নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে খুলনার ডুমুরিয়ার তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের অসংখ্য ঘর। নদী খনন করতে গিয়ে অপরিকল্পিতভাবে মাটি ফেলার কারণে ঘরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশকিছু টিউবওয়েল ও টয়লেটও নষ্ট হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড।
Advertisement
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলা এবং খর্নিয়া এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প লাগোয়া ভদ্রা নদী খননের কাজ করছে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড। নদী থেকে তোলা পলিমাটির প্রচণ্ড চাপে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের পেছনের দেওয়াল ও জানালা ভেঙে ভেতরে কাদা ঢুকে গেছে। মাটির ভারে অনেক ঘরের দেওয়াল ও মেঝেতে ফাটল ধরেছে। এই নদী খনন কর্মসূচিতে কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষদের খাবার পানির জন্য তিনটি টিউবওয়েলের মধ্যে দুটিই এরই মধ্যে নষ্ট হয়েছে। বেশিরভাগ ঘরের মানুষদের টয়লেট ভেঙে দেওয়া হয়েছে খননের সময়ই। খর্নিয়া ও কাঁঠালতলা এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবারের আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে।
খর্নিয়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা সবুর মোল্যা বলেন, ‘নদী কাটার সময় মেশিন দিয়ে ঘরের কাছের গোড়া পর্যন্ত গর্ত করা হয়েছে। এখন একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে পড়বে। গরিব মানুষগুলো একদম পথে বসে যাবে। তিনটি পানি খাওয়ার টিউবয়েল ছিল। তার মধ্যে নষ্ট হয়ে গিয়েছে দুইটি।’
বাসিন্দা রওশন আরা বেগম বলেন, ‘আমাগের থাকার কোনো জায়গা নাই। আমাগের একটু জায়গা জমি থাকলে সরকারি ঘরে থাকতাম না। মাটি পইড়া দেয়াল মেয়াল ভাইংগা গেছে। বাচ্চা গাচ্চা নিয়া যামু কই? একেবারে পথে নাইমা গেছি।’
Advertisement
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২০ জুন এবং ২২ সালে তিনটি ধাপে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করে তৎকালীন সরকার। চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় খাস জমি চিহ্নিত করে দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমি পাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়। যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে আপার ভদ্রাসহ ৫টি নদীর (হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপারভদ্রা, টেকা ও শ্রী) ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ দেয় সরকার। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে নদী খননের এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ায় এই নদী খনন শুরু হয়। এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে নদী খননের এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। প্রকল্পের আওতায় যশোর ও খুলনা এলাকার হরিহর নদী ৩৫ কিলোমিটার, হরি-তেলিগাতি নদী ২০ কিলোমিটার, আপার ভদ্রা নদী ১৮.৫ কিলোমিটার, টেকা নদী ৭ কিলোমিটার ও শ্রী নদী ১ কিলোমিটারসহ মোট ৫টি নদীর ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সেনাবাহিনী ‘অর্পিত ক্রয়কার্য’ পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। নদী খননের পাশাপাশি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, ড্রেজড মাটি সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগণের চলাচলের রাস্তা হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করা হবে। পরিবেশবান্ধব পুনঃখনন নিশ্চিত করতে টার্ফিং ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হবে। ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ডুমুরিয়ার বরাতিয়ার কাঁঠালতলা ও খর্নিয়ার গৃহহীন পরিবারের ঘরগুলোতে নদী খননের মাটি উঠে যাওয়ার বিষয়টি অবগত হয়েছি। সেনাবাহিনী ও যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। আমি এরই মধ্যে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বিষয়টি অবগত হয়েছেন। খুব তাড়াতাড়ি ভূমিহীন এসব পরিবারের জন্য তারা ব্যবস্থা নেবেন।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জাগো নিউজকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ দায়িত্ব সেনাবাহিনীর। সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারা এরই মধ্যে মাটি সরিয়ে ফেলছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরিফুর রহমান/এফএ/এএসএম
Advertisement