১৬ শতকের উত্তাল সমুদ্র। স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের একদল দুঃসাহসিক অভিযাত্রী আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছালেন এক নতুন ভূখণ্ডে। সেখানকার আদিবাসীদের গলায় আর হাতে চকচকে ধাতুর গহনা দেখে তাদের তো চোখ ছানাবড়া! খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, মূল ভূখণ্ডের গভীরে নাকি লুকিয়ে আছে আস্ত এক রুপার পাহাড়।
Advertisement
লোভে চকচক করে উঠল ইউরোপীয়দের চোখ। লাতিন শব্দ ‘আর্জেন্টাম’ (যার অর্থ রুপা) থেকে ভালোবেসে এই অঞ্চলের নাম রাখা হলো ‘আর্জেন্টিনা’—যার আক্ষরিক অর্থ রুপার দেশ। কিন্তু প্রকৃতির কী অদ্ভুত পরিহাস! যে রুপার পাহাড়ের খোঁজে স্প্যানিশরা পুরো এলাকা চষে ফেলল, তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আর্জেন্টিনার মাটিতে সেই রুপার খনির দেখাই পেল না তারা।
আরও পড়ুন ব্রাজিল যখন ফিলিস্তিনের পক্ষে, আর্জেন্টিনা কেন ইসরায়েলের পাশে?ইতিহাসের পাতায় এক মহাকাব্যিক ভৌগোলিক ভুলের গল্প জড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার নামের সঙ্গে। কীভাবে এক কাল্পনিক রুপার পাহাড়ের গল্প থেকে জন্ম নিল আজকের ফুটবলপ্রেমী আর্জেন্টিনা? কেনই বা স্প্যানিশরা সেখানে রুপা খুঁজে পায়নি? আর আজকের দিনে আর্জেন্টিনার খনিজ সম্পদের আসল চিত্রটি কী? চলুন আজ জেনে নেওয়া যাক সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
Advertisement
গল্পের সূত্রপাত ১৫১৬ সালে। স্প্যানিশ অভিযাত্রী হুয়ান দিয়াজ দে সোলিস দক্ষিণ আমেরিকার এক বিশাল নদী মোহনা আবিষ্কার করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, স্থানীয় আদিবাসীদের হামলায় সোলিস নিহত হন এবং তার জাহাজটি ফেরার পথে ব্রাজিলের উপকূলে ধ্বংস হয়ে যায়।
সেই জাহাজডুবি থেকে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন নাবিকের একজন ছিলেন আলেক্সো গার্সিয়া। ব্রাজিলের সান্তা কাতারিনা দ্বীপে স্থানীয় গুয়ারানি আদিবাসীদের সঙ্গে থাকা শুরু করেন তিনি। ওখানেই গল্প বলার ছলে আদিবাসীরা গার্সিয়াকে এক অবিশ্বাস্য লোককথা শোনায়। তারা বলে, পশ্চিমে মূল ভূখণ্ডের অনেক গভীরে এমন এক দেশ আছে, যা শাসন করেন এক ‘শ্বেত রাজা’। আর সেই রাজ্যে রয়েছে ‘সিয়েরা দে লা প্লাতা’ বা আস্ত এক রুপার পাহাড়!
