একসময় বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া ছিল অনেক ভারতীয় পরিবারের স্বপ্ন। মনে করা হতো, বিদেশি ডিগ্রি মানেই ভালো চাকরি, উচ্চ বেতন এবং উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা। সেই লক্ষ্য পূরণে পরিবারগুলো বছরের পর বছর সঞ্চয় করত, অনেক শিক্ষার্থী বড় অঙ্কের ঋণও নিত।
Advertisement
কিন্তু সময় বদলেছে। এখন বিদেশে পড়াশোনার খরচ এত দ্রুত বাড়ছে যে অনেক পরিবার নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতীয় রুপির মান কমে যাওয়ায় বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
শিক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান বোর্ড ইনফিনিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা সুমেশ নায়ারের মতে, ২০২৬ সালে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময় হার প্রায় ৯৫ এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের বিপরীতে ১২৮-এ পৌঁছেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে দুই বছরের মাস্টার্স প্রোগ্রামের মোট খরচ, যা আগে ৬০-৭০ লাখ রুপির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন অনেক ক্ষেত্রে ১ কোটি রুপি ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও কঠিন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের ডিগ্রির মোট ব্যয় ২ থেকে ৩ কোটি রুপিতে পৌঁছাচ্ছে। যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার তিন বছরের স্নাতক কোর্সের খরচও অনেক ক্ষেত্রে ১ কোটির বেশি।
Advertisement
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়, বরং মুদ্রার অবমূল্যায়ন। ফলে প্রতি বছর পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ৫ থেকে ৮ লাখ রুপি পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।
ঋণের বোঝা ও বাস্তবতা
বিদেশে পড়তে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী শুরুতে পুরো আর্থিক ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে পারেন না। ভর্তি হওয়ার পরই বাস্তব চিত্র সামনে আসে।
আয়ারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া প্রকাশ রায় বলেন, বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্নের পাশাপাশি অনেক কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে, যা প্রায়ই প্রচার করা হয় না।
Advertisement
তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিদেশে পড়াশোনার ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে, কিন্তু চাকরি পাওয়া, বসবাসের খরচ বা মানসিক চাপের বিষয়গুলো খুব কমই আলোচনা করে।
তিনি জানান, পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর চাকরি খোঁজার সময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগ বা স্পন্সর করতে অনাগ্রহী হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে অস্থায়ী বা খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত হন।
মানসিক চাপও বাড়ছে
বিদেশে পড়াশোনার আর্থিক চাপের পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খুশি জুনেজা বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা সব সময় অনুভব করেন যে তাদের পেছনে পরিবার বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ফলে ভালো ফল করা এবং দ্রুত সফল হওয়ার চাপ সবসময় কাজ করে।
তিনি বলেন, বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ একটি বড় অর্জন হলেও এর সঙ্গে দায়িত্ব ও প্রত্যাশার চাপও থাকে।
চাকরি ও ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা
একসময় ধারণা ছিল, বিদেশে পড়াশোনা শেষ করলেই সহজে চাকরি পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেক বেশি অনিশ্চিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসা নীতি কঠোর হওয়া, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং নিয়োগকর্তাদের স্পন্সরশিপে অনীহা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন নিয়ম কঠোর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও কর্মসংস্থান ও ভিসা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
মর্যাদার আকর্ষণ
তবু বিদেশে পড়াশোনার চাহিদা পুরোপুরি কমে যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ সামাজিক মর্যাদা।
প্রকাশ রায় বলেন, বিদেশে ভর্তি হওয়ার খবর এখনও অনেক পরিবার ও সামাজিক পরিমণ্ডলে বিশেষ সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। অনেক সময় এই মর্যাদাবোধ বাস্তব আর্থিক ঝুঁকিকে আড়াল করে দেয়।
সব বিদেশি ডিগ্রির মূল্য সমান নয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডিগ্রি এখনও অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হিসেবে লাভজনক। তবে মাঝারি মানের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে একই কথা সব সময় প্রযোজ্য নয়।
অনেক শিক্ষার্থী বিপুল অর্থ ব্যয় করে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, যেখানে চাকরি বা ক্যারিয়ার সুবিধা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ভারতের বিকল্প শক্তিশালী হচ্ছে
এদিকে ভারতের নিজস্ব উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাও দ্রুত উন্নত হচ্ছে। আইআইটি ও আইআইএমের মতো প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক কম খরচে উচ্চমানের শিক্ষা ও ভালো চাকরির সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
এ ছাড়া জাতীয় শিক্ষা নীতির আওতায় বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ভারতে ক্যাম্পাস ও যৌথ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করছে। এতে বিদেশি ডিগ্রি পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বিদেশে বসবাস, ভিসা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি কমে যাচ্ছে।
বিদেশমুখী শিক্ষার্থী কমছে
ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ লাখ ৮ হাজার। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২৬ হাজারে।
অর্থাৎ মাত্র দুই বছরে এই সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবারগুলো এখন বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আগের তুলনায় অনেক বেশি হিসাব-নিকাশ করছে। তারা খরচ, সম্ভাব্য আয়, চাকরির সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভ-ক্ষতির বিষয়গুলো গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে বিদেশি ডিগ্রি এখনও অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হলেও, সেটি এখন আর নিঃশর্তভাবে ‘সাফল্যের টিকিট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং অনেক পরিবারের কাছে এটি হয়ে উঠেছে একটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত, যেখানে স্বপ্নের পাশাপাশি ঝুঁকির হিসাবও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
সূত্র: এনডিটিভি
এমএসএম