আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধে শেষ মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার, স্পষ্ট হচ্ছে সামরিক দুর্বলতা

আধুনিক যুদ্ধ ইতিহাসে ইরান-মার্কিন যুদ্ধ এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই যুদ্ধে বিশাল সামরিক শক্তি প্রতিপক্ষের কৌশলগত অবস্থানের কাছে নতি স্বীকার করেছে। গত শতাব্দী থেকে ইরান যুদ্ধ পর্যন্ত অন্য সব যুদ্ধ থেকে এর পার্থক্য গড়েছে যে বিষয়টি তা হচ্ছে- স্বল্প সময়ে এত বেশি গোলাবারুদের ব্যবহার। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে দীর্ঘমেয়াদি কমতি ও টানাপড়েন দেখা গেছে। মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে।

Advertisement

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের প্রথম দুই দিনের মধ্যেই প্রায় ৫৬০ কোটি ডলারের অস্ত্র (precision-guided munitions) ব্যবহার করা হয় যা বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের বার্ষিক সামরিক বাজেটের চেয়েও বেশি।

৮ এপ্রিল পর্যন্ত সম্পূর্ণ ৪০ দিনের যুদ্ধকালীন সময়ে মার্কিন বাহিনী ইরানে ১৩,০০০-এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে মিসাইল হামলা চালায়। CSIS-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু বিমান অভিযানেই প্রথম ৬ দিনে খরচ হয় ১১৩০ কোটি ডলার যা ১২তম দিনে বেড়ে ১৬৫০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। তবে, এটি ১০০০ হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি হতে পারে বলে জানিয়েছে ইরান।

দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশায় যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে আধুনিক নির্ভুল অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবহার করে ফেলেছে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি চোরাবালিতে আটকে পড়েছে যেখান থেকে উত্তরণের জন্য ইরানের ১৪ দফা শর্তের ভিত্তিতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

Advertisement

JASSM-ER: প্রশান্ত মহাসাগরের কৌশলগত ক্ষয়

এই যুদ্ধের কৌশলগত অতিরিক্ত ব্যয় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় AGM-158B JASSM-ER ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে। এটি সাধারণ ক্রুজ মিসাইল নয়। এটি একটি স্টেলথ, দূরপাল্লার, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য নির্ভুল হামলা চালনো অস্ত্র। এর রেঞ্জ ৬০০ মাইলেরও বেশি। এটি মূলত এমন শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল যার উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে-বিশেষ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য।

যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ২ হাজার ৩০০টি JASSM-ER মিসাইল ছিল। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ৪ সপ্তাহেই ১,০০০টিরও বেশি ব্যবহার করা হয়।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বলেছে, পুরো যুদ্ধে মোট ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০টি JASSM-ER। আর ৪৭টি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে একটি আলাদা অভিযানে ব্যবহার করা হয়। ফলে বর্তমানে মার্কিন ভাণ্ডারের মাত্র ১৮ শতাংশ (৪২৫টি মিসাইল) অবশিষ্ট আছে। প্রতিটি JASSM-ER-এর দাম প্রায় ১১ কোটি ডলার, ফলে ব্যবহৃত মিসাইলগুলোর মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১২০ কোটি ডলার।

তবে, এই বিশাল ব্যয়ের পরেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস হয়নি, কমান্ড কাঠামো ভাঙেনি এবং কৌশলগত ভারসাম্যও পরিবর্তন হয়নি।

Advertisement

টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ৪০ দিনে শেষ হাজারের বেশি 

BGM-109 Tomahawk হলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো ও পরীক্ষিত দূরপাল্লার অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯১ সাল থেকে সব বড় যুদ্ধে এ মিসাইল ব্যবহার করেছে। এই যুদ্ধে ৮৫০টিরও বেশি টমাহক প্রথম মাসেই ব্যবহার করা হয় পরে এ সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে।

মার্কিন ভাণ্ডারে টমাহক মিসাইল মোট ৩,২০০টি ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এক যুদ্ধে প্রায় ৩১ শতাংশ মিসাইল খরচ করে ফেলেছে। প্রতিটি টমাহকের দাম প্রায় ১৮ কোটি ডলার। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৯০ কোটি ডলার।

প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট

Patriot, THAAD এবং SM-3/SM-6 ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পুনরায় উৎপাদনে ৩–৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগবে। পুনরায় পূরণ করতে ২০২৮–২০৩০ পর্যন্ত সময় লাগবে।

Patriot PAC-3 MSE: প্রতি ইউনিট -৪ মিলিয়ন ডলার ( ১,২০০টিরও বেশি ব্যবহৃত)THAAD: উচ্চস্তরের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ( ৫২ থেকে ৮১ শতাংশ মজুদ শেষ)SM-3 ও SM-6: নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (১৬ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহৃত)

মোট হিসাব অনুযায়ী, অন্যান্য অস্ত্র মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০০ কোটি ডলার মূল্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খোয়া গেছে। এই বিপুল খরচ সত্ত্বেও যুদ্ধ তার ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চীনের ওপর এর প্রভাব। এই অস্ত্রগুলো মূলত চীনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধ (তাইওয়ান/দক্ষিণ চীন সাগর) মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধেই এগুলোর বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে।

কেএম