ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা ও উৎসব। তবে মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও এই আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সেটি হলো অর্থনীতি। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে এরই মধ্যে আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে ভিড় করতে শুরু করেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। তাদের ব্যয় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে নতুন গতি এনে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Advertisement
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্বকাপ আয়োজক দেশগুলোর জন্য সবসময় বড় অর্থনৈতিক সাফল্য বয়ে আনে না। কারণ টুর্নামেন্ট থেকে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশই চলে যায় ফিফার হাতে। তারপরও পর্যটন, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পায়।
যুক্তরাষ্ট্র: অর্থনীতিতে বিলিয়ন ডলারের প্রবাহ
বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিপুল সংখ্যক বিদেশি দর্শনার্থী যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও বিনোদন খাতে তাদের ব্যয় দেশটির অর্থনীতিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারে।
Advertisement
ফিফার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ১৭ বিলিয়ন ডলার জিডিপি যোগ করবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অর্থনীতির তুলনায় এই অবদান খুবই সীমিত। ডেনমার্কভিত্তিক স্যাক্সো ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এটি দেশটির বার্ষিক জিডিপির ০.১ শতাংশেরও কম।
আরও পড়ুন>কীভাবে বিলিয়নিয়ার হলেন মেসি, তিনি কি এখন রোনালদোর চেয়েও ধনী?বিশ্বকাপ কি ‘ফিক্সড’, কেন মাত্র ৮ দেশই বারবার ট্রফি জেতে?
অর্থনীতিবিদ ভিক্টর ম্যাথেসনের মতে, বিশ্বকাপ ঘিরে যে অর্থ ব্যয় হবে তার সবই স্থানীয় অর্থনীতিতে থাকবে না। টিকিট বিক্রির মাধ্যমে আয় হওয়া বিপুল অর্থ সরাসরি ফিফার কাছে চলে যাবে।
তারপরও আয়োজক শহরগুলোর জন্য কিছু বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে স্টেডিয়ামের আশপাশের হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।
Advertisement
ফিলাডেলফিয়ার উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোলিয়ার্সের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বকাপ থেকে শহরটির অর্থনীতিতে প্রায় ৭৭০ মিলিয়ন ডলারের প্রভাব পড়তে পারে। এটি শহরের ইতিহাসে কোনো একক আয়োজন থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা হতে পারে।
স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে আশাবাদী। তাদের বিশ্বাস, দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লে ব্যবসাও বাড়বে।
মেক্সিকো: পর্যটনখাতে বড় প্রত্যাশা
বিশ্বকাপ ঘিরে এখন উৎসবের আমেজ মেক্সিকোজুড়ে। রাজধানী মেক্সিকো সিটির বিভিন্ন এলাকায় জাতীয় পতাকার রঙে সাজানো হয়েছে সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকা। দোকানপাটে বিক্রি হচ্ছে বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট নানা সামগ্রী।
একটি হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বকাপ থেকে মেক্সিকো প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। এর মধ্যে বড় অংশ আসবে পর্যটন খাত থেকে। শুধু মেক্সিকো সিটিতেই পর্যটকদের ব্যয় থেকে বিপুল রাজস্ব আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এল জোকালো চত্বরের ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটকদের আগমন এরই মধ্যে তাদের বিক্রি বাড়াতে শুরু করেছে। অনেক রেস্তোরাঁ ও দোকান বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে।
তবে সব ব্যবসায়ী সমানভাবে আশাবাদী নন। কেউ কেউ মনে করছেন, বিশ্বকাপ আয়োজকদের নির্ধারিত ‘ফ্যান ফেস্ট’ এলাকা ও বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে ছোট ব্যবসাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কিছু হোটেল মালিকও প্রত্যাশিত বুকিং পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিশ্বকাপ ঘিরে আগ্রহ থাকলেও বাস্তব ব্যবসায়িক চিত্র এখনও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
আরও পড়ুন>কীভাবে বিলিয়নিয়ার হলেন মেসি, তিনি কি এখন রোনালদোর চেয়েও ধনী?বিশ্বকাপ কি ‘ফিক্সড’, কেন মাত্র ৮ দেশই বারবার ট্রফি জেতে?
অপরাধীদেরও নজর বিশ্বকাপে
বিশ্বকাপ শুধু বৈধ ব্যবসার জন্যই সুযোগ তৈরি করছে না, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রও এই আয়োজনকে ঘিরে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পর্যটকসমৃদ্ধ এলাকায় চাঁদাবাজি, জাল টিকিট বিক্রি, সাইবার প্রতারণা ও ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মেক্সিকো সরকার ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের সতর্ক করেছে। বিশেষ করে অননুমোদিত বিক্রেতা ও সন্দেহজনক ওয়েবসাইট থেকে টিকিট বা সেবা না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কানাডা: পর্যটন ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি
বিশ্বকাপ থেকে কানাডাও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিতে ১ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত প্রবাহ যুক্ত হতে পারে।
ভ্যাঙ্কুভার ও টরন্টোতে অনুষ্ঠিতব্য ১৩টি ম্যাচকে কেন্দ্র করে ২৪ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি জিডিপিতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডার সবচেয়ে বড় লাভ আসবে বিদেশি দর্শনার্থীদের ব্যয় থেকে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, বার, পরিবহন খাত ও স্থানীয় ব্যবসাগুলো এই অর্থনৈতিক প্রবাহের প্রধান সুবিধাভোগী হবে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, কানাডার নাগরিকরা বিশ্বকাপ উপলক্ষে যে অর্থ ব্যয় করবেন, তার বড় অংশই নতুন ব্যয় নয়। এই অর্থ অন্য কোনো বিনোদন বা ভ্রমণ খাতে খরচ হওয়ার কথা ছিল। ফলে প্রকৃত নতুন অর্থনৈতিক সুবিধা মূলত বিদেশি পর্যটকদের ব্যয় থেকেই আসবে।
লাভের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও
বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে আয়োজক দেশগুলোর জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ। পর্যটন বৃদ্ধি, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং অস্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এটি স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বকাপকে অর্থনৈতিক অলৌকিক সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আয়োজক দেশগুলোর অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত, আর বড় একটি অংশের আর্থিক সুবিধা চলে যায় ফিফা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অংশীদারদের হাতে।
তারপরও কোটি কোটি দর্শকের উপস্থিতি, বিশ্বব্যাপী প্রচার এবং পর্যটন খাতের সম্প্রসারণের কারণে বিশ্বকাপকে আয়োজক দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবেই দেখা হয়।
এমএসএম