আরও পড়ুন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপ তবে কার জেতা উচিত?লোভের আগুনে ঘি পড়ল। ১৫২৪ সালে গার্সিয়া প্রায় দুই আদিবাসী যোদ্ধা নিয়ে আমাজন আর প্যারাগুয়ের গহীন জঙ্গল পাড়ি দিয়ে সেই কাল্পনিক পাহাড়ের খোঁজে এক দুঃসাহসিক অভিযানে বের হন। তারা বর্তমান বলিভিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং সেখান থেকে প্রচুর রুপার গহনা ও পাত্র লুট করেন। ফেরার পথে গার্সিয়া নিহত হলেও তার সঙ্গীরা সেই রুপার গহনাগুলো নিয়ে উপকূলে ফিরে আসতে পেরেছিলেন।
রুপার নদী থেকে ‘আর্জেন্টিনা’ শব্দের জন্মউপকূলে আসা সেই রুপার গহনা আর পাত্রগুলো দেখে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি হয়। তারা ধরে নেন, এই অঞ্চলের নদীগুলো ধরে এগোলেই মিলবে সেই রুপার পাহাড়ের গুপ্তধন।
Advertisement
১৫২৬ সালে ইতালীয় অভিযাত্রী সেবাস্তিয়ান ক্যাবট স্পেনের রাজা পঞ্চম চার্লসের হয়ে এই অঞ্চলটি ফের সার্ভে করতে যান। তিনি যখন নদী অববাহিকায় পৌঁছান, তখন স্থানীয় আদিবাসীরা তাকে প্রচুর রুপার তৈরি জিনিস উপহার দেয়। এই দেখে ক্যাবট নিশ্চিত হন যে রুপার খনি এখানেই আছে। তিনি সোলিস আবিষ্কৃত সেই বিশাল নদী মোহনার নাম বদলে রাখেন ‘রিও দে লা প্লাতা’ (Río de la Plata), স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘রুপার নদী’।
আরও পড়ুন ফুটবলে এটাই হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ, কারণ কী?স্প্যানিশ শব্দ ‘প্লাতা’ মানে রুপা হলেও ইউরোপের কবি, লেখক ও মানচিত্রকাররা এ অঞ্চলের বিবরণ দিতে লাতিন শব্দ ‘আর্জেন্টাম’ (Argentum) এবং ইতালীয় শব্দ ‘আর্জেন্টিনা’ (Argentina- যার অর্থ রুপালি বা রুপা দিয়ে তৈরি) ব্যবহার করতে শুরু করেন। ১৬০২ সালে মার্টিন দেল বার্কো চেন্টিনেরা নামের এক কবি এই অঞ্চলকে নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন, যার শিরোনাম ছিল ‘আর্জেন্টিনা ওয়াই কনকুইস্তা দেল রিও দে লা প্লাতা’ (রুপালি দেশ এবং রুপার নদী বিজয়)। এরপর থেকেই নামটি ইউরোপজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
প্রকৃতির পরিহাস: কেন আর্জেন্টিনায় রুপা মিলল না?নামকরণ তো হয়ে গেল রুপার দেশ। কিন্তু এরপরই শুরু হলো আসল ট্র্যাজেডি। স্প্যানিশরা রিও দে লা প্লাতা নদীর অববাহিকা এবং আশপাশের সমতল ভূমিতে বছরের পর বছর ধরে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো রুপার খনি বা পাহাড়ের দেখা পেল না।
আর পাবেই বা কীভাবে! রুপার খনিটি আসলে আর্জেন্টিনার ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে ছিলই না! আদিবাসীদের বলা সেই আসল রুপার পাহাড়টি ছিল বর্তমান বলিভিয়ার পোতোসি (Potosí) অঞ্চলে, যা ‘সেরো রিকো’ (Cerro Rico) বা ধনী পাহাড় নামে পরিচিত।
