ধর্ম

মরক্কো যেভাবে এসেছিল ইসলামের ছায়াতলে

উত্তর আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে, আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মিলনসীমায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্ময়কর দেশ—মরক্কো। ইতিহাস, সভ্যতা, ইসলামি ঐতিহ্য, জ্ঞানচর্চা এবং আধুনিকতার এক অনন্য সমন্বয়ের নাম মরক্কো। আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে পশ্চিমের এই দেশটি শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই নয়, বরং তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ইসলামি উত্তরাধিকারের কারণেও বিশ্বে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে।

Advertisement

মরক্কোকে অনেকেই ‘দুই সাগরের দেশ’ বলে অভিহিত করেন। এর উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পশ্চিমে বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর, পূর্বে আলজেরিয়া এবং উত্তর প্রান্তে ইউরোপের স্পেন। মাত্র কয়েক কিলোমিটার সমুদ্রপথের ব্যবধান হলেও ইউরোপ ও মরক্কোর সংস্কৃতি, জীবনবোধ এবং ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট পার্থক্য। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েও মরক্কো আজও তার স্বকীয়তা ও ইসলামি পরিচয় অটুট রেখেছে।

‘মরক্কো’ নামটির উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এটি এসেছে দেশটির প্রাচীন রাজধানী মারাক্কেশ থেকে। আবার আরবি ভাষায় এই অঞ্চলকে বলা হতো ‘আল-মাগরিব’—অর্থাৎ পশ্চিমাঞ্চল বা সূর্যাস্তের ভূমি। মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টিতে এটি ছিল ইসলামি ভূখণ্ডের সর্বপশ্চিম প্রান্ত, তাই একে ‘দূরতম পশ্চিম’ নামেও অভিহিত করা হতো।

আজকের মরক্কো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। প্রায় ৯৯ শতাংশ জনগণ সুন্নি মুসলমান। ইসলামের প্রতি তাদের গভীর অনুরাগ দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়েছে। মরক্কোর শহর, গ্রাম, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জনজীবনে ইসলামের উপস্থিতি স্পষ্ট। ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৪১ হাজারেরও বেশি মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬ হাজারেরও বেশি জামে মসজিদ। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত আজানের ধ্বনি দেশটির আকাশ-বাতাস মুখরিত করে রাখে।

Advertisement

মরক্কোর অন্যতম গর্বের স্থাপনা হলো ক্যাসাব্ল্যাঙ্কা শহরে অবস্থিত দ্বিতীয় হাসান মসজিদ। এটি আফ্রিকার বৃহত্তম এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ। সমুদ্রতীরে নির্মিত এই মসজিদের সুউচ্চ মিনার, অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিল্পকলার এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায় এই মসজিদে।

মরক্কোয় ইসলামের আগমন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। খোলাফায়ে রাশেদার যুগের পর যখন হজরত মুয়াবিয়া (রা.) মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি মুসলিম সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করেন। উত্তর আফ্রিকার দায়িত্ব দেওয়া হয় সাহাবি হজরত উকবা ইবনে নাফেকে (রা.)। সে সময় রোমান শাসকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ উত্তর আফ্রিকার বার্বার জনগোষ্ঠী মুসলমানদের সাহায্য কামনা করে। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে উকবা ইবনে নাফে (রা.) উত্তর আফ্রিকায় অভিযান পরিচালনা করেন এবং ইসলামের আলো সেখানে পৌঁছে দেন।

৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে তার নেতৃত্বে ইসলামের বার্তা মরক্কোতে প্রবেশ করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসলামের এই বিস্তার কোনো জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে হয়নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলমানরা স্থানীয় বার্বার জনগোষ্ঠীকে ধর্মান্তরিত করতে কোনো প্রকার চাপ প্রয়োগ করেনি। বরং ইসলামের ন্যায়বিচার, মানবিকতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বার্বারদের হৃদয় জয় করে নেয়। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং পরবর্তীকালে ইসলামের বিস্তার ও রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন তিউনিশিয়ার প্রাচীন মসজিদ জামে উকবা ইবনে নাফে

বার্বার জনগোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহণ উত্তর আফ্রিকার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর ফলে ইসলামি সভ্যতা নতুন শক্তি লাভ করে। কয়েক দশকের মধ্যেই মরক্কোসহ উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। ইসলাম শুধু নতুন ধর্মই নিয়ে আসেনি, বরং নিয়ে এসেছিল উন্নত সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চা, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং নৈতিক মূল্যবোধ। ইসলামের ছায়াতলে এসে যাযাবর ও গোত্রভিত্তিক জীবনধারা ধীরে ধীরে রূপ নেয় সংগঠিত রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজে।

