আন্তর্জাতিক

সোনা কেনার এখনই কি সেরা সময়?

২০২৩ সালের শুরু থেকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম ১২৬ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। তবে সম্প্রতি মূল্যবান এই ধাতুর দাম দ্রুত কমতে থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতংক তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশংকা করছেন, সোনার বাজারে দীর্ঘদিনের আকর্ষণ হয়তো এবার কমতে শুরু করেছে।

Advertisement

গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম গত জানুয়ারির রেকর্ড সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ২৩ শতাংশের বেশি কমে সাময়িক মন্দাভাব বা ‘বিয়ার মার্কেট’-এ প্রবেশ করেছিল। গত কয়েকদিনে দাম কিছুটা স্থিতিশীল হলেও সোনার বাজার এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে এবং আবারও মন্দাভাবে পড়ার চেয়ে মাত্র দুই শতাংশেরও কম দূরত্বে অবস্থান করছে।

আগামী মাসগুলোতে সোনার বাজারে আরও ওঠানামা দেখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বা এক দশকের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে সোনার বাজার এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

আরও পড়ুন বিশ্ববাজারে ফের পতন, আরও কমবে সোনার দাম?

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিগত বছরগুলোতে সোনার দামের ঐতিহাসিক উত্থানের পেছনে যেসব সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণ ছিল, সেগুলো এখনো বজায় রয়েছে। ফলে বর্তমানের এই দরপতন এবং বিনিয়োগকারীদের আতংক সাময়িক হতে পারে। এটি নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য কম দামে সোনা কেনার একটি ভালো সুযোগ তৈরি করেছে।

Advertisement

কেন কমছে সোনার দাম?

ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি বা শেয়ারবাজারের চরম ওঠানামার সময়ে সোনাকে সবসময় একটি নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমান বাজারে এর ভিন্ন রূপ দেখা যাচ্ছে। গ্যামারোড ক্যাপিটাল পার্টনারসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জর্ডান রিজুটো বলেন, চলতি বছর সোনা বাজারের আচরণ অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে শুরু করে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের মুদ্রানীতির গতিপ্রকৃতি—সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সোনার দাম নিচের দিকে নেমেছে।

রিজুটো আরও জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অনেক দেশের সরকারকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজেদের সোনার মজুত বিক্রি করে ডলারে রূপান্তর করতে হয়েছে, যা সোনার দাম কমার অন্যতম কারণ। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের তেলের রাজস্ব কমে যাওয়ায় চলমান খরচ মেটাতে স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে সোনার তারল্য ব্যবহার করছে।

আরও পড়ুন সপ্তাহের শুরুতেই সোনার গহনার দাম ভরিতে কমলো ২২১৬ টাকা  

সোনার দাম কমার পেছনে আরও কিছু কারণ কাজ করছে। বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজার একের পর এক নতুন রেকর্ড গড়ায় বিনিয়োগকারীরা ইক্যুইটির দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে ডলারের মান প্রায় ১১ শতাংশ কমলেও গত ফেব্রুয়ারি থেকে এটি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং প্রায় চার শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ডলারে নির্ধারিত হওয়ায় শক্তিশালী ডলার বৈশ্বিক ক্রেতাদের সোনা কেনায় নিরুৎসাহিত করছে।

সোনার বাজার পরিস্থিতি

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বড় বাজারে ২০ শতাংশের মতো দরপতন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ১৯৭০-এর দশকেও সোনার বাজারে ৩০ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত দরপতন হয়েছিল, কিন্তু পরে তার দাম বহুগুণ বেড়ে যায়।

Advertisement

যদিও এবারের পতনের গতি কিছুটা ভিন্ন। ২০২২ সালের মন্দার সময়ে সোনার দাম ২৫ শতাংশ কমতে ২৮২ দিন সময় লেগেছিল। কিন্তু এবার গত ২৯ জানুয়ারির সর্বোচ্চ শীর্ষ থেকে মাত্র ৯১ দিনের মধ্যে দাম ২০ শতাংশ কমে গেছে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে দ্রুততম পতন।

আরও পড়ুন বিশ্ববাজারে সোনার দামে ৪৩ বছরের সবচেয়ে বড় পতন

রেকর্ড সর্বোচ্চ প্রতি ট্রয় আউন্স সোনা ৫ হাজার ৬০৮ দশমিক ৩৫ ডলার থেকে কমে বর্তমানে ৪ হাজার ২০০ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হচ্ছে (১ ট্রয় আউন্স= ২.৪৩ ভরি)।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যমতে, গত শুক্রবার (১৯ জুন) স্পট মার্কেটে সোনার দাম ০ দশমিক ৯ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৬৯ দশমিক ৪৪ ডলারে নেমে আসে। এর আগে দিনের শুরুতে এটি ৪ হাজার ১১৯ দশমিক ৭৮ ডলারে নেমেছিল, যা গত ১১ জুনের পর সর্বনিম্ন। অন্যদিকে, মার্কিন সোনার ফিউচার ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৮৬ দশমিক ৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সামনে দাম বাড়বে না কমবে?

জেফারিসের মালিকানাধীন ট্রেডু ডটকমের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক নিকোস জ্যাবৌরাস জানান, সোনার বাজার এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফেডারেল রিজার্ভ যদি দীর্ঘ সময় ধরে সুদের হার উচ্চ রাখার সিদ্ধান্ত বজায় রাখে, তবে সোনার দাম আরও কমে প্রতি আউন্স চার হাজার ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তবে বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো সোনার দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো আশাবাদী। জেপি মরগান চেজ এবং ওয়েলস ফার্গো বছরের শেষ নাগাদ সোনার দাম ছয় হাজার থেকে ৬ হাজার ৩০০ ডলারের ঘরে যাওয়ার পূর্বাভাস বজায় রেখেছে। 

আরও পড়ুন ভ্যাটসহ স্বর্ণালঙ্কারের দাম নির্ধারণে ক্রেতাদের লাভ না ক্ষতি?

বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাশ অবশ্য আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সোনার দামের পূর্বাভাস কমিয়েছে। আগের ৫ হাজার ৪০০ ডলারের পূর্বাভাস থেকে কমিয়ে তারা এখন প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলার হতে পারে বলে ধারণা করছে।

এমনকি মরগান স্ট্যানলির রক্ষণশীল পূর্বাভাসেও বলা হচ্ছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সোনার দাম ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ২০০ ডলার হতে পারে, যা বর্তমান দামের চেয়ে প্রায় ২২ শতাংশ বেশি।

সোনার দামের এই দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশে নামার পর থেকে তা আবার ক্রমাগত বাড়ছে, যার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে ইরান যুদ্ধের প্রভাব। গত মে মাসে ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) ৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জ্বালানি খাতের দাম ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ার কারণেই মূলত এই মূল্যস্ফীতি হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সোনা, রুপা, প্ল্যাটিনাম এবং প্যালাডিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতুর দাম বাড়ে। কারণ এগুলো কাগজের মুদ্রার মান কমার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী মাসগুলোতে সোনার বাজারে আরও ওঠানামা দেখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বা এক দশকের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে সোনার বাজার এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স, মানি ডটকম, ফোর্বসকেএএ/