দেশজুড়ে

ভিআইপি এলে ইট বিছানো হয় সড়কে, চলে গেলে আবার আগের চেহারা

৮৪ লাখ টাকার প্রকল্পের স্থবিরতা এক বছরেও শুরু হয়নি রাস্তার কাজ প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে ইট বিছিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা

বগুড়ার প্রত্যন্ত এক গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল পাকা রাস্তা। সেই দাবির প্রেক্ষিতে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দও মিলেছিল। দরপত্র সম্পন্ন করে ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল এক বছর আগে। কিন্তু মাসের পর মাস অপেক্ষার পরও শুরু হয়নি কাজ।

Advertisement

এরমধ্যে হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সূচি ঘোষণা হলে ঘুম ভাঙে সংশ্লিষ্টদের। রাতারাতি কাঁচা সড়কে ভাড়া করা ইট বিছিয়ে চলাচলের উপযোগী করা হয়। সফর শেষ হওয়ার পর আবার সেই ইট তুলে নেওয়া হয়। এই ফেলা ও তোলার ঘটনাটি পুরো এলাকায় আলোচনা সমালোচনার জন্ম দেয়। সেইসঙ্গে সামনে আসে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়হীনতা ও তদারকির বিষয়টি।

জেলার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের চৌকির খাল থেকে জিয়াবাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার সড়ক পাকাকরণের জন্য গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের আগস্ট মাসে মেসার্স হক ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন যৌবন হারিয়েছে আগেই, এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা আলাই নদীর লুটপাটে বিপন্ন মৌলভীবাজারের প্রাণ-পরিবেশ

চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের আগস্ট মাসের মধ্যেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, কার্যাদেশ পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু করেনি। বর্ষা মৌসুমে কাদা আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালির কারণে স্থানীয়দের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষিপণ্য বহনকারী কৃষক সবার জন্যই সড়কটি ছিল ভোগান্তির প্রতীক।

Advertisement

এর মধ্যেই গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সফরে আসেন। তিনি বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নেন এবং চৌকিরদহ খাল খননকাজের উদ্বোধন শেষে পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়ি পরিদর্শনে যান।

আর সেই সফরকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিনের স্থবির প্রকল্পে দেখা যায় আকস্মিক তৎপরতা। প্রধানমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে রাতারাতি কাঁচা সড়কটিতে ইট বিছিয়ে দেওয়া হয়, যাতে গাড়িবহর নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। সফর শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই আবার সেই ইট তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কটি আবারো কর্দমাক্ত হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাকিম বলেন, এক বছরেও রাস্তার কাজ শুরু হলো না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আসবেন শুনে এক রাতেই রাস্তা তৈরি হয়ে গেলো। তখন মনে হয়েছিল আমাদের কষ্ট শেষ হবে। পরে দেখি আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। একরাতের মধ্যেই বিছানো ইট আবারো তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। এখন বৃষ্টি হলে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা যায় না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ঘটনা শুধু একটি রাস্তার নয়, এটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা ও জবাবদিহির অভাবের বাস্তব চিত্র। তাদের প্রশ্ন, নির্ধারিত সময়ের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসেও কেন কাজ শুরু হয়নি? ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এতদিন কীভাবে বিষয়টি দেখভাল করেছেন?

Advertisement

আরও পড়ুন ছেলের হাত ধরে নতুন জীবনে ফিরছে বাবার স্বপ্নের ‘পাতলী খাল’ ‘দেশের জন্য জান দিতে পারি কিন্তু এক ইঞ্চি মাটিও ছাড়বো না’

আকরাম হোসেন নামের একজন বলেন, ‘১৭ বছর ধরে আমরা একটি চলাচলযোগ্য রাস্তার জন্য অপেক্ষা করছি। রাস্তা হবে শুনে আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য কয়েকদিনের সাজসজ্জা করা হয়েছিল। সফর শেষ, রাস্তার ইটও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির পাশের এলাকার মানুষ যদি এমন অবহেলার শিকার হয়, তাহলে এটি অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জাজনক ঘটনা।’

স্থানীয় বাসিন্দা মিনহাজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, তারা জেনেছেন ঠিকাদার সময়মতো কাজ না করায় প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় অস্থায়ীভাবে ইট বিছানো হয়েছিল। আনুষঙ্গিক কিছু কাজসহ এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

তবে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বগুড়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘কোনো পেমেন্ট করা হয়নি। ইট বিছানো হয়েছিল কাদা না হওয়ার জন্য এবং প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি যেন সুন্দরভাবে যেতে পারে।’

আরও পড়ুন সুন্দরবনে ‌‌‌‘কোণঠাসা’ দস্যুবাহিনী

তিনি বলেন, ‘ওই রাস্তার টেন্ডার অনেক আগেই হয়েছে। পাকা রাস্তার মূল কাজের অংশ হিসেবে বক্স কাটিং, স্যান্ড ফিলিং, ডব্লিউবিএম এবং পরে কার্পেটিং করা হবে। এ কারণে অস্থায়ীভাবে বিছানো ইট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন ঠিকাদার কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় কাদা এড়াতে এবং গাড়ি চলাচলের সুবিধার জন্য অস্থায়ীভাবে ইট বিছানো হয়েছিল। এজন্য আলাদাভাবে বড় অঙ্কের কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করতে না পারলে নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার আওতায় আনা হবে। আমরা আশা করছি আগামী আগস্ট মাসের মধ্যেই এই রাস্তার কাজ সম্পন্ন হবে।’

অন্যদিকে অস্থায়ী ইট বিছানোর কাজের দায়িত্ব পাওয়া শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, ‘এলজিইডির অনুরোধে ভাটা থেকে ইট এনে শ্রমিক দিয়ে সড়কে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সফর শেষে আবার ইটগুলো তুলে ভাটায় ফেরত নেওয়া হয়েছে। পরিবহন ও শ্রমিক খরচ দেওয়া হয়েছিল। তবে কত টাকা পেয়েছি, এখন তা মনে নেই।’

প্রকল্পের কাজ এক বছরেও শুরু না হওয়ার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হক ট্রেডার্স’র স্বত্বাধিকারী শামিম রেজা শামিম বলেন, জমিসংক্রান্ত জটিলতা ও প্রকল্পের প্রাক্কলন নিয়ে সমস্যার কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। এই রাস্তা নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা দিয়ে কাজ করলে কয়েকদিনও টিকবে না। এতে করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে। আর এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।’

এল.বি/এফএ/জেআইএম