আদিবাসীরা বলিভিয়ার সেই পাহাড়ি খনি থেকে রুপা এনে আর্জেন্টিনার নদী অববাহিকায় অন্য জিনিসের বিনিময়ে বাণিজ্য করত। স্প্যানিশরা খনির মূল উৎস না জেনেই নদীর অববাহিকাকে রুপার দেশ মনে করেছিল। তারা বলিভিয়ার রুপা দেখে আর্জেন্টিনার নাম রেখে দিয়েছিল রুপার দেশ। ১৫৪৫ সালে যখন স্প্যানিশরা আসল খনিটি আবিষ্কার করে, ততক্ষণে ম্যাপে বলিভিয়ার পোতোসি অঞ্চল আলাদা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন বিশ্বকাপ কি ‘ফিক্সড’, কেন মাত্র ৮ দেশই বারবার ট্রফি জেতে?স্প্যানিশরা বুঝতে পারল, বর্তমান আর্জেন্টিনার বিস্তীর্ণ সমতল পাম্পাস অঞ্চল রুপার খনির জন্য নয়, বরং উর্বর কৃষিজমির জন্য তৈরি। রুপা না পেয়ে হতাশ হলেও, মুখে মুখে চলে আসা ঐতিহাসিক ‘আর্জেন্টিনা’ নামটি আর পরিবর্তন করা হয়নি। অবশেষে ১৮২৬ সালে দেশটির সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আর্জেন্টিনা প্রজাতন্ত্র’ (Argentine Republic) নামটি স্থায়ী করা হয়।
আধুনিক যুগে রুপার দেশের আসল রূপতাহলে কি আর্জেন্টিনায় আসলেই কোনো রুপা নেই? স্প্যানিশদের সেই ভুল ধারণার কয়েক শতাব্দী পর। আধুনিক বিজ্ঞান এবং উন্নত খনি প্রযুক্তির কল্যাণে জানা যায়, আর্জেন্টিনার মাটিতে সত্যিই রুপা আছে! তবে তা স্প্যানিশদের খোঁজা সেই সমতল নদী অববাহিকায় নয়, বরং চিলি সীমান্তের দুর্গম আন্দিজ পর্বতমালায়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে খনিজ রুপা উত্তোলনে আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রতি বছর দেশটিতে বিপুল পরিমাণ রুপা উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার সালতা অঞ্চলের দিয়াব্লিলোস খনিতে এবং এল কেভার প্রজেক্টে খাঁটি রুপার বিশাল মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে।
আরও পড়ুন বারে ৩ বার বল লাগলে গোল, চোটের ভান করলেই শাস্তি?শুধু রুপাই নয়, বর্তমানে আর্জেন্টিনার খনি শিল্পে আরও বড় এক বিপ্লব ঘটেছে। সেটি হলো ‘লিথিয়াম’ (Lithium), যাকে আধুনিক প্রযুক্তির ‘সাদা সোনা’ (White Gold) বলা হয়। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ির রিচার্জেবল ব্যাটারি তৈরির এই মূল কাঁচামাল উৎপাদনে আর্জেন্টিনা বর্তমানে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। বলিভিয়া ও চিলির সাথে যৌথভাবে আর্জেন্টিনা গড়ে তুলেছে বিশ্বের বিখ্যাত ‘লিথিয়াম ট্রায়াঙ্গেল’।
স্বপ্নের সমাপ্তি ও নামের অমরত্ব১৬ শতকের স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা যে সোনা-রুপার লোভ নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল, সেই হিসেবে তারা ব্যর্থই হয়েছিল। তারা যেখানে রুপা খুঁজতে এসেছিল, সেখানে শুধু উর্বর ঘাস আর মাটি ছাড়া কিছুই পায়নি। কিন্তু ইতিহাস তার নিজের নিয়মেই চলে। রুপার খোঁজে করা সেই ভুল নামকরণের ঋণ আজ আর্জেন্টিনা শোধ করছে তার পর্বতমালায় লুকিয়ে থাকা রুপা, সোনা আর লিথিয়ামের ভাণ্ডার দিয়ে।
আরও পড়ুন ফুটবলে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ দেশ: সান ম্যারিনো সম্পর্কে মজার কিছু তথ্যবাস্তবের রুপার পাহাড় না মিললেও, নীল-সাদা জার্সির আর্জেন্টিনা আজ তার ফুটবল ঐতিহ্য, ম্যারাডোনা-মেসির জাদু, ট্যাঙ্গো নাচ আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি দিয়ে বিশ্বমঞ্চে ঠিকই রুপার মতোই উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। নামের পেছনের সেই ঐতিহাসিক ভুলটিই আজ আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সুন্দর এবং রোমাঞ্চকর পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: আর্জেন্টিনা সরকার, ব্রিটানিকা, লা হিগুয়েরা ম্যাজিকা, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউকেএএ/