নিম্নআয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা (সংশোধিত), ২০২৫ জারি করেছে সরকার। গত বছর এপ্রিলে জারি করা এই নীতিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, নতুন সংশোধিত নীতিমালায় ডিলারদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে ডিলারশিপ নবায়নের সময়সীমা ও নিয়মে।
Advertisement
জানা গেছে, সারা দেশে এক কোটি ফ্যামিলি কার্ডধারী নিম্নআয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, সহজ ও জবাবদিহিমূলক করতে চায় সরকার। এ কারণে ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় সংশোধন করা হয়েছে। এখন থেকে প্রকৃত মুদি ব্যবসায়ীদের বাইরে কেউ ডিলারশিপের আবেদন করতে পারবেন না। এর জন্য হালনাগাদ মুদি ব্যবসায়ীর ট্রেড লাইসেন্সের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। পরিষ্কার করা হয়েছে কোনো ধরনের চাকরিজীবীর আবেদনের অযোগ্যতার বিষয়টি।
এছাড়া তদারকি জোরদারে প্রশাসনের তদন্তকালে ডিলারদের দোকানে সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করাসহ যুক্ত হয়েছে একাধিক নতুন শর্ত। আবার পণ্য সরবরাহ সচল রাখতে একই এলাকায় বিকল্প ডিলার নিয়োগের সুযোগও থাকছে নতুন নীতিমালায়।
আরও পড়ুন ‘ভাড়াটে’ মানুষ দিয়ে টিসিবির পণ্য ক্রয়, বেশি দামে দোকানে বিক্রি!বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এর আগে অনুমোদিত মূল নীতিমালায় কিছু ব্যবহারিক জটিলতা ও তদারকি দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় দ্রুত এই সংশোধিত নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
Advertisement
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) শিবির বিচিত্র বড়ুয়া জাগো নিউজকে বলেন, আগের নীতিমালা প্রকাশের পরে নানাভাবে কিছু দুর্বলতার বিষয় এসেছে। পরে আমরা এ নতুন নীতিমালায় সেগুলো সংশোধন করেছি। সরকার চায় নিম্নআয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে।
যেসব পরিবর্তন আনা হয় নতুন নীতিমালায়নতুন নীতিমালায় মাঠপর্যায়ে পণ্য বিতরণ ব্যবস্থা সচল রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালার তিন অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ওয়ার্ড বা ইউনিয়নে ডিলারের পদ শূন্য হলে, কিংবা কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগের কারণে কার্যক্রম স্থগিত থাকলে অথবা সময়মতো ডিলারশিপ নবায়ন না হলে জনস্বার্থে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
সেক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের অনুমোদনক্রমে পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ড বা ইউনিয়নের ডিলার দিয়ে টিসিবির পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা হবে, যাতে সাধারণ ভোক্তারা ভোগান্তিতে না পড়েন। এছাড়া ডিলাররা চাইলে একই ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের ভেতরে জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে দোকানের ঠিকানা পরিবর্তন করতে পারবেন।
‘মুদি ব্যবসার হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স’ থাকতে হবেডিলার নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এখন থেকে শুধু সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স থাকলে চলবে না, আবেদনকারীর অবশ্যই ‘মুদি ব্যবসার হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স’ থাকতে হবে। ২০২৫ সালের নীতিমালায় মুদি ব্যবসায়ী শর্ত যুক্ত হলেও আগে সাধারণ ট্রেড লাইসেন্সের পরিবর্তে এবার মুদি ব্যবসার হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
Advertisement
এছাড়া ডিলার হতে পারবেন না এমন ক্যাটাগরির পরিধি বাড়িয়ে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং বেসরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি স্পষ্টভাবে ‘এমপিওভুক্ত’ শিক্ষক-কর্মচারীদেরও ডিলার হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
আগের নীতিমালায় সরকারি কর্মচারী, বেসরকারি চাকরিজীবী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ডিলার হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। সংশোধিত নীতিমালায় এটিকে আরও সুনির্দিষ্ট করে সরকারি/আধা-সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত কর্মচারী, এমপিওভুক্ত, বেসরকারি চাকরিজীবী উল্লেখ করা হয়েছে।
