ভোরের আলো ফোটার আগেই ট্রাকের পর ট্রাক ঢুকতে শুরু করে। দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলতে থাকে বর্জ্য ফেলার কাজ। এর সঙ্গে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র দুর্গন্ধ, উড়তে থাকে পলিথিন ও আবর্জনা। আর যখন বর্জ্যে আগুন দেওয়া হয়, তখন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আশপাশের এলাকা। চাঁদপুর শহরের স্বর্ণখোলা এলাকার মানুষের কাছে এ দৃশ্য নতুন নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে এটি তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
Advertisement
শহরের গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকায় অবস্থিত চাঁদপুর পৌরসভার ময়লার ভাগাড় এখন শুধু বর্জ্য ফেলার স্থান নয়, বরং হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। চারপাশে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক ভবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ও জনবসতি। অথচ নগরায়ণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন হয়নি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধরন।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্বর্ণখোলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ভাগাড়ে প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য এনে ফেলা হচ্ছে। আবর্জনার স্তূপ অনেক সময় দিনের পর দিন পড়ে থাকে। এসব বর্জ্য থেকে নির্গত দুর্গন্ধ পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন বর্জ্য কমানোর জন্য সেখানে আগুন দেওয়া হয়। তখন বিষাক্ত ধোঁয়া আশপাশের বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী স্থানীয়দের দাবি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ময়লার ভাগাড় অপসারণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হোক। তাদের ভাষ্য, শহরের মাঝখানে একটি ময়লার ভাগাড়ের কারণে হাজারো মানুষ প্রতিদিন যে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন, তার অবসান এখন সময়ের দাবি।
Advertisement
এলাকাবাসী জানান, ময়লার দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র যে অনেক সময় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও স্বস্তি পাওয়া যায় না। বিশেষ করে গরমের সময় এবং বাতাসের প্রবাহ বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে। শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রনি বলেন, এখানে বসবাস করা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ময়লা পোড়ানোর সময় চারদিকে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। চোখ জ্বালা করে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। অনেক সময় ছোট শিশুদের নিয়ে ঘরে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা বহুদিন ধরে ভাগাড়টি অন্যত্র সরানোর দাবি জানিয়ে আসছি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ইসহাক বলেন, অনেক ক্রেতা দোকানের সামনে এসে দুর্গন্ধের কারণে ফিরে যান। ব্যবসা আগের তুলনায় কমে গেছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন পরিবেশ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ময়লার ভাগাড়ের পাশের একটি বহুতল ভবনের মালিক আবু ফাহাদ হোসেন বলেন, এলাকার পরিবেশের কারণে নতুন ভাড়াটিয়া পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার সুযোগ পেলেই অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা ভাবছে। একটি আবাসিক এলাকায় এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে না।
Advertisement
তিনি আরও বলেন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে। দ্রুত বিকল্প স্থানে ভাগাড় স্থানান্তর এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ময়লার ভাগাড় পরিচালনা করা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের শরীরের জন্যও ক্ষতিকর। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু ভাগাড় সরিয়ে নেওয়াই নয়, আধুনিক ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকট তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও চাঁদপুর পৌরসভার প্রশাসক মো. এরশাদ উদ্দিন বলেন, স্বর্ণখোলার ময়লার ভাগাড়টি অন্যত্র স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা বিকল্প জায়গা খুঁজছি। তবে এ ধরনের স্থাপনার জন্য উপযুক্ত স্থান পাওয়া সহজ নয়। তারপরও দ্রুত সমাধানের জন্য চেষ্টা অব্যাহত আছে।
শরীফুল ইসলাম/কেএইচকে/এমএস