আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প বলছেন চুক্তি হতে দেরি নেই, ইরানের দাবি এখনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চলমান সংঘাত বন্ধে একটি চুক্তি হতে আর দেরি নেই বলে ফের দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরান বলছে, এ ধরনের কোনো চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি ও এ নিয়ে প্রকাশিত খবর কেবলই জল্পনাকল্পনা।

Advertisement

ট্রাম্প বৃহস্পতিবার (১১ জুন) প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের ওপর ‘খুব কঠোর’ হামলা চালাবে। পরে তিনি জানান, হামলার পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। কারণ, আলোচকেরা ইরানের সঙ্গে ‘খুব ভালো একটি সমঝোতায়’ পৌঁছেছেন।

সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি এখন বাকি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সেই কাজ শেষ হতে পারে। এরপর ইউরোপে চুক্তি স্বাক্ষরের একটি অনুষ্ঠানও হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, চুক্তি হওয়ার যে খবর ছড়িয়েছে তা অনুমাননির্ভর। এখনো কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি।

Advertisement

এর আগেও ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি খুব কাছাকাছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা চালায়। জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়। একই সঙ্গে বিশ্বে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়।

এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও এরপরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মাঝেমধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই দুই দফা প্রতিশোধমূলক হামলা হয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প বারবার ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির কথাও বলে আসছেন।

ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একদিনেই ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮৯ ডলারে নেমে আসে।

Advertisement

সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমাদের এমন একটি চুক্তি হয়েছে, যাতে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। এ লক্ষ্যেই আমরা এত কিছু করেছি। এটি খুবই বড় একটি বিষয়।

তিনি আরও বলেন, নথিপত্র চূড়ান্ত হওয়ার পর সম্ভবত ইউরোপেই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে ও পুরো প্রক্রিয়া খুব দ্রুত সম্পন্ন হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, নথিগুলো প্রায় চূড়ান্ত অবস্থায় রয়েছে ও এখন অপেক্ষা করা হচ্ছে শেষ ধাপের জন্য।

তিনি আরও বলেন, চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালিও আবার খুলে দেওয়া হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর নেতাদের পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এই সম্ভাব্য চুক্তিতে খুশি।

নেতানিয়াহুর কার্যালয়ও দুই নেতার মধ্যে কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে তারা জানিয়েছে, এই সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ ইসরায়েল নয়।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তিতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ভেঙে ফেলা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সীমা আরোপ এবং অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন নেতানিয়াহু।

অন্যদিকে ইরানের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, সমঝোতা স্মারকের অধিকাংশ পাঠ আগেই চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র পরে অতিরিক্ত দাবি তুলেছে এবং নতুন কিছু শর্ত যোগ করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান তার ‘লাল রেখা’ থেকে সরে আসবে না।

হোয়াইট হাউজ দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান চায়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও সমাধান খুঁজছে।

গত ২০ এপ্রিল ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে তুলনামূলক দ্রুত একটি চুক্তি হবে। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহেও তিনি ও তাঁর প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দেন।

কিন্তু ২৭ মে দুই পক্ষ সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ট্রাম্প জানান, চুক্তির শর্তে তিনি সন্তুষ্ট নন। এরপরও আলোচনা চলতে থাকে।

সর্বশেষ চুক্তির দাবি তোলার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর খুব কঠোর হামলা চালাবে। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে খার্গ দ্বীপ ও ইরানের অন্যান্য তেল অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও হুমকি দেন।

উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমেই হয়ে থাকে।

ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যেমন করেছে, তেমনি ইরানের তেল ও গ্যাসের বাজারের ওপরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।

জবাবে ইরানের সামরিক বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, নতুন করে হামলা হলে আগের চেয়েও কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। এক বিবৃতিতে তারা বলে, ইরানের তেল অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মার্কিন হুমকির পর আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। হয় তেল ও গ্যাস রপ্তানির সুযোগ সবার জন্য থাকবে, না হয় কারও জন্যই থাকবে না।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ভুল কৌশল ও আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত এমন এক দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি করবে, যার মধ্যে বহু বছর আটকে থাকতে হবে।

সোমবার (৮ জুন) উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি মার্কিন অ্যাপাচি যুদ্ধহেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়। বুধবার (১০ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড জানায়, তারা দক্ষিণ ইরানের সামরিক স্থাপনা, নজরদারি কেন্দ্র এবং রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে নতুন দফা হামলা সম্পন্ন করেছে।

এর জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, তারা বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

বাহরাইনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের একটি ড্রোন হামলায় ১১ বছর বয়সী এক মেয়ে আহত হয়েছে। হামলায় কয়েকটি বাড়ি ও গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

এসএএইচ