প্রবাস

ইইউর নতুন অভিবাসন আইনে কী আছে?

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অভিবাসন এবং আশ্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর গত মে মাসে অনুমোদিত হওয়া নতুন ‘অ্যাসাইলাম ও মাইগ্রেশন প্যাক্ট’ গত ১২ জুন থেকে সব সদস্যরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে।

Advertisement

এই নতুন প্যাক্টের মূল উদ্দেশ্য হলো ২০১৫ সালের মতো অনিয়মিত অভিবাসীদের গণ-আগমনের চাপ সামলানো, ইইউর বহিঃসীমান্তে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে একটি সুষম ও ন্যায়সঙ্গত ‘সংহতি ব্যবস্থা’ তৈরি করা। এই নতুন আইনের ফলে ইউরোপে আসতে ইচ্ছুক এবং ইতিমধ্যে অবস্থানরত অভিবাসীদের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে যাচ্ছে।

নতুন নীতিমালার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি দেখা যাবে ইউরোপের বহিঃসীমান্তগুলোতে। এখন থেকে কোনো বৈধ ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিট ছাড়া কেউ ইইউ সীমান্তে পৌঁছালে তাকে সরাসরি মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তার পরিবর্তে সীমান্তসংলগ্ন বা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের অস্থায়ী ট্রানজিট কেন্দ্রে বাধ্যতামূলক ‘ফিল্টারিং’ বা স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

সর্বোচ্চ সাত দিন স্থায়ী এই প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীর পরিচয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা করা হবে। এরপর আবেদনকারীদের দুটি আলাদা ট্র্যাকে ভাগ করা হবে।

Advertisement

দ্রুত সীমান্ত প্রক্রিয়া: যাদের আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা পরিসংখ্যানগতভাবে কম (যেমন নিরাপদ দেশ থেকে আসা নাগরিক) অথবা যারা নিরাপত্তা ঝুঁকি, তাদের আবেদন সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহের মধ্যে সীমান্ত কেন্দ্রেই নিষ্পত্তি করা হবে। আবেদন বাতিল হলে সেখান থেকেই তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

সাধারণ আশ্রয় প্রক্রিয়া: যাদের আবেদনের শক্ত ভিত্তি রয়েছে, তারা মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি পাবেন। তবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সংশ্লিষ্ট দেশ সর্বোচ্চ ২০ মাস পর্যন্ত সময় নিতে পারবে।

এতদিন ইতালি, গ্রিস বা স্পেনের মতো সীমান্তসংলগ্ন দেশগুলোকে একা বিশাল সংখ্যক অভিবাসীর চাপ সামলাতে হতো। নতুন প্যাক্টে একটি বাধ্যতামূলক ‘সংহতি ব্যবস্থা’ চালু করা হয়েছে। এর অধীনে প্রতি বছর ন্যূনতম ৩০ হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পুনর্বাসন করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

তবে কোনো দেশ যদি সরাসরি অভিবাসী গ্রহণ করতে না চায়, তবে তাদের জন্য বিকল্প রাখা হয়েছে। তারা চাইলে নির্দিষ্ট আর্থিক জরিমানা বা কারিগরি সহায়তা দিয়ে অন্য দেশের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারবে।

Advertisement

নতুন নিয়মে ‘নিরাপদ তৃতীয় দেশ’ ধারণার পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে ইইউর কোনো সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে যদি ইউরোপের বাইরের কোনো দেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি থাকে, তবে তারা আশ্রয়প্রার্থীদের সেই তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে পারবে—এমনকি ওই দেশের সঙ্গে আশ্রয়প্রার্থীর পূর্ব কোনো সম্পর্ক না থাকলেও।

তবে একাকী থাকা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। এছাড়া, যেসব দেশের নাগরিক নিজ দেশে ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের জন্য ইইউর বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবর্তন কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। একটি দেশে জারি হওয়া দেশত্যাগের নির্দেশ এখন পুরো ইইউ জুড়ে কার্যকর হবে।

অভিবাসীদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ‘ইউরোড্যাক’ ডেটাবেজের পরিধি ব্যাপক বাড়ানো হয়েছে। আগে কেবল ১৪ বছরের বেশি বয়সীদের আঙুলের ছাপ নেওয়া হতো। এখন থেকে ৬ বছর বা তার বেশি বয়সী সব অনিয়মিত প্রবেশকারী, আশ্রয়প্রার্থী এবং সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের আঙুলের ছাপের পাশাপাশি মুখের বায়োমেট্রিও সংরক্ষণ করা হবে।

‘সেকেন্ডারি মুভমেন্ট’ বা এক ইইউ দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে কড়া নিয়ম করা হয়েছে। ডাবলিন নীতি অনুযায়ী, প্রথম প্রবেশের দেশই আবেদনের জন্য সর্বোচ্চ ২০ মাস (পলাতক থাকলে ৩ বছর) দায়ী থাকবে। এছাড়া, দায়িত্বপ্রাপ্ত দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে আশ্রয়প্রার্থীরা খাদ্য বা আবাসনের মতো সুযোগ-সুবিধা পাবেন না।

সামগ্রিকভাবে, নতুন এই প্যাক্ট ইউরোপের দরজা অনিয়মিত উপায়ে প্রবেশকারীদের জন্য আরও কঠিন করে তুলেছে এবং বৈধ উপায়ের গুরুত্বকে পুনর্ব্যক্ত করেছে।

এমআরএম