ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে গত প্রায় এক মাস ধরে সিটি স্ক্যান সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এমআরআই ও এক্সরে বিভাগের তীব্র ফিল্ম সংকট। এতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আশপাশে পাঁচ জেলা শত শত রোগী। বিশেষ করে দুর্ঘটনায় আহত, স্ট্রোক ও মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের দ্রুত রোগ নির্ণয়ে তৈরি হয়েছে চরম ভোগান্তি।
Advertisement
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে চালু হওয়া হাসপাতালের একমাত্র সচল সিটি স্ক্যান মেশিনটি প্রায় এক মাস আগে বিকল হয়ে যায়। প্রতিদিন এ মেশিনে গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি সিটি স্ক্যান করা হতো। এখন সেবা বন্ধ থাকায় ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের কয়েকটি জেলা থেকে আসা দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো চরম আর্থিক ও মানসিক চাপে পড়েছে।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বাসিন্দা মো. আব্দুল মালেকের ছেলে সোহেল রানা বলেন, আমার বাবা ব্রেইন স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসক জরুরি ভিত্তিতে সিটিস্ক্যান করতে বলেছেন। কিন্তু হাসপাতালে মেশিন নষ্ট থাকায় বাইরে নিয়ে যেতে হয়েছে। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। গরিব মানুষের জন্য এটা খুবই কষ্টের।
মুক্তাগাছা থেকে আসা রোগীর স্বজন রোকসানা বেগম বলেন, দুর্ঘটনায় আহত আমার ভাইকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। এখানে সিটি স্ক্যান না হওয়ায় আমরা হতাশ হয়ে পড়েছি। বাইরে পরীক্ষা করাতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে এসেও যদি বাইরে যেতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
Advertisement
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা হৃদয় মিয়া বলেন, এমআরআই করানোর জন্য সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। ফিল্ম সংকটের কারণে রিপোর্ট পেতে দেরি হচ্ছে। চিকিৎসক রিপোর্ট ছাড়া পরবর্তী চিকিৎসা দিতে পারছেন না। এতে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
এদিকে সিটি স্ক্যান সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের ইমেজিং বিভাগেও দেখা দিয়েছে গুরুতর সমস্যা। চারটি এক্সরে মেশিনের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। দুটি এমআরআই মেশিনের মধ্যে একটি সচল থাকলেও অন্যটির কার্যক্ষমতার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এর সঙ্গে ফিল্ম সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ায় এক্সরে ও এমআরআই রিপোর্ট পেতে রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, পরীক্ষা করানোর জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অনেক সময় সিরিয়াল নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত সময়ে পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক হাজার শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে আরও কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। এত বিপুল রোগীর চাপের বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক সেবা অচল হয়ে পড়ায় হাসপাতালের সামগ্রিক চিকিৎসা কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
Advertisement
হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ বদরুল আহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিটি স্ক্যান মেশিন বিকলের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। মেরামতের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া নতুন একটি এমআরআই মেশিন চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পাওয়ার আশা করছি।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ স্টোর কর্মকর্তা ঝন্টু সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিটি স্ক্যান মেশিনটি মেরামতের জন্য জাতীয় ইলেকট্রোমেডিকেল সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কাজ শুরু করেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই সেবা চালুর চেষ্টা চলছে।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জাগো নিউজকে বলেন, মেশিনটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা দ্রুত মেরামতের আশ্বাস দিয়েছে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামত সম্ভব না হয়, তাহলে তারা একটি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেবে। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মেশিনটি মেরামতের ব্যবস্থা নেবে।
হোসাইন সুলভ/কেএইচকে/জেআইএম