবুল আস (রা.) ছিলেন মহানবির (সা.) নাতনি। তাঁর প্রতিও হজরত রাসুল করিম (সা.) অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। আবু কাতাদা আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর মেয়ে জয়নবের গর্ভজাত এবং আবুল আস (রা.)-এর ঔরসজাত কন্যা উমামাকে (রা.) কাঁধে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তিনি যখন সেজদায় যেতেন, তখন তাকে নামিয়ে রাখতেন, আর যখন দাঁড়াতেন, তখন আবার তাকে তুলে নিতেন। (সহিহ বুখারি)

একটি অঙ্কুরকে বৃক্ষে পরিণত করার জন্য বৃষ্টি, তাপ, পানি ও আলোর প্রয়োজনীয়তা যেমন অনস্বীকার্য, ঠিক তেমনি একটি শিশুকে ভবিষ্যতের শিক্ষিত, আদর্শ ও সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা এবং সুস্থ ও সুন্দর বিকাশ অপরিহার্য।

একটি শিশুও যেন কোনোভাবে অবহেলার শিকার না হয়, সে বিষয়ে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। শিশুরা ফুল হয়ে ফুটে উঠুক সৌরভে। তাদের চাঁদমুখের হাসিতে ভরে উঠুক আমাদের সুজলা-সুফলা এই সোনার দেশ।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ।

এইচআর/জেআইএম