সুনামগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল জেলার একমাত্র সদর হাসপাতালে একটি কার্যকর আইসিইউ ইউনিট চালুর। অবশেষে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। তবে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনের চেয়েও বড় প্রশ্ন এখন একটাই—চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের মধ্যেও আইসিইউ ইউনিটটি নিয়মিত ও কার্যকরভাবে চালু রাখা যাবে কি না।
Advertisement
রোববার (১৪ জুন) ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার হাম ডেডিকেটেড নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ইউনিটের উদ্বোধন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ভার্চুয়ালি যুক্ত থেকে আইসিইউ ইউনিটের কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসক সংকট, শয্যা সংকট, ওষুধের অভাব এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার ঘাটতিতে ভুগছে জেলার একমাত্র এই সরকারি হাসপাতাল। ফলে জটিল রোগে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীকেই শেষ পর্যন্ত রেফার করা হয় সিলেটে। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি দুর্ভোগে পড়তে হয় রোগী ও স্বজনদের।
এমন বাস্তবতায় রোগীদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ১০ শয্যার একটি আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২১ মার্চ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম বুঝে পেলেও জনবল সংকটের কারণে সেটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে এসব সংকট কাটিয়ে রোববার হাসপাতালটির আইসিইউ ইউনিট নতুন করে উদ্বোধন করা হয়েছে।
Advertisement
তবে এ আইসিইউ ইউনিটের উদ্বোধনের পর থেকে সুনামগঞ্জের সচেতন মহল থেকে শুরু করে সেবা নিতে আসা রোগীদের প্রশ্ন এটা কি শুধুই নামমাত্র চালু হয়েছে। নাকি নানা অজুহাতে কয়েকদিন পর আবারও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে দেবে।
পৌর শহরের বাসিন্দা দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী বলেন, হাসপাতালে রোগীরা আসে সেবা পাওয়ার আশায় কিন্তু এখানে এসে সেবার বদলে ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগীদের। হাসপাতালের লিফ্ট নষ্ট, চারদিকে নোংরা ও শয্যা সংকট। এক কথায় স্বাস্থ্য সেবার মান খুবই খারাপ।
তিনি বলেন, আজকে যে আইসিইউ ইউনিট চালু হয়েছে, সেটা আরও ৩ বছর আগে হওয়ার কথা কিন্তু সেটি হয়নি। সুনামগঞ্জবাসীর অনুরোধ-এ সেবাটুকু যেন কন্টিনিউ চালু রাখা হয়।
সুনামগঞ্জের বাসিন্দা আশিকুর রহমান বলেন, জেলার দূর দূরান্ত থেকে রোগীরা আসে সুনামগঞ্জের ২৫০ শয্যা হাসপাতালে কিন্তু এখানে এসে ডাক্তার সংকট, ওষুধ নেই, ও দালাল খপ্পরসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের। হাসপাতালের স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারের বাড়তি নজর দেওয়া উচিত।
Advertisement
হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীর স্বজন মোশারাফ বলেন, হামে নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি হলেও তাদের সিলেটে রেফার করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ জেলার অনেক শিশু হামে মৃত্যু হয়েছে। তবে আজকে দেখলাম হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট চালু হয়েছে। দয়া করে এ ইউনিট যেন সবসময় সচল থাকে।
এদিকে, সুনামগঞ্জেও হাম রোগে শিশু আক্রান্ত থামছে না। গত দুই মাসে ১৪০০ বেশি শিশু হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্য মারা গেছে ২৪ জন। সেই সঙ্গে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে এখনও শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। তবে ওষুধ সংকট ও ডাক্তার সংকটে সঠিক চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না রোগীরা।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে বিভিন্ন পর্যায়ে ৬৬ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৩১ জন। শূন্য রয়েছে ৩৫ জন চিকিৎসকের পদ। ২৬১ জন নার্সের বিপরীতে আছেন ১৪১ জন।
তবে বিদ্যমান এসব সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আজকে এ হাসপাতালে আইসিইউ সেবা চালু হয়েছে। এখন সহজে কোনো রোগীকে সিলেটে যেতে হবে না। পাশাপাশি হামে আক্রান্ত হয়ে যে শিশুরা আসবে তারাও এখন সুনামগঞ্জেই সেবা নিতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে ডাক্তার সংকট রয়েছে, তারপরও আমরা সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। তবে সব সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
লিপসন আহমেদ/কেএইচকে/এমএস