ফিচার

রক্তদানে সোশ্যাল মিডিয়া: জীবন বাঁচানোর নতুন হাতিয়ার

বাংলাদেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় সংকট হলো সময়মতো রক্ত পাওয়া। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে দুর্ঘটনা, অপারেশন, প্রসূতি কিংবা থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিলতা রোগের জন্য রক্তের প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো রক্ত পাওয়া রোগীর জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশে বর্তমানে রক্তদাতা খোঁজা বা রক্ত সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সোশ্যাল মিডিয়া।

Advertisement

এক সময় রোগীর সংকটাপন্ন সময়ে রক্তের প্রয়োজনে মানুষ ছুটে যেত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত রক্তদাতাদের কাছে। পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে প্রয়োজনীয় গ্রুপের রক্ত খুঁজে পাওয়ার জন্য চলতো দীর্ঘ অপেক্ষা ও চেষ্টা। ফলে সংকটাপন্ন মুহূর্তে দ্রুত রক্ত সংগ্রহ করা অনেক সময় অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত। এমনকি সময়মতো রক্তের ব্যবস্থা না হওয়ায় অনেক রোগী প্রাণ হারাতেন। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন রক্তদাতা ও রক্তগ্রহীতার মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই রক্তের প্রয়োজনীয় তথ্য হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং দ্রুত রক্তদাতার সন্ধান পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ রক্তের অভাবে ভোগান্তিতে পড়েন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই জরুরি রক্তের চাহিদা তৈরি হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীরা নিয়মিত রক্ত না পেলে তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। আবার সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত রক্ত জোগাড় করা না গেলে চিকিৎসা শুরুই করা যায় না। এই বাস্তবতায় জরুরি সময়ে রোগীদের জীবন রক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

Advertisement

দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শহর থেকে গ্রাম-সব জায়গাতেই মানুষের হাতে স্মার্টফোন আছে। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই রক্তদাতার সংকট সমাধানে সোশ্যাল মিডিয়া হবে সবচেয়ে দ্রুত মাধ্যম। তাই এ হাতিয়ারকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সংগঠন রক্তের জন্য ফেসবুকের গ্রুপ তৈরি করেছে। যারা নিয়মিতভাবে রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজ করছে।

আরও পড়ুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে স্বেচ্ছাসেবীদের ভাবনা

রক্তের প্রয়োজন দেখা দিলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করলেই বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য ও রক্তদাতারা রক্তের সন্ধান পেতে সহায়তা করেন। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উপযুক্ত রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়। এছাড়া জেলা ও এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে রক্তদাতার সন্ধান চেয়ে পোস্ট করলে অনেক স্বেচ্ছাসেবী ও সচেতন মানুষ দ্রুত সাড়া দেন।

বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ এখন স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়া তাদের যুক্ত হওয়ার প্রধান মাধ্যম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং ব্লাড ব্যাংক সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে।

কিছু ক্ষেত্রে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও খুব দ্রুত কাজ করছে, যেখানে নির্দিষ্ট এলাকার সদস্যরা জরুরি কল পেলে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেন।

Advertisement

অন্যদিকে রক্ত সংগ্রহ ও রক্তদাতার সন্ধান পেতে সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজনসংক্রান্ত পোস্ট বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার হলেও তা নির্দিষ্ট এলাকা বা পরিচিত গণ্ডির বাইরে পৌঁছাতে পারে না। তাই উপযুক্ত রক্তদাতাকে দ্রুত শনাক্ত ও যোগাযোগ করার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হলো অগোছালো তথ্য। অনেক সময় রক্তের প্রয়োজন সংক্রান্ত পোস্টে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না। যেমন-রক্তের গ্রুপ, হাসপাতালের নাম, রোগীর সমস্যা বা যোগাযোগ নম্বর অস্পষ্ট থাকে। এতে যারা সাহায্য করতে চান তারাও বিভ্রান্ত হন।

আবার কিছু ক্ষেত্রে ফেক পোস্ট বা পুরোনো পোস্ট রি-শেয়ার হওয়ায় বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এতে প্রকৃত জরুরি প্রয়োজনও অনেক সময় গুরুত্ব হারায়।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্ত সংগ্রহ ও রক্তদাতার সন্ধান প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যেখানে রক্তদাতাদের রেজিস্ট্রেশন থাকবে, তাদের অবস্থান, রক্তের গ্রুপ এবং শেষ রক্তদানের সময় সংরক্ষিত থাকবে। এতে জরুরি অবস্থায় সবচেয়ে কাছের উপযুক্ত দাতাকে দ্রুত খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। একইসঙ্গে হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাংকগুলোকে এই সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পুরো প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে।

এছাড়া তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার। কোনো রক্তের চাহিদা পোস্ট দেওয়ার আগে তা যাচাই করা হলে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি কমবে। এতে মানুষের আস্থা বাড়বে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভরতা আরও কার্যকর হবে।

আরও পড়ুন তরুণদের রক্তদান যেসব কারণে ভীষণ জরুরি

এদিকে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে রক্তদানের উপকারিতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে তরুণদের স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করা গেলে ভবিষ্যতে রক্তসংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। বর্তমানে অনেক মানুষ বিভিন্ন ভুল ধারণা ও অজ্ঞতার কারণে রক্তদান করতে ভয় পান। আবার অনেকে সামাজিক দায়বদ্ধতা অনুভব করেন না। সোশ্যাল মিডিয়া যদি এই জায়গায় সচেতনতা তৈরি করতে পারে, তাহলে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা বাড়বে। ফলে জরুরি মুহূর্তে রক্তের চাহিদা পূরণ সহজ হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সোশ্যাল মিডিয়া বাংলাদেশের রক্তদানের সংকট সমাধানে একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তাই সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং সচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই প্লাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

কেএসকে