Advertisement

মরক্কোর ইতিহাস অবশ্য সবসময় শান্ত ছিল না। ইসলাম আগমনের পর বিভিন্ন সময় উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং স্থানীয় মুসলিম রাজবংশের উত্থান-পতন ঘটেছে। এক সময় আন্দালুসে মুসলিম শাসনের পতনের প্রভাবও মরক্কোর ওপর এসে পড়ে। স্পেন থেকে বিতাড়িত অসংখ্য মুসলিম ও ইহুদি মরক্কোতে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের মাধ্যমে দেশটির সংস্কৃতি, স্থাপত্য, শিক্ষা এবং শিল্পকলায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।

১৬৬৬ সালে আলাউই রাজবংশ ক্ষমতায় আসে এবং দেশটিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমান মরক্কোর রাজপরিবার এই রাজবংশের উত্তরসূরি। দীর্ঘ তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তারা দেশটির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য বজায় রেখেছে। ফলে মরক্কোতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

মরক্কোর সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়গুলোর একটি হলো শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাস। পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কৃতিত্বও মরক্কোর। ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফেস শহরে প্রতিষ্ঠিত আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী—ফাতিমা আল-ফিহরি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি ইসলামি জ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, গণিত ও ভাষা শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

আজও মরক্কো শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য প্রশংসিত। দেশটিতে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক। শিক্ষা বিস্তারে সরকারের নানা উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। ইউনেসকো ২০০৬ সালে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য মরক্কোকে পুরস্কৃত করে।

বর্তমান বিশ্বে মরক্কো একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। এর রাজধানী রাবাত, আর বৃহত্তম শহর ক্যাসাব্ল্যাঙ্কা। প্রশাসনিকভাবে দেশটি বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রদেশে বিভক্ত। আরবি রাষ্ট্রভাষা হলেও বার্বার ভাষা, ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষাও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মরক্কো ও আলজেরিয়া তাদের উপনিবেশিক ভাষাগত নির্ভরতা কমিয়ে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যা বৈশ্বিক যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে।

অর্থনীতিতেও মরক্কো উত্তর আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। খনিজ সম্পদ, কৃষি, ফল উৎপাদন, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ এবং পর্যটন শিল্প দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বিশেষ করে ফসফেট উৎপাদনে মরক্কো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। সমুদ্র থেকে আহরিত মাছ এবং কৃষিপণ্যও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন।

মরক্কোর ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। খ্রিস্টপূর্ব আট হাজার বছর আগে এখানে মানববসতির প্রমাণ পাওয়া যায়। বার্বার, ফোনেশীয়, ইহুদি, রোমান, ভেন্ডাল এবং বাইজেন্টাইনসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর পদচারণায় সমৃদ্ধ হয়েছে এই ভূমি। প্রতিটি যুগ দেশটির সংস্কৃতি ও সভ্যতায় নতুন নতুন উপাদান যুক্ত করেছে। ফলে মরক্কো আজ একটি বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক।

মরক্কোর নাম উচ্চারিত হলে আরেকজন মহান ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণে আসে—বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ও পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। তিনি মরক্কোর তাঞ্জিয়ার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র একুশ বছর বয়সে হজের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে তিনি পরবর্তী তিন দশক ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন। তার ভ্রমণের পরিধি ছিল প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার কিলোমিটার। তিনি ভারত, চীন, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা, আরব এবং আন্দালুস ভ্রমণ করেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আর-রিহলা’ আজও ইতিহাস ও ভূগোল গবেষণার এক অমূল্য সম্পদ।

আরও পড়ুন আল কারাওইন লাইব্রেরি, মুসলিম বিশ্বের প্রাচীনতম গ্রন্থাগার

মরক্কো তাই কেবল একটি রাষ্ট্রের নাম নয়; এটি এক দীর্ঘ ইতিহাসের নাম, এক সমৃদ্ধ সভ্যতার নাম। এখানে ইসলাম শুধু ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছে। এই দেশে যেমন মসজিদের মিনার আকাশ ছুঁয়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান-আলোও আলোকিত করেছে বিশ্বসভ্যতাকে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও উন্নয়ন, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের এক অপূর্ব সেতুবন্ধন তৈরি করেছে মরক্কো।

আজকের বিশ্বে যখন অনেক দেশ নিজেদের পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকটে ভুগছে, তখন মরক্কো দেখিয়ে দিয়েছে—আধুনিক হওয়া মানেই নিজের শিকড় ভুলে যাওয়া নয়। বরং নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধারণ করেই উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। ইসলামের আলো, জ্ঞানচর্চার গৌরব এবং সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে মরক্কো আজও মুসলিম বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছে।

আরও পড়ুন ব্রাজিলে মুসলিম নিপীড়ন ও ঐতিহাসিক মালে বিদ্রোহ 

ওএফএফ