বিয়ের কিছুদিন পরই নিধি আগরওয়াল ও তার স্বামী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারা সন্তান নেবেন না। নয় বছর পরও তারা সেই সিদ্ধান্তেই অটল। ভারতের প্রযুক্তিনগরী বেঙ্গালুরুর এই জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা বলেন, বিয়ের আগে তারা সন্তান নিয়ে আলোচনা করেননি; বরং আর্থিক পরিকল্পনা ও ক্যারিয়ার নিয়েই বেশি ভাবতেন।
Advertisement
তিনি বলেন, বিয়ের পর আমরা সন্তান নিয়ে কথা বলি এবং দুজনেই মনে করি, সমাজে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এমন কাজ ও প্রতিষ্ঠান গড়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া আমাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে জন্মহার কমছে
নিধিদম্পতি একা নন। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির দেশ ভারতে এখন অনেক তরুণ-তরুণী কম সন্তান নেওয়া বা সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
Advertisement
ভারতের সাম্প্রতিক স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসআরএস) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটির মোট প্রজনন হার নেমে এসেছে প্রতি নারীতে ১.৯ সন্তানে। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন ২.১ সন্তানের হার। ২০০০-এর দশকে ভারতে এই হার ছিল প্রায় ৩.৩।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা বিস্তার, গর্ভনিরোধকের সহজলভ্যতা, নারীর কর্মজীবনে অগ্রগতি এবং সন্তান লালন-পালনের বাড়তি খরচ—সব মিলিয়েই জন্মহার কমছে।
ক্যারিয়ারকে অগ্রাধিকার
বেঙ্গালুরুর স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ জ্যোৎস্না মিরলে বলেন, বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষিত নারীরা আর আগের মতো বিয়ে ও সন্তান ছাড়া জীবন পূর্ণ হয় না, এ ধরনের সামাজিক ধারণা সহজে মেনে নিচ্ছেন না।
Advertisement
তার ভাষায়, আগে নারীরা মনে করতেন, ক্যারিয়ার পেছনে ফেলে সন্তান নেওয়াই স্বাভাবিক পথ। এখন ৩০-৪০ বছর বয়সী অনেক নারী আর্থিকভাবে স্বাধীন এবং শিক্ষিত হওয়ায় নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সন্তান নেবেন কি না।
তিনি আরও বলেন, অনেক দম্পতি এখন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেন—আমরা যদি কর্মজীবনে ভালো করি, তাহলে সন্তান নেওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?
মানবাধিকার আইনজীবী শ্বেতা লুথরার অভিজ্ঞতাও একই রকম। ২৩ বছর বয়সে বিয়ে করলেও তিনি তখন সন্তান চাননি। আমি পড়াশোনা করতে, ক্যারিয়ার গড়তে আর পৃথিবী ঘুরতে চেয়েছিলাম, বলেন তিনি।
জীবনযাত্রার ব্যয় বড় বাধা
শুধু ক্যারিয়ার নয়, বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়ও বড় কারণ হয়ে উঠছে। ভারতে মূল্যস্ফীতি এখনো উদ্বেগের বিষয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে গড় বার্ষিক আয় ছিল ২ হাজার ৮৭৮ ডলার, অর্থাৎ মাসে ২৪০ ডলারেরও কম। অথচ জীবনযাত্রার মাসিক গড় ব্যয় ভাড়া ছাড়া প্রায় ২৯০ ডলারের সমান।
একটি বড় ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির টিম লিডার রূপা বলেন, সন্তানকে ভালো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ভবিষ্যতের সুযোগ দিতে চাইলে আর্থিক নিরাপত্তা জরুরি। তাই অনেকেই পরিবার বড় করার আগে সময় নিচ্ছেন।
শ্বেতা লুথরার মতে, অনেক তরুণ এখন সন্তান পালনের চেয়ে ভ্রমণ, বাইরে খাওয়া বা নিজের জীবনমান উন্নত করাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রভাব
ভারতে শিশু মৃত্যুহারও কমেছে। ২০১৯ সালে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে যেখানে ৩০ শিশুমৃত্যু হতো, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ২৪-এ। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই দেখছেন, শিশু মৃত্যুহার কমলে সাধারণত পরিবারগুলো কম সন্তান নিতে শুরু করে।
এসআরএস প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কম শিক্ষা ও বেশি শিশু মৃত্যুহারের রাজ্য বিহারে প্রজনন হার সবচেয়ে বেশি—২.৯। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার রাজধানী দিল্লিতে হার মাত্র ১.২। দক্ষিণের তামিলনাড়ু ও কেরালায় তা ১.৩।
নারীর সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা
মিরলের মতে, গর্ভনিরোধক সহজে পাওয়া এখন ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলের নারীদেরও সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সময় সামাজিক সহায়তার ওপরও নির্ভর করে। ভারতে দাদা-দাদি বা নানা-নানির সহায়তা অনেক পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দেরিতে সন্তান নিলে এই সহায়তা নাও পাওয়া যেতে পারে, তখন ডে-কেয়ার বা আয়ার খরচ বাড়ে।
কর্মক্ষেত্রের নীতিও বড় ভূমিকা রাখছে। ভারতে নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি পেলেও বেসরকারি খাতে পিতৃত্বকালীন ছুটির বাধ্যতামূলক আইন নেই।
সরকারের উদ্বেগ ও প্রণোদনা
ভারত সরকার এখনো জাতীয় পর্যায়ে জন্মহার বাড়াতে কোনো বড় নীতি নেয়নি। তবে কিছু রাজ্য প্রণোদনা দিচ্ছে। অন্ধ্র প্রদেশে তৃতীয় সন্তান হলে ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তান হলে ৪০ হাজার রুপি দেওয়ার ঘোষণা এসেছে।
গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো কিছু রাজ্যে সরকারিভাবে আইভিএফ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আরও সন্তান নিন বললে মানুষ সিদ্ধান্ত বদলাবে না। মিরলে বলেন, সরকারের উচিত বরং জানতে চাওয়া—কেন ৩০ বা ৪০ বছরের দম্পতিদের গর্ভধারণ কঠিন হয়ে উঠছে?
সামাজিক চাপ এখনো রয়ে গেছে
নিধি আগরওয়াল বলেন, সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালে এখনো অনেকে অদ্ভুতভাবে তাকান। কেউ কেউ ভাবে, নিশ্চয়ই আমাদের কোনো শারীরিক সমস্যা আছে। পরিবারেও অনেকেই সিদ্ধান্তটা বুঝতে চান না।
তবে তার কথায়, সন্তান নেওয়া বা না নেওয়া সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সমাজের উচিত এই পছন্দকে সম্মান করা।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম