সুমি ইসলাম
Advertisement
বারো বছরের সংসার। দুই সন্তানের জননী একজন নারী। একসময় নিশ্চয়ই ভালোবেসেই বিয়ে হয়েছিল। একসঙ্গে ভবিষ্যতের স্বপ্নও ছিল। কিন্তু সেই সম্পর্কের শেষ অধ্যায়ে এসে একজন স্ত্রীকে নিজের জীবন বাঁচাতে চিৎকার করতে হয়েছে। প্রতিবেশীদের দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করতে হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ঘটে যাওয়া এ ঘটনা শুধু একটি পারিবারিক বিরোধ নয়; এটি আমাদের সমাজের ভয়াবহ অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি। যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল স্বামীর। টাকা না পেয়ে স্ত্রীর ওপর চলেছে নির্যাতন। বাবার বাড়ি থেকে এক লাখ টাকা এনে দেওয়ার চাপ, মারধর, ঘর থেকে বের করে দেওয়া—এসবের পরও শেষ রক্ষা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন দীপ্তিকে বিয়ের পর মুশতাক / ‘আপনাদের প্রতিটি বার্তা আমাদের সাহসের উৎস’প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ ঠিক কতটা নিষ্ঠুর হয়ে গেলে বারো বছরের সংসার, দুই সন্তানের মুখ, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ—সবকিছু ভুলে গিয়ে এমন কাজ করতে পারে? আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এ ঘটনা কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের নির্যাতন, ভয়ভীতি এবং অর্থের জন্য চাপ সৃষ্টি। অর্থাৎ সহিংসতা একদিনে জন্ম নেয়নি; ধীরে ধীরে বড় হয়েছে, আর আমরা সমাজ হিসেবে সেই লক্ষণগুলো দেখেও গুরুত্ব দিইনি।
Advertisement
অনলাইন জুয়া আজ শুধু অর্থনৈতিক অপরাধের বিষয় নয়; এটি পরিবার ধ্বংসেরও একটি বড় কারণ হয়ে উঠছে। একজন ব্যক্তি যখন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারান; তখন তার ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় স্ত্রী, সন্তান এবং পুরো পরিবারকে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে, নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন আরও গভীরে যেতে হবে। কেন একজন নারীকে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও বারবার একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়? কেন একজন স্বামী মনে করেন, স্ত্রীর ওপর শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করা তার অধিকার? কেন অর্থের জন্য একজন মানুষ নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়?
আরও পড়ুন অবশেষে সত্যের জয় হলো: ক্রিকেটার নাসিরএ ঘটনার বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু শুধু বিচার হলেই চলবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি এমন ঘটনার পেছনে থাকে অসংখ্য নীরব কান্না, অপমান আর সহ্যের ইতিহাস। এক লাখ টাকা না পাওয়ার ক্ষোভে যদি একজন মানুষ তার স্ত্রীর জীবন কেড়ে নিতে উদ্যত হয়, তাহলে সমস্যাটা শুধু সেই ব্যক্তির নয়; সমস্যাটা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেরও।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন নারী তার স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসা না পেলেও অন্তত মৃত্যুভয় নিয়ে বাঁচতে হবে না। যেখানে সংসার হবে আশ্রয়ের জায়গা, আতঙ্কের নয়। কারণ কোনো টাকার অঙ্ক, কোনো আসক্তি, কোনো রাগ—কখনোই একটি মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার এই প্রতিবাদ বাস্তবতায় রূপ নিক। এমন পরিস্থিতি আর তৈরি না হোক।
লেখক: কবি ও কথাশিল্পী।
Advertisement
এসইউ