অর্থনীতি

রেস্তোরাঁ-ক্যাটারিংয়ে অভিন্ন শুল্ককর ও স্ট্রিট ফুডে ভ্যাট বসানোর দাবি

দেশের রেস্তোরাঁ শিল্পকে সংকট থেকে উত্তরণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিং সার্ভিসের ক্ষেত্রে একই শুল্ককর বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত উৎসে কর পুরোপুরি প্রত্যাহার চায় বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। একই সঙ্গে স্ট্রিট ফুডসহ সব প্রকার রেস্তোরাঁকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানায় সংগঠনটি।

Advertisement

শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে রাজধানীর বিজয়নগরে সমিতির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রস্তাব ও দাবি তুলে ধরা হয়। এ সময় এ দুই ক্ষেত্রে শুল্ককর কমানোসহ সাত দফা দাবি জানায় রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।

সমিতির পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের মহাসচিব ইমরান হাসান। তিনি দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংক খাতের সংকটের মধ্যেও ব্যবসাবান্ধব বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করার জন্য বিএনপি সরকার এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানান। তবে একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এলপিজি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে রেস্তোরাঁ খাতের পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে, যা এই খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে এ খাতকে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

এ সময় তিনি বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, আগের মতো প্রতি মাসে ভ্যাট আদায়, রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনায় ওয়ান স্টপ সার্ভিসের দ্রুত বাস্তবায়ন, রেস্তোরাঁ খাতে জন্য সুনিদ্দিষ্ট শিল্প নীতি ঘোষণা এবং সমিতির সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবসহ রেস্তোরাঁ খাতে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা এবং রেস্তোরাঁ শিল্পকে আর্ন্তজাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার প্রস্তাব দেন।

Advertisement

ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিং খাতের জন্য ভ্যাট ও করের হার সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি। বর্তমানে রেস্তোরাঁ খাতে ভ্যাট ৫ শতাংশ এবং ক্যাটারিং সার্ভিসে ১৫ শতাংশ দিতে হয়। সব ক্ষেত্রে সেটা সমান করে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে হবে। বিভিন্ন শ্রেণির রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিং সেবার ওপর ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট ও কর আরোপের ফলে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং কর প্রশাসনও জটিল হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন বেড়েছে চালের দাম, কমেছে ডিম ও মুরগির

তিনি বলেন, পাশাপাশি স্ট্রিট ফুডসহ সব প্রকার রেস্তোরাঁকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এতে চলমান অসম প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় অনেকটা বাড়বে।

এ ব্যবসায়ী বলেন, এছাড়া বাজেটে জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর এবং ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক পুরোপুরি হ্রাস করার প্রস্তাব করছি। বর্তমান সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপ, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের কর আরোপ বা বহাল রাখা জনসাধারণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করবে।

ইমরান হাসান বলেন, সরকার ঢাকার বাইরে রেস্তোরাঁ ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নতুন রেস্তোরাঁর স্থাপনা ও যন্ত্রপাতির ওপর প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ অবচয় সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করায় আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এতে নতুন উদ্যোক্তারা কর রেয়াত পাবেন। তবে আমরা চাই, রেস্তোরাঁ শিল্পের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ নিশ্চিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কর কাঠামোকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমানো, কর প্রশাসনে হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। আমরা আশা করি, চূড়ান্ত বাজেটে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিতের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে।

Advertisement

প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট পরিশোধের সময় বাড়িয়ে তিনমাস করা প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে পূর্বের ন্যায় মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট পরিশোধ ও রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা বহাল রাখার প্রস্তাব করে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।

আরও পড়ুন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফের অস্থিরতার আশঙ্কা

ইমরান হাসান আরও বলেন, বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি সরকারের নীতি ও নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনার জন্য একাধিক দপ্তর থেকে ১০-১২টি অনুমোদন নিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ফলে ব্যবসা পরিচালনা এবং কার্যকর তদারকি উভয়ই বাধাগ্রস্ত হয়। তাই রেস্তোরাঁ খাতকে একটি সমন্বিত কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার আওতায় এনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি একটি ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর প্রস্তাব করছি। এর মাধ্যমে লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজ হবে, সময় ও ব্যয় কমবে এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে কার্যকর মনিটরিং সম্ভব হবে।

এছাড়া প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আলোকে রেস্তোরাঁ খাতের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট শিল্পনীতি ঘোষণার দাবি জানানো হয়। একটি পৃথক শিল্পনীতি প্রণয়ন করা হলে লাইসেন্সিং, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং উদ্যোক্তা সহায়তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পৃথক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে উদ্যোক্তারা জটিলতা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। যে কোনো রেস্তোরাঁ ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে বাণিজ্য সংগঠন আইন অনুযায়ী রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সদস্য পদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক আছে, তবে এর বাস্তবায়ন দাবি করা হয়।

ইমরান হাসান আরও বলেন, বাজেটে রন্ধনশিল্পকে বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত করতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে আমরা প্রস্তাব করছি, গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে সরকারি-বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকিসহ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে পৃথক তহবিল গঠন করা হোক। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিক ও কর্মীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর দাবি জানাচ্ছি।

সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সহ-সভাপতি শাহ সুলতান খোকন, যুগ্ম মহাসচিব ফিরোজ আলম সুমন, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌফিকুর ইসলামসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এনএইচ/কেএসআর