জামানত ৫০ হাজার ও ৩ মাস আগে ফিসহ আবেদননতুন নীতিমালায় ডিলারদের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে জামানত ও নবায়নের ক্ষেত্রে। ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত নির্বাচিত হওয়ার পর আগে যেখানে জামানত বাবদ ৩০ হাজার টাকা জমা দিতে হতো, সংশোধিত নীতিমালায় তা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া নবায়নের ক্ষেত্রে আগের শিথিলতা সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হয়েছে। আগে মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগে আবেদনের নিয়ম থাকলেও এখন মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগেই ফি-সহ আবেদন করতে হবে।
বিলম্ব ফির ক্ষেত্রে আগে তিন মাস বা তার বেশি সময় পাওয়া গেলেও, নতুন নিয়মে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ‘সর্বোচ্চ এক মাস’ পর্যন্ত এক হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে নবায়নের সুযোগ থাকবে। এই এক মাসের মধ্যে নবায়ন না করলে ডিলারশীপ সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে।
আগের নীতিমালা বাতিলনতুন সংশোধিত নীতিমালা জারির সঙ্গে সঙ্গে ২০২৫ ও তার আগের ২০২১ সালের নীতিমালাও বাতিল হয়ে গেছে। ফলে ২০২১ সালের নীতিমালা অনুযায়ী যারা নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং যাদের ডিলারশিপের মেয়াদ এ বছরের জুন অর্থাৎ চলতি মাস পর্যন্ত রয়েছে, তাদের ডিলারশিপ আর কোনোভাবেই নবায়ন করা হবে না বলে বলা হয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী আসন খালি থাকা সাপেক্ষে তাদের পুনরায় নতুন বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে আবেদন করে ডিলারশিপ নিতে হবে।
আরও পড়ুন টিসিবির পণ্যের জন্য হাহাকার দোকানে সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলকটিসিবির জেলা পর্যায়ের ডিলারদের কার্যক্রম তদারক করবেন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। আর উপজেলা পর্যায়ে তদারক করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। ডিলারদের চালচলন ও কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে ১০ অনুচ্ছেদে সম্পূর্ণ নতুন একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নতুন ডিলার নিয়োগ বা পুরোনো ডিলার নবায়নের সময় জেলা প্রশাসনের তদন্তকালে এবং চুক্তির পূর্বে টিসিবি কর্মকর্তার সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট ডিলারকে অবশ্যই তার দোকানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে।
আরও পড়ুন টিসিবির ডিলার নিয়োগের নীতিমালা চূড়ান্ত, যেভাবে হবে নিয়োগডিলার উপস্থিত না থাকলে কোনোভাবেই নিয়োগ বা নবায়ন অনুমোদন করা হবে না। এছাড়া জেলা প্রশাসকের তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর কোনো ডিলার আপত্তি জানালে, তা আর ‘পুনঃযাচাইকরণ বা পুনঃতদন্ত’ করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি সংশোধিত নীতিমালায়। বেনামি ডিলারশিপ ঠেকাতে একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে একাধিক ডিলারের প্রতিনিধি হতে পারবেন না বলেও নতুন নিয়ম করা হয়েছে।
উপজেলা পর্যায়েও সাময়িক ডিলার ও ট্রাকসেলএতদিন জরুরি প্রয়োজনে সাময়িক ডিলার নিয়োগের বিষয়টি শুধু সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকার ‘ট্রাকসেল’ ডিলারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে নতুন নীতিমালায় এর পরিধি বাড়িয়ে উপজেলা পর্যায়কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেলের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রির জন্য আঞ্চলিক বা ক্যাম্প অফিস প্রধানরা বর্তমান ডিলার তালিকা থেকেই উপযুক্ত ডিলার নির্বাচন করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। তবে সাময়িক ডিলার হতে গেলেও এখন ট্রাকের কাগজের পাশাপাশি দোকান ভাড়ার চুক্তি বা মালিকানার প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
টিসিবি বলছে, বর্তমানে সারা দেশে ৮ হাজার ২৭৩ জন ডিলার রয়েছেন। এছাড়া নতুন করে বিভিন্ন জেলায় ডিলার নিয়োগ চলছে। আবার চলতি মাসের শেষে উল্লেযোগ্য সংখ্যক ডিলারের চুক্তি বাতিল হচ্ছে।
এনএইচ/এসএনআর/এমএমএআর